আন্দামানে বাংলা মাধ্যমের দৈন্যদশা | সামসুজ জামান

অ্যাওয়ার্ডস - ০৩
প্রবন্ধ......
"আন্দামানে বাংলা মাধ্যমের দৈন্যদশা "
সামসুজ জামান
কোলকাতা,পশ্চিমবঙ্গ,ভারত

আন্দামানের বাঙ্গালীদের বর্তমান ভাষাগত অবস্থা নিয়ে দুই চার কথা লেখার সুযোগ পেলাম। খুব গভীর তত্ত্বকথার মধ্যে না গিয়ে গল্পচ্ছলে সেই অবস্থার কিছুটা পর্যালোচনা করার চেষ্টা করছি। এ কথা সকলে বিদিত আছেন আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ৫৭২ বিচ্ছিন্ন দ্বীপের সমষ্টি। তবে বর্তমানে কেবলমাত্র ৩৮ টি দ্বীপে বসবাস করার উপযুক্ত পটভূমি ও পরিবেশ বিদ্যমান। কোনও কোনও দ্বীপ এখনো  প্রায় দুর্গম। সে যাই হোক কবি অতুল প্রসাদ সেনের কথায় -- "নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান / বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান।// এই কবিতার সার্থক প্রতিচ্ছবি দেখা যাবে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। এখানে বর্ণ, ভাষা, ধর্ম সমস্ত কিছুর অপূর্ব এক সম্মিলন ঘটেছে। কিন্তু এটাও বাস্তব যে এই মিল মিশে ধর্ম, রাজনীতি, ভাষা, সংস্কৃতি, শিল্প, সংগীত - সবকিছুই যেন তার স্বতন্ত্রতা হারিয়ে ফেলেছে এবং বলাই বাহুল্য একটা আন্দামানের নিজস্ব সংস্কৃতির ভাবধারা গড়ে উঠতে চেয়েছে এসবের মাঝে।
প্রথমে কথা প্রসঙ্গে শুনেছিলাম পরে স্বচক্ষে দেখেছি যে আন্দামানে এক একটা পরিবার আপনি এমনও আছে যে পরিবারের কর্তা হয়তো মুসলিম, পরিবারের গিন্নি হয়তো হিন্দু আর তাদের সন্তান হয়তো খ্রিস্টান। সহজ কথায় বললে ধর্ম একেবারে ঘেটে ঘ হয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার! সুতরাং কোন ভাষা এখানে যে তার স্বকীয়তা ধারণ করে রাখবে সেটা ভাবনা চিন্তার মধ্যে রাখাটা বাহুল্য ছাড়া আর কিছুই নয়। আবার দ্বীপান্তরে পাঠানো পুরনো দিনের মানুষ পুনর্বসতি প্রাপ্ত মানুষজন, বিভিন্ন চাকরি-বাকরি ব্যবসা-বাণিজ্য উপলক্ষে একত্রিত হওয়া মানুষজন, সবে মিলে মিশে একটা বিচিত্র পরিবেশের জন্ম দিয়েছে। বাঙালি, বিহারী, ওড়িয়া, তামিল, তেলেগু, মালায়ালী কোন ভাষার মানুষ পাবেন না এখানে? দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে এই নীতি থেকে সকলেই তার নিজস্বতা বিলিয়ে দিয়েছে। নিজের ঐতিহ্য সংস্কৃতি উজাড় করে ঢেলে দিয়ে অন্যের অনেক কিছু আত্মস্থ করতে গিয়ে এক অদ্ভুত পরিবেশ। এমন মিশ্র সংস্কৃতির মধ্যে ভাষা অনেক ক্ষেত্রেই একটা জগাখিচুড়ি পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। 
অনেকেই জানতে চান এখানে মূল ভাষাটি কি? উত্তরে বলা যায় মোটামুটি ভাবে হিন্দি ভাষাটিকে সকলে গ্রহণ করেছে কাজ চালানোর মাধ্যম হিসেবে। সরকারি মহাবিদ্যালয় এবং উচ্চ বিদ্যালয়ে কাজ করার সুবাদে দেখেছি একটি বিদ্যালয়ে বাংলা ইংরেজি হিন্দি তামিল ইত্যাদি প্রায় চারটি মাধ্যম বর্তমান রয়েছে। যে যার নিজের মতো ভাষায় নিজের ভাষা গোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যে কথাবার্তা বললেও যখন অফিস আদালতে মিলিতভাবে অবস্থান করছেন তখন সকলেই সকলের বোঝার মত ভাষা অর্থাৎ হিন্দি ভাষার মাধ্যমে কথাবার্তা বলার চেষ্টাচরিত্র করেন তাতে সকলের জন্যই যথেষ্ট সুবিধা হয়।
কিন্তু এখানে বিশেষ বলার মত বিষয় হচ্ছে অন্যের ভাষাকে আপন করার থেকে নিজের ভাষাকে বিসর্জন দেওয়ার আগ্রহ অনেকের রক্তে রক্তে ঘুরে বেড়ায়। নিজের সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর ঐকান্তিক কামনা অনেকের মধ্যে বিপুল পরিমাণে কাজ করে। আমরা বাংলা ভাষা কেন্দ্রিক কিছু ভাবনাচিন্তা বিনিময় করছি। তাই বলা যায় মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ কথাটা নানাভাবে বললে বা উপলব্ধি করলেও কার্যক্ষেত্রে উল্টো ব্যাপারটাই দেখা যায়। যিনি অন্যকে নিপুনভাবে জ্ঞান দিয়ে এসেছেন যে সন্তান সন্তানের ক্ষেত্রে মাতৃভাষায় শিক্ষাদান বাঞ্ছনীয়, সেই ব্যক্তি আবার নিজের সন্তানের পড়াশোনার ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমকেই বেশি গ্রহণ করেন। আর স্বাভাবিক প্রবণতা থাকায় বেশিরভাগ ইংরেজি মাধ্যমের পড়ুয়াদের প্রকৃতি-পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তাদের ঘরের বা পরিবারে শিক্ষিত মানুষের অভাব। ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষিত ব্যক্তি সে পরিবারে নেই তো বটেই এমনকি বাংলা মাধ্যমেও তারা শিক্ষাক্ষেত্রে তেমন কিছু অগ্রসর হতে পারে নি। তবুও এই অবস্থায় তাদের সন্তানাদি দের ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা দান করানোর পক্ষে একটা বিপুল আগ্রহ দেখা যায়।
আমরা আন্দামানে পা রাখার প্রথম দিন থেকেই একটা ব্যাপার দেখেছি যে এখানে বাংলা ভাষা সংস্কৃতি নানাভাবে অবহেলিত অবস্থায় বিরাজ করছে। বাংলা মাধ্যমের প্রতি সরকারি অনুকূল্যের অভাব বিপুলভাবে পরিলক্ষিত হয়। বহুদিন থেকেই অবস্থার প্রায় পরিবর্তন হয়নি তাই বাংলা মাধ্যমের পড়ুয়াদের পড়াশোনার ব্যাপারটা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। এমনিতেই একটা বাংলা মাধ্যমের পড়ুয়ার অবস্থাটা আপনারা আন্দাজ করতে পারবেন পরবর্তী বক্তব্য থেকে। বাংলা মাধ্যমের একটা শিশু প্রথম শ্রেণী থেকেই ইংরেজি ভাষার বইটি তো বটেই সাথে গণিত বিষয়ের বইটিও ইংরেজি মাধ্যমের বই কেন্দ্র করে পাঠ করে। ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে তার বিজ্ঞান বিষয়ক বইটিও ইংরেজি মাধ্যমে পেতে শুরু করে। নবম শ্রেণী থেকে আবার সমাজ বিদ্যা অর্থাৎ ইতিহাস ভূগোলের পাঠও গ্রহণ করতে হতো ইংরেজি মাধ্যমের গ্রন্থ অবলম্বন করে। দেখা যাচ্ছে একটি ছাত্র বা ছাত্রী বাংলা মাধ্যমের পাঠ গ্রহণ করছে বটে কিন্তু একমাত্র বাংলা বিষয় ছাড়া সমস্ত বই-পত্রই তাকে ইংরেজি মাধ্যম অবলম্বন করে গ্রহণ করতে হয়। তারা মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক পায় না। সন্তানের সুবিধার্থে পিতা-মাতা হয়তো পশ্চিমবাংলা বা ত্রিপুরার বিভিন্ন পাঠ্যগ্রন্থ সংগ্রহ করে নিয়ে যান সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যাবার জন্য কিন্তু সেক্ষেত্রে দেখা যায় পাঠক্রমের সামান্য ১০ থেকে ২০ শতাংশ পাঠ্যসূচি এই বাংলা গ্রন্থ-পুস্তক থেকে মেলে। বাকি গ্রন্থটি তার ক্ষেত্রে অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।। আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাবা-মা অশিক্ষিত হওয়ায় ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপন করার ক্ষেত্রে বিষয়টা যথেষ্ট অসহায় অবস্থায় এসে দাঁড়াতো। ছাত্র-ছাত্রীর এই সংকট কাটানোর জন্য শিক্ষক শিক্ষিকারা অনেক ক্ষেত্রেই ছাত্রছাত্রীদের নোট দিয়ে সাহায্য করতে চান। এক্ষেত্রে অকপটে একটা বিষয় বলাই যায়। আন্দামানের শিক্ষা জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার ফলে একটা প্রবণতার পরিষ্কার ছবি পেয়েছি তা হলো শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা এমন অনেকের বিন্দুমাত্রই থাকে না অথচ অর্থ উপার্জনের ভাবনা চিন্তা থেকে তাঁরাই এখানে শিক্ষক হয়ে যান. যেহেতু শিক্ষকদের বেতন সংসার যাত্রা নির্বাহ করার জন্য যথেষ্ট লোভনীয় কিন্তু এই ব্যপারটা সচরাচর অন্যত্র দেখা যায় না। এইসব গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানো শিক্ষকেরা একটা পুরনো খাতা অবলম্বন করে তা থেকে বছরের পর বছর একঘেয়ে নোটস দিতে থাকেন। তাই অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রগণ্য ছাত্রছাত্রী পুরনো পড়ুয়াদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা নোটস আগেভাগেই নিজেদের খাতায় লিপিবদ্ধ ক’রে প্রশংসা কুড়োনোর চেষ্টা করে। এবং অনেক ক্ষেত্রেই অনেক মানুষজনকে বলতে শোনা যায়, মুখ্য ভূমিতে যেখানে পড়াশোনা বলতে লেখার থেকে পড়ার গুরুত্ব অনেক বেশি হয় সেখানে আন্দামানে লেখাপড়ার নামে শুধু লেখাই দেখতে পাওয়া যায়। ছাত্র বা ছাত্রীরা পড়া তেমনভাবে করে না।  আরো মজার কথা এমন কিছু অযোগ্য শিক্ষক শিক্ষা জগতে নিযুক্ত হন যারা নোট দিতে দিতে পানের পিক ফেলা বা অন্য কোন কারণে হয়তো ক্লাস ছেড়ে বাইরে গেলেন, কয়েক মুহূর্ত পরে ফিরে এসে কোনো কারণে পাল্টে যাওয়া পাতার একটা নির্দিষ্ট অংশ থেকে আবার নোট দিতে শুরু করেন। না বুঝে লিখতে থাকা ছাত্র-ছাত্রীরা ঘরে গিয়ে যখন তার পড়াশোনা বোঝার চেষ্টা করে তখন তারা অথৈ জলে পড়ে যায়। বেশিরভাগ ঘরেই বাবা-মা সাহায্যকারী হিসেবে থাকার মত না হওয়ায় ছাত্রছাত্রীর ব্যাপারটা বোঝার রাস্তায় থাকে না। আর ছাত্র-ছাত্রী তখন বাধ্য হয়ে পড়াশোনার নামে একটা বিরক্তিকর পাঠ মুখস্ত করার চেষ্টা করে। পরের দিন শিক্ষককে ব্যাপারটা বলে অকারণে শারীরিক নিগ্রহের হাতে পড়ার মতো মনোগত ইচ্ছা তাদের থাকে না। 
ভাষা তো চলমান বটেই। একটা নদী তার চলার পথে বিভিন্ন জলধারা থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে নিজেকে যেমন স্ফীত করে ভাষাও অনেকখানি তাই।সেই হিসেবে এখানেও বাংলা ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষার যোগাযোগ হওয়া খুব স্বাভাবিক ব্যাপার যেহেতু বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করেন। কিন্তু এটা দুঃখের বিষয় এখানকার মানুষের মধ্যে বিশেষত বাঙ্গালীদের মধ্যে নিজস্বতা হারিয়ে ফেলার একটা সহজাত প্রবণতা দেখা যায় সর্বত্রই। অন্য ভাষাভাষীদের আপন করে নেবার ইচ্ছে থেকে তারা নিজেদের মুখের ভাষা বিসর্জন দিয়ে অপর ব্যক্তির ভাষাকে গ্রহণ করেন এটা মন্দ ব্যাপার নয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় নিজস্বতা বিসর্জন দিয়ে পরের ব্যাপারটা গ্রহণ করার খারাপ প্রবণতাটা এখানে বিদ্যমান। তাই দুজন বাঙালি যখন নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলাবলি করছেন তখনও অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় দুজনই তাদের মুখের ভাষাবাংলা ভাষাকে বিসর্জন দিয়ে হিন্দির মাধ্যমে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে অনেক ক্ষেত্রেই দুজনই যেন একটা প্রচ্ছন্ন শ্লাঘা বোধ করে থাকে। আবার যেসব বাচ্চারা বাংলা মাধ্যম ছেড়ে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করছে তাদের ঘরের পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রেই তেমন উচ্চাঙ্গের নয় সুতরাং নিজেরা ইংরেজিতে কথাবার্তা বলার মানসিকতা রাখে না। কিন্তু তাই বলে যেহেতু তাদের সন্তান ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছে তাই বাংলা বলাটা তাদের কাছে অচ্ছুতের মত ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় এবং এরা খুব খুশি হয়ে হিন্দি ভাষা অবলম্বন করে কথাবার্তা বলতে থাকে। অনেকের ভাবটা এমন থাকে যেন হিন্দি ভাষার মাধ্যমে কথাবার্তা না বললেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। আর যারা বাংলার মাধ্যমেই কথাবার্তা চালাতে চান তারা তাদের ভাষার প্রতি সম্মান না জানিয়ে নিজেদের বাংলা ভাষার মধ্যে অকারণে অন্য ভাষার বিভিন্ন জগাখিচুড়ি মিশ্রণ ঘটিয়ে থাকেন যা হাস্যকর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলা পত্র পত্রিকার প্রসঙ্গ এলে বলতে হয় এখানে বাংলা সংবাদপত্র নেই। কলকাতা থেকে যাওয়া সংবাদপত্রের উপরে মানুষকে একান্ত ভাবে নির্ভর করতে হয়। তাই আজকের ইন্টারনেটের দ্রুতগামী অগ্রগতির জমানায় সেই সংবাদপত্র কতখানি গ্রহণযোগ্যতা রাখে এটা নিশ্চয়ই পাঠকের বুঝে উঠতে দেরি হয় না। সংবাদপত্রের সংবাদ অনেক সময়ই বাসি পচা হয়ে দাঁড়ায়। আর পত্র-পত্রিকা সেই অর্থে নেই তবুও দুটো একটা যা আসে তার সম্পাদকরা গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়লের মত নিজেদের অবস্থানকে ধরে রেখেছেন। সকলকে আপন করে এগিয়ে চলার প্রবণতা তাদের একদমই নেই। বরং বনগাঁয়ে শিয়াল রাজার মত তারা নিজেদের পণ্ডিত্য দেখাতেই মগ্ন হয়ে থাকেন। বাংলা অনুষ্ঠান সেই অর্থে হয় না। মাঝেমধ্যে কলকাতা থেকে আসা ছোটখাটো বিভিন্ন দলের সংগীত পরিবেশন-কোথাও কোথাও গ্রহণযোগ্য হয় কোথাও বা হয় না। সরকারি অনুষ্ঠান হলে সেখানে হিন্দির প্রাধান্য থাকবেই এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। স্কুল কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও বাংলা প্রায় চলে না। অনেক অনুষ্ঠানে এমনও দেখা গেছে আঞ্চলিক কোন বাংলা সংগীত বা নৃত্য পরিবেশন এর ব্যবস্থা হলেই বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ/অধ্যক্ষা সেটাকে নাকচ করে দেন। আবার একই অনুষ্ঠান যখন বাংলা আঞ্চলিক হওয়া সত্বেও বলা হয় এটি অসমীয়া কিংবা ওড়িয়া লোকগীতি তখন না বুঝেও সেই অধ্যক্ষ বা অধ্যক্ষা সেই সংগীত নৃত্য পরিবেশনের অনুমতি দিয়ে থাকেন। প্রতিবেদক স্বয়ং এই মর্মান্তিক বাস্তবের মুখোমুখি হয়েই এই তিক্ত অভিজ্ঞতা-নির্ভর গল্প হলেও সত্যি উপলব্ধি তুলে ধরেছে এই প্রবন্ধে।  
লোক সংখ্যার অনুপাতে বাঙ্গালীদের অনেক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও আকাশবাণী কিংবা দূরদর্শনে বাংলার অবস্থা একেবারেই কোণঠাসা। আগে আকাশবাণীতে অনেক অনুষ্ঠান বাংলা ভাষায় প্রচারিত হতো। স্থানীয় মানুষজনকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের লেখা বা তাদের পরিবেশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো। এখন রেকর্ডিং প্রায়ই বন্ধ। রেকর্ডিং-এর জন্য কেন্দ্র থেকে নাকি উপযুক্ত পারিশ্রমিক বা দক্ষিণার অর্থ আসেনা। তাই আকাশবাণীতে পুরনো অনুষ্ঠান থেকে যেসব রেকর্ডিং গুলো চালু আছে সেগুলোই বারবার করে শোনানো হয়ে থাকে।
এমনিতেই সরকারি বিভিন্ন বিভাগে নতুন নিয়োগ প্রায় বন্ধ। তাতে বাংলা বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগের হাল আরও খারাপ। সারা আন্দামানের মধ্যে উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় অন্তত গোটা ১৫ কিন্তু এই মুহূর্তে ৫-/৬ টি বিদ্যালয় তাদের উচ্চতর পর্যায়ের বিদ্যার্থীদের বাংলা শিক্ষক নিযুক্ত করতেই পারছে না।  স্নাতকোত্তর শিক্ষকের অভাব। অনুপযুক্ত হয়েও যারা শিক্ষা দান করেন, অনেক সময় বাধ্য হয়েই তাদের তা করতে হয় কর্তৃপক্ষের চাপ প্রয়োগের শিকার হয়ে। উপযুক্ত শিক্ষকের ঘাটতি থাকায় এমনও দেখা গেছে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বাংলা বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা শিক্ষক বা শিক্ষিকা একাদশ দ্বাদশ শ্রেণীর বাংলা পড়ানোর দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন কর্তৃপক্ষকে খুশি করার তাগিদে! অপেক্ষাকৃত নিচু ক্লাসেও যারা বাংলা পড়ান তারা নিজেরা অনেকেই বাংলা ভাষার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কই করতে পারেননি। স্কুল পরিদর্শনের সময় একবার দেখেছিলাম অষ্টম শ্রেণীতে পাথদানের সময় এক শিক্ষক দ্বন্দ্ব শব্দের অর্থ হিসেবে ‘ফাইটিং’ কথাটিকে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছিলেন। ব্যাপারটা তার সুনজরে আনার চেষ্টা করা হলে তিনি রীতিমতো তর্ক জুড়ে দিয়েছিলেন যে ফাইটিং ছাড়া কথাটাকে কোনমতেই বুঝিয়ে তোলা সম্ভব নয়। এমন অনেক আজব কুদরতি আন্দামানের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অজস্র।
বাংলা মাধ্যমের পাঠ্য পুস্তক তৈরি করার সুবাদে অনেকবার প্রচুর টাকা পয়সা বিসর্জন দেয়া হয়েছে কাজের কাজ কিছু পাওয়া যায়নি। ২০১৬ তে একটা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। সি বি এস ই-র  পাঠ্যপুস্তক ইংরেজি এবং হিন্দি থেকে বাংলায় রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল শিক্ষা বিভাগের বদান্যতায় এবং বলাবাহুল্য সেই দায়িত্বের অনেক খানি এই প্রতিবেদকের কাঁধে অর্পণ করা হয়েছিল। প্রতিবেদক নিজে কো-অর্ডিনেটর এবং অনুবাদক হিসেবে কাজ করেছিল। অনেক রক্ত জল করে সত্যি সত্যি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক বাংলায় অনূদিত হয়েছিল।  ব্যাপারটা সত্যি সত্যি বহু ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবকের কাছে আশীর্বাদ স্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শিক্ষা বিভাগ ও স্বীকৃতি স্বরূপ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সমাদর করে সম্মাননা জানিয়েছিল। ২০১৭ সালের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে আন্দামান প্রশাসনের সর্বোচ্চ প্রশাসক লেফটেন্যান্ট গভর্নর এই সমস্ত শিক্ষক যারা অনুবাদকের কাজ সফল করেছিলেন তাদেরকে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের প্রশস্তি পত্র প্রদান করেন।
মরুভূমিতে মরুদ্যান-এর এমন সুসংবাদ আন্দামানের বাংলা মাধ্যমে কমই আছে। বাকি সব ক্ষেত্রেই আন্দামানের বাঙ্গালীদের অবস্থা বড় করুণ। নানাভাবে এরা বিপর্যস্ত হয়ে আছে। অ-বাঙালি কর্তা ব্যক্তিরা বাঙ্গালীদের করুণ অবস্থার মর্ম উপলব্ধি কিছুতেই করতে পারেন না। তাদের অনেকেরই অবস্থা- কবি অপূরব দত্তের " স্কুলে কেন বেঙ্গলিটা পড়ায় না ইংলিশে " – এই রকম ভাবের। তবে এর পেছনে দায়ী বাঙালিরা নিজেরাই। কারণ হিসেবে বলা যায় নিজেদের মাতৃভাষার প্রতি তাদের ভাব ভালোবাসার অভাব যতখানি, ঠিক ততখানি দায়িত্ববোধ এবং সচেতনতার অভাবে তারা সত্যি সত্যি বিপথগামী হয়ে এগিয়ে চলেছেন সামনে।
 তাই আন্দামান ভ্রমণ আপনার কাছে যতখানি উপভোগ্য ও আকর্ষক, এই আন্দামানের বাংলা ও বাঙ্গালীদের মাতৃভাষা কেন্দ্রিক দৈন্যদশার এই কাহিনী ঠিক ততখানিই বেদনা-বিধুর। যাঁরা আন্দামান ভ্রমণের সুন্দর স্মৃতি নিয়ে গর্ব অহঙ্কার করেন অথবা যাঁরা আগামী দিনে আন্দামানের নিসর্গসুধা পান করার অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁরা যদি মনের মাঝে এই অনুভূতিপ্রবণ কাহিনীকে স্থান দিয়ে ফেলেন, তাহলে হয়ত করুণ দীর্ঘশ্বাস মাঝে মাঝে আপনাকে তাড়া করে ফিরবে।                              

আন্দামানে বাংলা মাধ্যমের দৈন্যদশা | সামসুজ জামান

লেখক পরিচিতি:
পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা থানার টোলা গ্রামের বাসিন্দা। পিতা স্বাধীনতা সংগ্রামী-খলিলুর রহমান।
মাতা- সেতারা বেগম। স্কুল জীবনে প্রবাহ পত্রিকায় প্রথম লেখা প্রকাশিত এবং পুরস্কার প্রাপ্ত।
তারপর থেকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, আকাশবাণী-দূরদর্শনের বিভিন্ন চ্যানেলে লেখালেখি ও গান-বাজনা সূত্রে জড়িত।
আন্দামানে কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত কলেজ এবং সরকারি শিক্ষা বিভাগে ৩০ বছর যুক্ত থেকে এখন অবসরপ্রাপ্ত।
কেন্দ্রীয় শিক্ষা বোর্ডের পাঠ্যপুস্তকের অনুবাদক ও কো-অর্ডিনেটর। এই সূত্রে আন্দামান প্রশাসনের সর্বোচ্চ প্রশাসক লেফটেন্যান্ট গভর্নরের পুরস্কারপ্রাপ্ত।
লেখালেখি সূত্রে সরকারি বেসরকারি বহু পুরস্কার প্রাপ্ত। সঙ্গীত বিভাগে আন্দামান-নিকোবর রাজ্যস্তরে প্রথম স্থানাধিকারী হয়ে জাতীয় যুব উৎসবে যোগদানের সম্মান এবং গৌরব ।
প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা- ১৩ টি।।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

১৬ মে ২০২২

এক মুঠো পয়সা | প্রত্যুষ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়