সন্তান স্নেহে | ইন্দ্রজিৎ রায় | দ্বিতীয় পর্ব

 দ্বিতীয় পর্ব
এর মধ্যে হঠাৎ একদিন নারায়ন বাবু দুপুরবেলায় রুমার বাড়ি এসে হাজির। মনে খুব আনন্দ। কিন্তু এসে দেখতে পেলো রুমার স্বামী বাড়িতেই রয়েছে। তাই খুব হাসি ঠাট্টা আরম্ভ করলো। রুমার স্বামীকে বললো--- আমি আজ ভেবে এলাম তুমি বাড়িতে থাকবে না। আর সেই সুযোগে আমি শালীকে নিয়ে একটু মজা করবো। কিন্তু ফল দাঁড়ালো উল্টো, এসে দেখি প্রতিদ্বন্দ্বি লাঠি হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। একথা শুনে রুমার স্বামী এবং রুমা দুজনেই হেসে গড়াগড়ি। তারপর পাশ থেকে রুমা বলে উঠলো--বুড়োর আবার এই বয়সে পুলক জেগেছে। এরকম হাসি ঠাট্টার পর রুমার স্বামী ও ঠাট্রা করে রুমাকে হাত ধরে টেনে এনে নারায়ন বাবুর কাছে হাজির করলো। এবং রুমার হাতটি নারায়ণ বাবুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে, বলে গেলো-- যতো পার শালী আর জামাইবাবু মিলে মস্তি করো। এখন তোমার উপর আমার আর কোন অধিকার রইলো না। এই কথা বলে সে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
 নারায়ন বাবু কিন্তু রুমার বরকে দেখে মনে মনে ভেবেছিল যে,যদি সে কোথাও বেরিয়ে যায় তো খুব ভালো হয়। কারণ নারায়ন বাবু আজ একটা উদ্দেশ্য নিয়ে রুমার বাড়ি এসেছে। সে আজ রুমাকে কিছু বলতে চায়। যা এতদিন ধরে সে মনের মধ্যে পুষে রেখেছে। যা তাকে রাতদিন যন্ত্রণা দিচ্ছে।

এদিকে রুমার বর বাজারের দিকে গেছে কিছু ভালোমন্দ আনার জন্য। কারন আজ রুমার জামাইবাবু বেড়াতে এসেছে, তাকে একটু আত্মীয়র মতো আদর যত্ন না করলে ভালো দেখায় না।
রুমার বর বাজারে যেতেই নারায়ণ বাবু রুমাকে টেনে এনে খাটের পাশে বসালো। রুমা অবশ্য হাত ধরে টানতে একবার বলে উঠলো, কি করছো?ছাড়, তা সত্ত্বেও সে তাকে টেনে এনে বসালো এবং বললো , রুমা আমি খুব জ্বালায় ভুগছি।এ যেন আর আমার সহ্য হচ্ছে না। এ যেন আমার পাপের জ্বালা এ বয়সে,অথচ কাউকে বলতেও পারছি না।কাউকে বলে যে, একটু হালকা হবো তার কোন উপায় নেই। সমাজ এবং লোক লজ্জার ভয়, অপরদিকে সংসারের ভয়। অথচ এও আমার ঔরষজাত সন্তান। আমি বাবুকে যেমন ভালোবাসি তেমনি তোমার ছেলেকেও ভালোবাসি। দুজনেই তো একই রক্তের, আমি কাউকে আমার সম্পদ থেকে বঞ্চিত করতে পারবো না। এবং সেটা কোনো ভাবেই সম্ভব হবে না।আর যদি সেটা আমি না করি, তাহলে ভগবানও আমাকে ক্ষমা করবেন না।

নারায়ণ বাবুরে কথা শুনে রুমা জামাইবাবুকে হাত জোড় করে বললো--- জামাইবাবু চুপ কর।তা ছাড়া সেটা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। আর এই কথা কেউ শুনতে পেলে আমার কি হবে, সেটা একবার ভেবেছো? আমি যে সমাজের চোখে কলঙ্কের কালিমায় কালো হয়ে যাবো। আমাকে দেখলে সবাই ছি-ছি করে থুতু ফেলবে। কাউকে আমি মুখ দেখাতে পারবো? শুধু কি সমাজ, আমি আমার স্বামী পুত্রের কাছে কী জবাব দেব? আর তারা কি আমাকে মেনে নিতে পারবে?আর তাদের কানে একথা পৌঁছানোর আগে আমার আত্মহত্যা করা উচিত।যার জন্য আমি সংসার ফিরে পেয়েছি তারই জন্য কি আবার আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে! আর সেটাই কি তুমি চাও? তাছাড়া আমার ছেলের অর্থাৎ ওর বাবার যা আছে,তাতে করে বাবু সোনার কোন অভাব থাকবে না। আর তাছাড়া তুমি কেন ভাবছো যে, তুমি ওকে বঞ্চিত করছো। বরং দিদির ছেলের পাওয়া আর বাবুসোনার পাওয়ার মধ্যে কোন তফাৎ নেই। তাতে বরং আমি মাসি হিসাবে খুশিই হবো।

শালীর একথা শুনে নারায়ন বাবু আর কোন কথা বললো না। মাথা নিচু করে চুপ করে বসে রইল এবং মনে মনে কিছু একটা চিন্তা করছে বোঝা গেলো।

রুমা এবং নারায়ন বাবুর কথা শেষ হওয়ার আগেই কিন্তু রুমার বর বাজার নিয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছিল এবং শালি জামাইবাবুর কিছু গোপন কথা শুনতেও পেয়েছিল। তাদের দুই জনের গোপন কথা শুনতে পেয়ে সে একটু আড়াল হয়ে কথা গুলি ভালোভাবে শুন ছিল। এরপর তাদের কথা শেষ হতে সে বাইরে থেকে আওয়াজ দিয়ে বললো-- কি গো শালী জামাইবাবুর কথা শেষ হয়েছে? ভেতরে আসতে পারি? বাবলুর কথা শুনে দুইজনে একটু চমকে উঠল। কিন্তু বাবলু যে তাদের কথা শুনেছে, তার ভঙ্গি দেখে সেটা বোঝা গেলো না। বরং সে ঘরে ঢুকে তাদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা কথা বলতে লাগলো। বললো-- কি হে মশায় শালীটা ঠিক আছে তো? বুড়ো বয়সে আমাকে ছেড়ে জামাইবাবুর প্রেমে পড়ে পালাবে না তো? এইধরনের নানান হাসি ঠাট্টা চলতে লাগলো।
 তারপর রান্না বান্না হতে সকলে মিলে একসঙ্গে দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সারল। বাবুসোনা স্কুল থেকে বাড়ি ফির আসতে নারায়ণ বাবু তাকে একটু আদর করে বাড়ি ফিরে গেলো।
এদিকে বাবলু কথাটি শোনার পর থেকে মনে মনে বহু জল্পনা-কল্পনা করেছে। তবে কখনো কাউকে কিছু বুঝতে দিত না। ঘটনা জানার পর থেকে কখনো কখনো নিজের প্রতি নিজেই ধিক্কার জানাতো। ভাবতো সত্যিই তাহলে আমার মধ্যে পুরুষত্ব ছিল না। যদি থাকতো তাহলে আমার দ্বারা কেন রুমার গর্ভে সন্তান এলো না! তাছাড়া সন্তানের জন্য আমরা রুমার সঙ্গে বহু কলহ অশান্তি ঝগড়া করেছি। এমনকি রুমাকে আমরা বন্ধ্যা নারীর আখ্যা পর্যন্ত দিয়েছি। ঝগড়া অশান্তি আমরা এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলাম যে,তাতে রুমার আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।তাছাড়া আমি যদি আরেকটি বিয়েও করতাম তাতেও একই ফল দাঁড়াতো। বরং সংসারে শান্তি ফেরাতে রুমা যা করেছে ভালই করেছে। এতে সবাই শান্তি পেয়েছে। তাছাড়া রুমা সন্তানের জন্ম দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সে বন্ধ্যা নয়। তার সন্তান ধারণ ক্ষমতা আছে। আর সেটাকে প্রমাণ করতে আমরাই তাকে পরোক্ষভাবে বাধ্য করেছি। এরকম কথা ভাবতে ভাবতে সে কখনো কখনো আনমনা হয়ে যেতো। এবং শেষে ভাবতে লাগল যা হয়েছে সংসারের মঙ্গলের জন্যই হয়েছে। তাছাড়া আমি যখন রুমাকে অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করেছি, সে এখন আমার অর্ধাঙ্গিনী। সুতরাং তার জন্ম দেওয়া সন্তানে আমারও অধিকার আছে। সুতরাং রমার সন্তান মানে আমারও সন্তান। একথা ভেবে সে নিজের মনকে খুশি রাখতো। তাই এদের মধ্যে এখন কোনো অশান্তির লেশ মাত্র নেই,সুখের সংসার।
বছর দেড়েকের মধ্যে বাবলু চাকরি থেকে অবসর নিলো। এখন পেনশন এবং জমানো টাকার সুদ থেকে সংসার চলে। বাবলু অবসর নেওয়ার বছর তিনেকের মধ্যে ইহলোক ত্যাগ করে। মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে বাবলু রুমাকে কাছে ডাকে এবং বলে --মন থেকে সব মুছে ফেলো। আমি সব জানি,তোমার কাছে আমার একটাই অনুরোধ বাবুসোনা যেন কখনো কোন দিনও জানতে না পারে যে, সে আমার ঔরষজাত নয়।একথা শুনা মাত্র রুমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে তার গায়ের লোম গুলি যেন সজারুর কাঁটার মতো দাড়িয়ে গেলো। তার চোখমুখ লাল বর্ণ হয়ে গলা শুকিয়ে এলো। সে সঙ্গে সঙ্গে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো এবং স্বামীর পা দুটি জড়িয়ে ধরলো। এবং বলতে লাগলো-- আমাকে তুমি ক্ষমা করো। তুমি আমাকে ক্ষমা করো। তুমি ক্ষমা না করলে যে, আমার নরকে ও স্থান হবে না। আমি জানি আমার এই অন্যায়ের কোন ক্ষমা নেই।
একথা শুনে বাবলু রুমাকে বুকে টানার চেষ্টা করলো, কিন্তু সে ক্ষমতা তার আর নেই। তাই রুমাকে কাছে ডাকল এবং তার মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে বললো-- তোমার উপর আমার কোন রাগ নেই। তুমি সেদিন যা করেছ তা সংসারের মঙ্গলের জন্যই করেছ। তুমি এখন তোমার মনের সমস্ত সংকোচ ধুয়ে-মুছে আমাকে বিদায় দাও। এ কথা বলে সে তার শেষ নিঃশ্বাসটুকু বার করে দিয়ে এই জগৎ সংসারের সমস্ত মায়া মমতা ত্যাগ করে চিরতরে বিদায় নিলো।
কিন্তু তার এই শেষ মুহূর্তের কথা গুলো যেন, রুমার মনে স্মরণীয় হয়ে কান্নার জোয়ারে তাকে ভাসিয়ে দিতে লাগলো।
অপরদিকে নারায়ন বাবু তার পিতৃবাৎসল্যকে চেপে রাখতে পারলো না। সে তার জীবিত থাকাকালীন কাউকে বা সমাজকে দ্বিতীয় পুত্রের পরিচয় দিয়ে যেতে
পারলো না বটে। কিন্তু সে তার মৃত্যুর আগে বিবেকের তাড়নায় কোর্টে গিয়ে গোপনভাবে দ্বিতীয় পুত্রের নামে সম্পত্তির অর্ধেক উইল করে গেলো।
 তাতে শর্ত ছিল তার মৃত্যুর পরে যেন সম্পত্তির অর্ধেক ভাগ থেকে বাবু সোনাকে বঞ্চিত না করা হয়।

ইন্দ্রজিৎ রায়
ইন্দ্রজিৎ রায়


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

১৬ মে ২০২২

এক মুঠো পয়সা | প্রত্যুষ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়