মাতৃভাষার জয় | শুভব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
অ্যাওয়ার্ডস - ০৩
নাটক......
নাটক......
"মাতৃভাষার জয়"
শুভব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
কোলকাতা,পশ্চিমবঙ্গ,ভারত
চরিত্র –
- বৃদ্ধ ১
- বৃদ্ধ ২
- ছেলে ১
- ছেলে ২
- ছেলে ৩
- ছেলে ৪
- ছেলে ৫
স্থান – চায়ের দোকান
মঞ্চের এক কোণে কিছু ছেলে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছে। অন্য দিকে দুজন বৃদ্ধ গাছের তলায় বসে আছে। বৃদ্ধদের ওপর আলো ফেলা হতেই।
বৃদ্ধ ১ – বুঝলে ভায়া, আজকাল সমাজে কেউ আর বাংলা ভাষায় কথা বলতে চাইছে না। হয় ইংরেজি নতুবা হিন্দি। আমাদের মাতৃভাষার মুল্য এখন প্রায় নেই বললেই চলে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকুমার রায়, কুমুদ রঞ্জন সবই ইতিহাস।
বৃদ্ধ ২ – একদম ঠিক কথা বলেছো ভায়া। ব্যাঙ্ক, পোষ্টাফিস যেখানেই যাও না কো, হিন্দি ভাষী লোকেদের প্রাধান্য বেশী। বাঙালী যে কটা আছে প্রায় হাতে গুনে।
বৃদ্ধ ১ – তারা আবার কেউ বাংলায় কথা বলবেন না। তাদের হিন্দি ভাষাতেই কথা বলতে হবে। ইংরেজিও চলবে না।
বৃদ্ধ ২ – আমাকে বাবা শিখিয়ে দিয়েছিলেন কোন একটা কথা বলতে গেলে “হেয়” শব্দ যোগ করে দিলেই সেটা হিন্দি হয়ে যেতো। এখন সেই প্রসেসে কথা বলতে গিয়েও দেখেছি, ওরা বলে, আপ হিন্দি মে বাত কিজিয়ে। তোরা বাংলা দেশে বসে আছিস, আর বাঙালিদের ওপর লাঠি ঘরাচ্ছিস।
বৃদ্ধ ১ – মনে আছে, সেবারে আমি তিরুপতি বেড়াতে গিয়েছি। রাত প্রায় দশটা। ওখানকার লোকেরা নিজের দেশর লোকেদের ঘর দিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমরা সেখানে দাড়িয়ে আছি, আমাদেরকে পাত্তা পর্যন্ত দিচ্ছে না। শেষকালে আমাদের টুঁর ম্যানেজার তেলেগু না মালায়লাম ভাষায় কথা বলে, আমাদের জন্য ঘর ঠিক করে দেয়।
বৃদ্ধ ২ – আসলে কী জানো তো, আজকাল সরকারি চাকরি পাওয়া মানে, হাতে সোনার লাঠি পাওয়া। তাই এদের দেমাগ এতো বেশি। দোষ আমাদেরো আছে। কিছু কিছু বাঙালী আছে, যারা অবশ্যই তষামুদে, এদের সঙ্গে কথা বলে, কাজ করে বেরিয়ে যায়।
বৃদ্ধ ১ – ওরা শুধু দেখায়, আমরা শিক্ষিত। আর বাঁকি সব মূর্খ।
বৃদ্ধ ২ – একদম খাঁটি কথা বলেছ।
আলো এবার ফেলা হলো চায়ের দোকানের ওপর।
ছেলে ১ – ইখন বাংলাতে মাড়ওয়েরিদের রাজ ই রাজ।
ছেলে ২ – সহি বোলা তুনে। অভি বাঙ্গাল মে ব্যবসা কোন কর রহা হেয়, মাড়োয়ারি। উস কম্পানি মে বাঙ্গাল কে আদমি সুবাহ সে রাত তক আপনা সির ঝুকাকে কাম করকে জীবন কো বহা রহী হেয়। হম লোগ যো বলতে উসকো, য়ও লোগ অয়াহী করতে হেয়।
ছেলে ৩ – ব্যাঙ্ক, সরকারি অফিস মে ভী হিন্দি ভাষী অফিসার আজ হেয়। কাম ভী জলদী জলদী হো জাতা হেয়। কোই মুসিবাত আতা হেয় তো, তুরন্ত রাস্তে ভী নিকাল যাতা হেয়।
ছেলে ৪ – আরে ভাই, পেয়সা লো, কাম করো। মগর, যাহা যাহা, বাঙালী সালা হেয়, পেয়সা ভী লেগা, কাম ভী নেহী করেগা। ইয়হা কা সরকার কেয়ো ইস মনহুস লোগোকো কুর্সি দে তে হেয় না, সমঝ মে নেহি আতা। ইন লোগো কে হাত লাগা তো ধান্দা পুরা চৌপাট।
ছেলে ২ – সহি বোলা তুনে।
ছেলে ১ – এক স্যামায় থা, যব, লোগ বোলতা, What Bengal Thinks Today, India Thinks Tomorrow. মগর আজকাল, What India Thinks Today, Bengal obey those silently. (সবাই হাঁসতে থাকে)
ছেলে ২ – একদম কাম চোর হেয়। কাম কে নাম মে রুপেয়া ভি লেতে হেয়, আউর যো কাম ঝট সে হো যাতা হেয়, উসকো সাল ভ্র লাগা দেতা হেয়। ও লোগ বোলতে হে, হাম উসকী দেশ মে আকার কবজা করকে রাখা হেয়। হম কো বাংলা ভাষা সিখনা হোগা।
ছেলে ৫ – (প্রবেশ করে) কী রে খুব বাঙ্গালীদের নিয়ে ছাল চামড়া ছাড়ানো হচ্ছে দেখছি।
ছেলে ৩ – নেহি নেহি দোস্ত, আমরা তোমাদের গুণ গানই গাইছিলাম। আজ বাঙ্গাল না হোতা, আজ মাড়োয়ারী জাত কা ইমেজ জিরো হো জাতা।
ছেলে ৫ – বাংলার মানুষগুলো আজ আছে বলেই, তোরা এই দেশে ব্যবসা করে খেতে পারছিস। আর বাঙ্গালীরা চিরকাল গড়তে সাহায্য করে। কিন্তু কোন কারণে ক্ষেপে গেলে না, তোদের ঠাঁট বাঁটকে জলে ভাসিয়ে দেবে। আর বাঙ্গালিরা, চিরদিন এক শিক্ষিতদের পর্যায় পরে। তাই তারা তোদের ভাষা শিখে তোদের ভাষাতেই উপযুক্ত জবাব দিয়ে থাকে। সেখানে তোরা বাংলা ভাষা শিখতে ঘেন্না বোধ করিস।
ছেলে ১ – নেহি নেহি হাম লোগ বাংলা বোল ভী সকতে হেয়। আমরা বাংলা কুছু কুছু বলতে পারে। তুমাদের ওই যে কবি ঠাকুর আছে না, কী যেন নাম
ছেলে ৫ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছেলে ১ – উসকো ভী হম দিল সে শ্রদ্ধা করতে হেয়।
ছেলে ৫ – তাই। কথায় বলে, শক্তের ভক্ত হয় কিছু, তোমরা অবাঙ্গালিরা, ঠিক তাই।হিন্দি আমাদের দেশের ভাষা। কিন্তু বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। তাই তাকে অবমাননা করা আর দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেশের বিরোধিতা করা দুটোই সমান।
আলো ছড়িয়ে পরে সমগ্র স্টেজ জুড়ে।
বৃদ্ধ ১ – ঠিক বলেছো বাবা। আমরা দুজনেই এই কথাটাই আলোচনা করছিলাম। তোমার কথাগুলো আমরা মন দিয়ে শুনছিলাম। আমাদের মাটিতে অবাঙ্গালি কে আশ্রয় দিয়েছে কে, এই বাঙালি। আজ তারা এই মাতির ওপর দাঁড়িয়ে ব্যবসা কেন করতে পারছে, বাঙ্গালিরা অনুমতি দিয়েছে বলেই।
বৃদ্ধ ২ – শুধু কি তাই, আজ বাংলার মতিভ্রম করেছে কারা? তোমাদের সমাজ। তাইতো আজকে বাংলার ছেলে মেয়েরা এত উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠতে পেরেছে। তোমাদের সাথে তাল দিতে গিয়ে, আজকে বাঙ্গালীরা বিদেশী সংস্কৃতিকে নিজের বলে ভাবতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তন হয়েছে শুধু এক দশকের মধ্যে।
ছেলে ৫ – বাংলা ভাষাকে বাঁচাতে বাংলাদেশের কত মানুষ আজ শহীদ হয়েছে, ভুলে যাব কি করে। সেই ভাষা আন্দোলনের দিনগুলোর ইতিহাস, বারে বারে আমাদের মনকে কষ্ট দিয়ে থাকে।
ছেলে ১ – ঠিক বলেছ দোস্ত। আমাদের মাড়োয়ারিদের ইতিহাস নিয়ে আমরা যেমন গর্বিত, বাংলার মানুষের ও তেমনি সোচ থাকতে পারে। আমরা লজ্জিত, তোমাদের ভাষাকে আমরা নিজের করে নিতে পারি নি। কিন্তু তোমরা আমাদের ভাষাকে নিজের করে নিতে পেরেছো। আমাদেরকে তোমরা আপন করতে পেরেছো। তোমরা না থাকলে, আমরাও কিচ্ছুটা করতে পারতাম না। আজকের পর থেকে আর কোন বাঙ্গালীকে আমরা ছোট করে দেখবো না। হাজার হলেও আমরা সব ভারত মায়ের সন্তান।
বৃদ্ধ ২ – এসো সবাই, আমরা আজ এক হয়ে প্রাণ ছেড়ে সেই গানটা গাই -
বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল--
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান ॥
বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ--
পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান ॥
বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা--
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান ॥
বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন--
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান ॥
লেখকের পরিচিতি:
ছড়া কবিতা, পদ্য ও গদ্য কবিতা লেখা ছাড়াও, গল্প লিখি। নাটক ও চিত্রনাট্য লেখার প্রয়াস সফল হয়েছে। চলচ্চিত্র ও নাটকে অভিনয় করি আমি। ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন