সন্তান স্নেহে | ইন্দ্রজিৎ রায়
গল্প......
"সন্তান স্নেহে"
ইন্দ্রজিৎ রায়
প্রথম পর্ব
পৃথিবীতে কৃপণ লোকদের মধ্যে নারায়ন বাবু কে একজন গণনায় ধরলে কোন ভুল হবে না। তার চরিত্রে একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শুধু পয়সা আর পয়সা। অর্থাৎ টাকাপয়সার নেশাটা তার খুব বেশি ছিল। সে তার জীবনে বোধহয় চার আনা পয়সাও খরচ করে কোন বন্ধুকে একটা বিড়ি পর্যন্ত খাওয়ায় নি। তবে কেউ দিলে সে কিন্তু ছাড়তো না। তার চরিত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল সে যদি কারো কাছে একটি টাকাও পেত তবে সেটা তাকে দশবার স্মরণ করিয়ে দিত।আবার কেউ যদি এক টাকা তার কাছে পেত সেটাও সে কতক্ষণে তাকে দেবে তার জন্য ছটফট করতো। অর্থাৎ টাকাপয়সাটা তার কাছে যেন জীবনের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যার জন্য সে বেশি টাকা পয়সা খরচ করে কোন ভালো মন্দ কিছু করত না। এমনকি খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারেও না।
তার বাবা ভালো একটা সরকারি চাকরি করতেন। সে দিক থেকে দেখলে বাড়ির অবস্থা বেশ ভালো ছিল। সে বাড়ির বড় ছেলে। এখন বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে। বাবা-মা বিয়ের জন্য মেয়ের খোঁজ খবর করছে। সে একটা বেসরকারি চাকরি করে। বেসরকারি হলেও তার বেশ ভালোই রোজগার ছিল। বাড়িতে অর্থাৎ সংসারে কোনো খরচ ই তাকে দিতে হতো না। সে কোন আজেবাজে পয়সা খরচ করতো না। সেকথা প্রথমেই বলেছি। তার একমাত্র বাসনা ছিল তার নিজের অনেক টাকা হবে। তার বাবা-মা যখন মেয়ে দেখছেন তখন তার বাবার অফিসের ই এক ভদ্রলোক যিনি অন্য ডিপার্টমেন্টের বড় বাবু ছিলেন। তিনি তাঁর মেয়ে দেওয়ার জন্য রাজি হলেন। ভদ্রলোকের প্রচুর টাকা-পয়সা। শুধু তাঁর দুঃখ তাঁর মেয়েটার বয়স হয়েছে। কিন্তু এখন ও পর্যন্ত কোন সৎ পাত্রে তাকে দান করতে পারেননি। তাঁর এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটি বড়। তিনি নারায়ন বাবুর খবর পেয়ে, নারায়ণ বাবুকে মেয়ের জন্য দেখতে এলেন। নারায়ণ বাবুকে দেখে তাঁর খুব পছন্দ হলো। দেখাশোনা চলতে লাগলো। নারায়ন বাবু অনেক কিছু পাবে শুনে ভীষণ খুশি, তাতে মেয়ের বয়স কম আর বেশি, তাতে কি আসে যায়। মেয়ে মানুষ তো মেয়েই হয়। তাতে বয়সে কি আসে যায়। বরং শোনা যায় মেয়েমানুষ একটু বয়স্ক হলে স্বামীকে বেশি আদর-যত্ন করে।
দেখাশুনা করে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেলো। মেয়ের বয়সের ব্যাপারে সবাই একটু আপত্তি করে ছিল বটে, কিন্তু নারায়ন বাবুর প্রবল ইচ্ছা থাকায় কেউ আর কোন বাধা দিল না।দিনক্ষণ মত বিয়ে হয়ে গেলো। এরপর শ্বশুরবাড়ি যাতায়াতের পালা। শ্বশুরবাড়ি গেলেই নারায়ন বাবুর শশুর মেয়ের হাতে বেশ কিছু গুজে দিতেন।আর সেটা পেয়ে নারায়ণ বাবু বেশ খুশি হতো।
প্রথমবার জামাইষষ্ঠীতে জামাই মেয়ে আসবে আর সেই কারণে তার শ্বশুর আরো বেশ কিছু নিকটাত্মীয়দের নিমন্ত্রণ করেছেন। তার মধ্যে নারায়ন বাবুর এক মাসি শাশুড়ি এবং তার পরিবার ও এসেছিল। তার মাসি শাশুরির মেয়ে রুমাও বেশ ডাগর ডোগর এবং দেখতে-শুনতে ও বেশ ভালো।ষষ্ঠীতে তার সঙ্গে নারায়ন বাবুর বেশ আড্ডার আসর জমে উঠেছিল।শালি জামাইবাবু বলে কথা। সম্পর্কটা খুবই ঘনিষ্ঠ। সুতরাং সেখানে কারো কিছু বলার নেই। শালিকে পেয়ে সবার আড়ালে নারয়ণ বাবু একবার বলেই ফেলল---যদি তোমাকে বিয়ের আগে দেখতাম, তাহলে তোমার দিদিকে বিয়ে না করে, তোমাকে আমি বিয়ে করতাম! শালি ও জামাইবাবুর কথায় সুর মিলিয়ে, বললো--- কি আছে এখনো তো করতে পার। দুই বোনে সতীন হয়ে থাকবো। তারপর দুইজনে সে-কি হাসা হাসি। যেহেতু নারায়ণ বাবুর নিজের শশুরের কোন মেয়ে ছিল না, তাই রুমা এবং নারায়ণ বাবুর মধ্যে শালী জামাইবাবুর মধুর সম্পর্কটা যেন মধুময় হয়ে উঠলো।
বিয়ের বছর দেড়েকের মধ্যে নারায়ন বাবু এক ছেলের বাবা হলো। ছেলের বয়স যখন প্রায় পাঁচ ছয় তখন তার স্ত্রী ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে।তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। শরীরে অবস্থা দেখে তার স্ত্রী ভীষণ ভাবে ভেঙ্গে পড়ে এবং তাকে কাছে ডেকে বলে--- শোনো একটু কাছে আসবে? নারায়ণ বাবু স্ত্রীর কথা শুনে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে বসলো এবং জিজ্ঞাসা করল কি হয়েছে, বল? তখন তার স্ত্রী তার হাত ধরে বললো--তুমি আমাকে কথা দাও, আমি যা বলবো তুমি তা রাখবে? নারায়ন বাবু তার স্ত্রীর অবস্থা এবং মনের ভাব দেখে বললো-- হ্যাঁ আমি তোমার কথা রাখব। কিন্তু কথাটা কি সেটা তো আমাকে বল?তখন নারায়ণ বাবুর স্ত্রী বললো-- "আমি যদি মারা যাই তাহলে তুমি রুমাকে বিয়ে করবে"!
স্ত্রীর একথা শুনে সেই মুহূর্তে সে যেন আকাশ থেকে পড়লো! মনে মনে ভাবল তাহলে কি ওর মনে সন্দেহের দানা বেঁধেছে! তারপর একটু গম্ভীর ভাবে জিজ্ঞাসা করলো--তুমি হঠাৎ এই কথা বলছো কেন? তখন তার স্ত্রী তাকে বললো-- দেখো রুমা আমার বোন, রুমা যেভাবে বাবুকে অর্থাৎ ছেলেকে এবং তোমাকে দেখবে অন্য কেউ এলে তা করবে না।তখন আমার বাবুর ভীষণ কষ্ট হবে। তারপর আবার তার স্ত্রী তার হাত জোর করে ধরে বললো-- তুমি আমায় কথা দাও যে, আমি মারা গেলে তুমি রুমাকে ই বিয়ে করবে। স্ত্রীকে শান্ত করার জন্য সে সেই মুহূর্তে স্বীকার করে নিলো যে, সে মারা গেলে রুমাকে ই বিয়ে করবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো অঘটন ঘটেনি। সে রোগ থেকে মুক্তি পেলো এবং সুস্থ হয়ে কয়েক দিনের মধ্যে বাড়ি ফিরে এলো।
এদিকে রুমার ও অনেক বয়স হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার বিয়ে হচ্ছে না।মাঝে মাঝে দুই একজন পাত্র দেখতে আসে কিন্তু পছন্দ করে না। এভাবে বহুদিন যাবত চলছে। এখন সবাই যেন তিতা বিরক্ত হয়ে গেছে। এখন যে কোন ছেলে পছন্দ করলেই বিয়ে দিয়ে বাড়ির লোকজন হাফছেড়ে বাঁচে।
রুমার বিয়ের জন্য ওর বাড়ির লোক এবং আত্মীয় স্বজনরা ভীষণ চিন্তায় ছিল। কারণ রুমা মেয়ে মানুষ। ছেলে হলে হয়তো বাড়ির লোকজন আত্মীয়-স্বজনরা এতটা চিন্তা করতো না।
যাই হউক এর ই মধ্যে এক দোজবর রুমাকে দেখতে এলো।ভদ্র লোক রেলে চাকরি করেন। টাকা-পয়সা বিষয় সম্পত্তি কোন দিক থেকে কম নেই। এক কথায় ভাল অবস্থা। চাকরিটা ও ভালো। রুমাকে দেখে তার পছন্দ হলো। শুধু ছেলেটির দোষের মধ্যে দোষ আগের স্ত্রী মারা গেছেন। তবে কোন সন্তানাদি নেই। রুমার বাড়ির লোকজন এর সঙ্গে রুমার বিয়ে দিতে রাজি হলো।
রুমার বিয়ের পর অনেকগুলো দিন দেখতে দেখতে কেটে গেলো। কিন্তু কোনো সন্তানের মুখ তারা এখনো পর্যন্ত দেখতে পেল না। যা ও একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল তাও মাস দুয়ের মধ্যে নষ্ট হয়ে গেলো। তারপর থেকে বহু ডাক্তার কবিরাজ দেখানো হলো কিন্তু কোনো সুফল পাওয়া গেলো না। প্রত্যেকের মুখে একই কথা শুনা গেলো যে, তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কারও কোন দোষ নেই। সুতরাং সন্তান এক দিন না এক দিন হবেই। একথা শুনে আত্মীয়-স্বজনরা বলতো বেশি চিন্তা করার কিছু নেই।যখন কোন দোষ পাওয়া যায়নি, তখন একদিন না, একদিন সন্তান হবেই।
এদিকে মাঝে মাঝে নারায়ন বাবু ফোন করে রুমার সঙ্গে নানান সুখ দুঃখের কথা বলতো, নানা হাসি-ঠাট্টা হতো।কখনো কখনো হাসির ছলে বলতো তোমার বরের কোনো ক্ষমতা নেই। আমার দৌলতে যদি একটা হয়। আর তুমি যদি রাজি থাকো তো আমি এক বার চেষ্টা করে দেখতে পারি। যেহেতু নারায়ণ বাবু আর রুমার মধ্যে শালী জামাইবাবুর সম্পর্ক সেহেতু দুই জনের মধ্যে এরকম কথাবার্তা চলতেই পারে।
এদিকে যত দিন যাচ্ছে রুমার সংসারে অশান্তির মাত্রা ততই বাড়তে লাগলো। শাশুড়ি শ্বশুর এবং তার স্বামীর একটাই কথা সন্তান না হলে তাদের এই টাকা-পয়সা জায়গা সম্পত্তি কে ভোগ করবে? সংসারে এখন প্রত্যেক দিনই ঝগড়া লেগে রয়েছে। এতো অশান্তি দেখে একদিন রুমা তার স্বামীকে বললো, তুমি আর একটা বিয়ে করো। তবু আমার সাথে এভাবে অশান্তি করো না। দোহাই তোমার।
কথাটি বলতে গিয়ে তার বুকের ভেতরটা যেন ফেটে যাচ্ছিল। কথার পরিপ্রেক্ষিতে তার স্বামী উত্তর দিলো প্রয়োজন হলে তাই করতে হবে।
এরকম ভাবে দিনের দিন অশান্তি এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছতে লাগলো যে, তারা রুমাকে বন্ধ্যা নারীর আখ্যার সাথে বহু ভৎসনা করতে লাগলো।
এই ভৎসনা শুধু যে রুমার পক্ষেই অসহ্য হয়ে উঠলো তা নয়, এই সমস্ত কথা যে কোন নারীর পক্ষেই হজম করা কঠিন ব্যাপার। এখন রুমার এই জ্বালা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় আত্মহত্যা করা। এখন সারাদিন তার দুই চোখ দিয়ে সারাক্ষণ জল ঝরে।সে যেন এখন বাড়ির মধ্যে সবার চোখের বিষ। এরকম পরিস্থিতিতে সে এখন কি করবে তার দিশা খুঁজে পাচ্ছিল না। কি করবে ভেবে উঠতে পারছিল না। তার মন ভীষণ চঞ্চল। এই পরিস্থিতিতে তার একমাত্র মনে পড়ল জামাইবাবুর কথা।তাই একবার ফোনে কথা বলতে ইচ্ছে হলো। আর কোনদিন দেখা হবে কি হবে না!তা একমাত্র ঈশ্বর ই জানেন।
যেমনটি ভাবা তেমনটি কাজেও করলো।সে ফোন করে কথা বলতে আরম্ভ করলো। ফোনে সব কথা শুনে নারায়ন বাবু ছুটে আসেন রুমার বাড়িতে। সেখানে এসে নারায়ন বাবু রুমাকে নানান ভাবে বোঝাতে চেষ্টা করতে থাকে।রুমা ভীষণ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। তাই জামাইবাবু হিসাবে শালীকে শান্ত করার জন্য গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিতে থাকে। এইভাবে বেশ কিছু ক্ষন সময় দুইজনের কথা বার্তা চলতে থাকে। ওরা দুইজনে ভীষন একন্তেই কথা বার্তা বলছিল। তারপর নারায়ন বাবু ঐ বাড়ির কারো সাথে কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলো।
কিছুদিনের মধ্যে রুমার মধ্যে একটা শারীরিক পরিবর্তনের লক্ষন দেখা দিলো। যে পরিবর্তন মেয়েদের মা হওয়ার পূর্বে লক্ষ্য করা যায়। মাস চারপাঁচের মধ্যে বোঝা গেলো যে, সত্যিই রুমা মা হতে চলেছে! এতোদিনের মধ্যে যখন কোন অঘটন ঘটেনি, সেহেতু আশা করা যায় এবার তার গর্ভধারণটা ঠিক ঠাক মতো হয়েছে।সংসারের সবাই যেন এখন খুব খুশি।সবার চোখে-মুখে একটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। এখন শুধু অপেক্ষা কবে সবাই নতুন মানুষটির মুখ দেখবে। কত তাড়াতাড়ি বংশের প্রদীপ জ্বালানোর মানুষটি ভূমিষ্ঠ হবে, সেই অধীর আগ্রহে সবাই এখন অপেক্ষা করছে।
এদিকে ঐ দিনের পর থেকে নারায়ন বাবু এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি রুমার খোঁজখবর করে। এখন রুমার প্রতি নারায়ন বাবুর দায়িত্ব যেন বহুগুণে বেড়ে গেছে। শালীর অশান্তিতে দুঃখ পেয়ে সেও যেন খানিকটা দুঃখের অংশিদার হয়ে শালিকে একটু শান্তিতে থাকতে দিতে চায়। শালীর দুঃখ-কষ্টে সেও যেন ভীষণ দুঃখ পায়। শালীর দুঃখ-কষ্টে তার ও যেন বুকের ভেতরটা ফেটে যেতে চায়।
এখন মাঝে মাঝেই নারায়ন বাবুকে রুমার বাড়িতে দেখতে পাওয়া যায়। এরকম যাতায়াত দেখে সবাই কত ই না প্রশংসা করে নারায়ন বাবুর। সবাই বলতো-- সত্যিই এমন জামাইবাবু কয়জনার ভাগ্যে জোটে? শালীর একটু শরীর খারাপ বা কোন অসুবিধা হলেই জামাইবাবু নিজের দাদা ভাইয়ের মতো ছুটে আসে। এরকম জল্পনা-কল্পনা শুধু রুমার বাড়ির লোক নয়, পাড়ার লোকেরা ও পর্যন্ত করে থাকে। জামাইবাবুকে দেখতে পেলে শুধু লোকেরা নয়, রুমা নিজেও ভীষণ খুশি হয়।
দেখতে দেখতে রুমা এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিল। যেদিন তার সন্তান হলো সেদিন সবার সঙ্গে নারায়ন বাবু ও হাসপাতালে সকলের সঙ্গে সারারাত কাটাল। পুত্রসন্তান দেখে সেদিন রুমার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি এবং আত্মীয়-স্বজন সবাই ভীষণ খুশি হলো। এতদিন পরে তারা যেন বংশের আলো জ্বালানোর একটা আশার আলো দেখতে পেলো।এই খুশিতে রুমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা পাড়া শুদ্ধ লোকদের ডেকে এনে মিষ্টি বিতরণ করলো। যে যত পারো মিষ্টি খাও। তার সঙ্গে রুমার শ্বশুর-শাশুড়ি একটা কথাই সবাইকে বললো-- তোমরা সবাই আশীর্বাদ করো যাতে আমাদের নাতি সুস্থভাবে বড় হয়ে ওঠে।
তাঁদের কথায় সবাই নবজাতককে প্রাণভরে আশীর্বাদ জানালো। এবং সবার সঙ্গে নারায়ন বাবু যেন আরো বেশি খুশি। তাকে দেখে মনে হলো সেই যেন সন্তানের পিতা।
সন্তানের জন্ম দিয়ে রুমা খুবই খুশি। কিন্তু তবুও যেন তার মধ্যে কি রকম একটা সংকোচ বোধ দেখা যেতো। সেটা অবশ্য খুব সাধারণভাবে দেখলে কারোর বোঝার সাধ্য নেই। রুমাকে কখনো কখনো দেখা যেতো কাজ করতে করতে হঠাৎ সে আনমনা হয়ে পড়তো।কিছু একটা যেন আপন মনে ভাবতে থাকতো। যার জন্য দুই একটা কাজে সে ভুল ও করে ফেলতো।
নারায়ন বাবু এখনোও আগের মতোই রুমার বাড়ী যাতায়াত করে। একবার এলে সহজে যেতে চায় না। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ভীষন আদর করে। আর একটা বিষয় তার মধ্যে এখন লক্ষ্য করা যায়, যখন নারায়ন বাবু সময় পায় তখনই রুমার বাড়ি ফোন করে এবং একবার ফোন করলে বহুক্ষন ধরে তাদের মধ্যে কথাবার্তা চলতে থাকে। কখনো কখনো রুমার কথার মধ্যে শোনা যায়, জামাইবাবু আমার ভীষণ ভয় করে,কি যে হবে, ভগবানই জানেন! ঐ দিকে নারায়ণ বাবুর প্রতিউত্তরে শোনা যায়, সব ব্যাপারটাই তোমার উপরে, তুমি যা করবে তাই হবে। তুমি ঠিক থাকলে সব ঠিক। আর তুমি ঠিক থাকলে ভগবান ছাড়া কারো সাধ্য নেই যে ব্যাপারটা জানে।
শুধু যে নারায়ন বাবুই ফোন করে তা নয়, সময় পেলে রুমা ও তাদের খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য ফোন করে থাকে।
দেখতে দেখতে রুমার ছেলে বেশ বড় হয়ে উঠেছে।সে সময়-সুযোগ পেলেই মাসি মেসো অর্থাৎ নারায়ন বাবুর বাড়ি বেড়াতে চলে যায়। সেখানে সে খুব আনন্দের সঙ্গে দিন কাটায়। সেখানে তার দাদা অর্থাৎ নারায়ণ বাবুর ছেলে তাকে খুব ভালবাসে। তাই সময় পেলেই সে মায়ের সঙ্গে বায়না ধরে দাদার কাছে যাওয়ার জন্য।
রুমার ছেলের মধ্যে আমরা আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেছি, যেটা আমাদের ভীষণ অবাক করতো। সেটা হলো-- সে তার নিজের বাবার থেকেও মেসো অর্থাৎ নারায়ন বাবুকে বেশি ভালোবাসতো। এবং খুব বেশি পরিমাণে নারায়ন বাবুর কাছে বায়না করতো। অবশ্য নারায়ন বাবু ও প্রথম থেকেই শালীর ছেলের প্রতি সদয় ছিলো। বিভিন্ন ধরনের খেলনা এবং সুন্দর সুন্দর জামা কাপড় ইত্যাদি দিয়ে থাকতো।এক কথায় নারায়ন বাবু রুমার ছেলেকে খুবই ভালবাসত। হয়তো তার জন্যই সেও নারায়ন বাবুকে এতো ভালবাসত।
রুমার শ্বশুর-শাশুড়ি বলতে এখন আর কেউ নেই। তারা দুইজনেই এখন পরলোকবাসী। সংসারে এখন স্বামী ছেলে এবং নিজে। মাঝে মাঝে আত্মীয়-স্বজন আসা যাওয়া করে। ছেলে যত বড় হচ্ছে রুমা এবং তার স্বামী ততোই বয়সের দিকে পা বাড়াচ্ছে অর্থাৎ বৃদ্ধ হতে চলেছে। নানান রকম শারীরিক সমস্যার দেখা দিচ্ছে। এটাই বুঝি প্রকৃতির অপরিবর্তনীয় নিয়ম। কাউকে তুলে নেওয়ার আগে তার দ্বারা অনুরূপ সৃষ্টি করিয়ে নেওয়া।
অপরদিকে নারায়ন বাবুর ও যত বয়স বাড়ছে ততই যেন তার চোখে মুখে একটা চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ভাবে রেখাপাত করছে। সকলে তাকে দেখে অবাক হয়ে যেতো। তার এখন সুখের সংসার। তার ছেলে এখন প্রায় বিয়ের উপযুক্ত। ছেলেকে বিয়ে দিয়ে বৌমাকে নিয়ে সুখে সংসার করবে এটাই এখন কাম্য। বৃদ্ধ বয়সে ছেলের হাতে সংসার তুলে দিয়ে এদিক-সেদিন তীর্থভ্রমণ করবে।কিন্তু শেষ বয়সে তাকে দেখে যেন মনে হতো সে কিছু একটা ভুল করেছে। যার জন্য তার এই অনুশোচনা।
সেদিন একটি সন্তানের জন্য রুমা কতই না ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল। সন্তান না দিতে পারায় স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ির জ্বালায় তাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না।যাই হউক ঈশ্বরের সেদিন রুমার দিকে মুখ তুলে চেয়েছিলেন। তাই তো সে অন্য দশজন নারীর মতো মাতৃত্বের যে অনুভূতি, মাতৃত্বের যে স্বাদ তা আস্বাদন করতে পেরেছিল। সেদিন তার নারী জন্ম সার্থক হয়েছিল। শুধু কি নারীর জন্ম সার্থক তা নয়, সংসারের এবং নিজের জীবনের সুখ ফিরে পেয়েছিল।কিন্তু তবুও তার আজ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা অশান্তি মনের মধ্যে কাজ করছে। যেটা তাকে সর্বদা যন্ত্রণা দিচ্ছে। সেই কথা কাউকে বলে যে একটু হালকা হবে তার উপায় নেই।সে কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু বলতে পারছে না। এমনকি তার স্বামীকে ও না। তাহলে সেটা কি এমন কথা!যা কাউকে বলতে পারা যাচ্ছে না!
লেখক ইন্দ্রজিৎ রায় এর রচিত কাব্য সন্তান স্নেহে দ্বিতীয় পর্ব এবং অন্তিম পর্ব পড়ুন

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন