কাব্য নাট্য | দ্রৌপদীর আক্ষেপ | হীরামন রায়
কাব্য নাট্য......
"দ্রৌপদীর আক্ষেপ"
হীরামন রায়
রানাঘাট,নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ,ভারতবর্ষ
প্রথম পর্ব
দ্রৌপদী:: আমি দ্রৌপদী
হ্যাঁ আমি দ্রুপদ কন্যা দ্রৌপদী,
হে অর্জুন, হে পান্ডব কুলের শ্রেষ্ঠ বীর,
তুমি বীরশ্রেষ্ঠ সমগ্ৰ মহা ভারতের ।
তোমার শৌর্য বীর্য, তোমার তেজ গাম্ভীর্য, তোমার রূপ,
তোমার অস্ত্র সঞ্চালন কৌশল, ধনুর্বিদ্যায় তুমিই শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ,
তোমার বলশালী প্রবল শক্তির লক্ষ্যভ্রষ্ঠহীন বর্ষা নিক্ষেপণ,
আমাকে তোমার প্রতি দুর্বল করেছিল।
তাই তো তোমাকে সেই স্বয়ম্বর সভাস্থলে সেই প্রথম দেখামাত্রই
যৌবনের বারাণসীতে প্রেমের ঝরনাধারা প্রবাহিত হতে শুরু করে,
সেইক্ষণে মনের সংগোপনে তোমাকেই ভালবেসেছিলাম পার্থ।
কর্ণ কি পারতো না ধনুকের গুণ পরাতে, কর্ণ কি পারতো না
জলের উপর প্রতিফলিত ঘুর্ণায়মান মৎস্যের চোখে
বাণ নিক্ষেপ করতে, পারতো--।
কর্ণের শৌর্য বীর্যের প্রতি আমার ও দুর্বলতা তৈরি হয়নি তা নয়,
কিন্তু তাকে আমিই এই প্রতিযোগিতা থেকে বিরত করেছিলাম,
শুধু মাত্র সুতপুত্র বলে।
অন্দরমহল থেকে যখন শুনেছি তোমার আগমণ, মনের অন্দরে
চিকচিক করে উদ্বেলিত হয়েছে ক্ষনজন্মা ভালোবাসা,
তারপরেই তুমি এলে, এলে কিনা ছদ্মবেশে, কিন্তু আমার চোখ
তোমাকে চিনতে একটু ও ভুল করেনি।
তাই তো কর্ণকে প্রতিযোগিতা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম নির্দ্বিধায়।
হ্যাঁ হ্যাঁ কৌন্তেয় তোমাকে আমি আমার মত করে পাবো বলে।
যজ্ঞের অনল থেকে উত্থিত এই যাজ্ঞসেনীর সমকক্ষি হিসাবে
একমাত্র তোমাকেই বেছে নিয়েছিলাম সেদিন।
কি ভুল করেছিলাম সেদিন বল ? বল ধনঞ্জয়!
অর্জুন: ভুল তো তুমি করনি পাঞ্চালী। ভুল করেছি আমি,
আমিই সেদিন ছদ্মবেশে ছলনা করেছি শুধু তোমার সঙ্গে,
শুধু মাত্র তোমাকে পাবো বলে। দ্রুপদ রাজের কন্যা তুমি,
তোমার রূপ যৌবন, তোমার শক্তি সাহস, আর তোমার অকুতোভয়
শুনেছি লোকমুখে, তাইতো শ্যামাঙ্গীনী লাবণ্যময়ী সেই তোমাকে
মনের অজান্তেই একটু একটু করে ভালোবেসে ফেলেছি অলক্ষে,
ভালোবেসেছি সেই কৈশোর কাল থেকে ।
কিন্তু এমন সুযোগ আসবে তা ভাবতেই পারিনি বীরাঙ্গনা।
যখন শুনেছি তোমার স্বয়ম্বর অনুষ্ঠিত হবে আর স্থির থাকতে পারিনি।
বনবাসী আমরা তাইতো যে কোন উপায়ে তোমাকে পাবার জন্য
ছদ্মবেশ ধরতে একটুও কুন্ঠাবোধ করিনি।
জানো সৈরিন্ধ্রী তোমাকে পাবার জন্য এই ছলনা যদি অপরাধ হয়
তাহলে আমি ঘোর অপরাধী।
দ্রৌপদী: না না কৌন্তেয় আমি তো ঐ দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম।
গৌরিকবরন দৃপ্তজ্যোতী সৌম্যকান্তী আমার প্রাণনাথ,
বলবীর্যশালী সে তুমি ছাড়া আর কাউকে আমার ভালোবাসার উপবনে
স্থান দিতে পারতাম না প্রিয়তমে।
অর্জুন:: সে আমিও বুঝতে পেরেছিলাম তোমার চক্ষুরুনমিলিত দৃষ্টি থেকে।
যখন কর্ণ বিচ্যুত হল স্বয়ম্বর সভাস্থল থেকে।
বুঝতে পেরেছিলাম যে পরাক্রমশালী যোদ্ধা কর্ণকে
শুধু মাত্র সুতপুত্র বলে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলে তুমি,
নিশ্চয় তার পিছনে কোন না কোন কারন তো একটা আছে।
তবে এটা বুঝতে পারিনি যে তুমি আমার জন্য
অধীর অপেক্ষায় ছিলে অগ্নিকন্যা ।
আমার ব্রাহ্মন বেশি রূপেও তুমি মোহিত হয়েছিলে,
ধনুকের গুণ পরাবার সময় তোমার দিকে এক পলক দেখেই
বুঝতে পেরেছিলাম, বুঝেছিলাম মৎস্য চোখে বাণ নিক্ষেপিত
হওয়ার নিমেষের মধ্যে তুমি ছুটে এলে তোমার হাতে বরমাল্য নিয়ে,
আমার গলায় পরিয়ে দিয়েছিলে স্বহাস্য বদনে।
আমার ও হৃদয় পরিতৃপ্ত হল,
আঃ চিরশান্তি তোমাকে এজন্মের মত আমার করে পাবার আশা
পুরণ হয়েছিল সেইক্ষনে, এ যেন চিরপ্রাপ্তি।
দ্রৌপদী:: আমার ও সেই চরম প্রাপ্তি মুহূর্ত যে কি আনন্দঘন আলোড়নে
উদ্বেলিত হচ্ছিল তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারছিলাম না পার্থ।
তুমি এবং তোমার ভাতৃগন নিয়ে এলে তোমার গৃহে।
সেইক্ষণ থেকে শুরু হলো আমার আশালতার মৃত্যু।
হে গান্ডিবী তোমার লজ্জা করেনা যাকে স্বয়ম্বর থেকে জয় লাভ করে
বাড়ি নিয়ে এলে, যাকে ভালোবাসলে। তাকে মায়ের একটি মাত্র কথায়
পঞ্চভ্রাতার সঙ্গে ভাগ করে নিতে একটুও কুন্ঠাবোধ করলেনা ।
তোমাকে বীরপরাক্রমী বুদ্ধিদীপ্ত পুরুষ ভেবেছিলাম।
কিন্তু একি দেখলাম । ধিক্--।
অর্জুন:: কি করণীয় ছিল আমার বল সৌরিন্দ্রী।
মাতৃ আজ্ঞা পালনে আমরা যে বদ্ধপরিকর, কি করতে পারতাম আমি!
তোমার হাত শক্ত ভাবে মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে রাখতে!
পারতাম না কৃষ্ণা, আমার জ্যেষ্ঠ ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির
এবং মাতা কুন্তীকে উপেক্ষা করা আমার দুঃসাধ্য ছিল।
তাইতো নীরব থেকে আমার আপন ভোলা রত্নাবলীকে
চোখের সামনে বিভাজন হতে দেখতে দেখতে
নিজের স্বযতনে লালিত ভালোবাসার মরন দেখছিলাম পাঞ্চালী।
আর ভাবছিলাম এ দেখার থেকে আমার মরণ হলনা কেন?
দ্রৌপদী:: আমার ও তখন মরে যেতে ইচ্ছা করছিল শব্দভেদী।
এই মন এই দেহ সব কেমনে ভাগ করবো সকলের সাথে বল, বল পার্থ !
যে মন শুধু মাত্র তোমাকেই সঁপেছি
তা কেমনে আর অন্য কাউকে দান করবো বলো অর্জুন।
অর্জুন:: পারিনি পারিনি দ্রৌপদী, এই দুঃসহ যন্ত্রনা
তখন আমি সহ্য করতে পারছিলাম না।
শুধু মাত্র তোমার পরমপ্রিয় কৃষ্ণ এসে এর সমাধান করল। নইলে--।
দ্রৌপদী:: নইলে সব ছেড়ে আবার চলে যেতে বনে তাই তো।
তা হয়তো পারতে না পার্থ, মাকে ছেড়ে, প্রাণধিক প্রিয় ভাতৃগনকে ছেড়ে,
সে কাজ তুমি করতে পারতে না।
তোমার মায়ের কথা শেষমেশ প্রতিষ্ঠা পেল প্রিয় কৃষ্ণ ও নারদের
সাহচর্যে।
প্রতিষ্ঠা পেল এক বছর করে এক এক স্বামীর নিকট থাকতে হবে আমাকে।
ছিঃ ভাবতে পারছিনা ভাবতে পারছিনা
আমাকে বরন করে নিতে হবে এই ঘৃন্য জঘন্যতম নিষ্ঠুর দন্ডবিধি ,
তাহলেও সব মেনে নিয়েছিলাম, আসলে আমরা নারী তো ---
তাই নারদের পরামর্শে এক বছর পর আগুনের উপর নিজেকে শুদ্ধ করে
অপর স্বামীর ঘরে, মেনে নিয়েছিলাম।
কয়েকটি বৎসর মাত্র, তার পরে তোমাকে আমি আমার মত করে পাবো,
মনের যত শুপ্ত বাসনা আগলে রাখা ভালোবাসা তখন না হয় দেব তোমাকে।
এই সময় তো তোমাকে পাবোনা কিন্তু তোমাকে তো কাছাকাছি পাবো,
তোমার আলাপচারিতা তোমার গায়ের গন্ধ তোমার দর্প হুঙ্কার
আমি শুনতে তো পাবো সর্বক্ষন।
কিন্তু বিধি বাম সাধল, ব্রাহ্মনের গোধন চুরি রদের কারনে
সেই তোমাকেই অস্ত্র নিয়ে ছুটতে হবে !
আর তোমাকেই সেই অস্ত্র আনতে আমার ঘরে।
তখন আমি তোমার জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরের সান্নিধ্যে
ঠিক সেই সময় তোমাকেই আসতে হল ধনুর্বাণ সংগ্ৰহ করতে।
লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে নিয়মের বাঁধা অতিক্রম করে ঢুকে পড়লে
তোমার জ্যেষ্ঠর ঘরে।
তুমি জানতে না তোমার এক ভাইয়ের পাণিগ্ৰহন কালে যদি কেউ
সেই ঘরে প্রবেশ করে তাহলে তাকে দ্বাদশ বৎসর বনবাসে যেতে হবে।
অর্জুন:: কর্মের তাড়নায় হয় তো ভুলে গেছিলাম,
নয়তো এটাই আমার ভবিতব্য পাঞ্চালী।
জানো কৃষ্ণা কর্ম কালে বুদ্ধিনাশ আমার বোধহয় তাই হয়েছিল পাঞ্চালী।
বহুবার ডেকেছি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলে,
দ্বারে জ্যেষ্ঠর পাদুকা না দেখতে পেয়ে ভেবেছিলাম--
গৃহাভ্যন্তরে কেহ নাই, তাইতো সাদা মনে স্ববেগে ছুটে গেছি গৃহমধ্যে
যেথা অস্ত্রাগারে সংগৃহিত যুদ্ধাস্ত্র।
নিমেষে অস্ত্র নিয়ে বাহির হয়েছি গৃহ থেকে।
অপরাধ তো সেই আমার দেশের সম্মান রক্ষা,
আমার ইন্দ্রপ্রস্থ সুরক্ষিত রাখা।
প্রজার সুখ শান্তি রক্ষা করতে গিয়ে
তোমার চোখে আর নিয়মের গন্ডিতে আমি সাজা প্রাপ্ত।
তবে এই শাস্তি এই দন্ড পাওয়া আমারও দরকার ছিল পাঞ্চালী।
নিজের ভালোবাসার এইভাবে নির্মম পরিনতি
আমি চোখের সামনে দেখে সহ্য করতে পারতাম না কৃষ্ণা।
নিজে চোখে এই সব দেখতাম আর কুরে কুরে মরতাম, না--
তার চেয়ে দ্বাদশ বৎসর বনবাসে এটাই ভালো হলো নয়কি পাঞ্চালী।
চোখের আড়াল হলে তুমিও হয়তো একটু একটু করে ভুলে যাবে আমায়।
বিদায় দ্রৌপদী, ইন্দ্রপ্রস্থের আকাশ বাতাস মাটি,
দ্বাদশ বৎসর পর ফিরলে আবার দেখা হবে হয়তো।
দ্রৌপদী:: দেখা তো তোমাকে দিতেই হত কপিধ্বজ ।
অর্জুন:: দ্বাদশ বর্ষ অতিক্রান্ত হয়েছে পাঞ্চালী।
দ্বার উন্মোচন কর দেখ কে এসেছে তোমা দ্বারে।
দ্বার খুলে দেখ একবার কাকে এনেছি তোমার সম্মুখে।
তোমার মনের জমানো সুখ দুঃখ এমন একজনের কাছে
প্রকাশ করতে পারবে ঠিক তেমনি একজন
কৃষ্ণ ভগিনী সুভদ্রাকে এনেছি দেখ পাঞ্চালী।
অভিমানে দুঃখে চোখ মেলে দেখবেনা সে আমি জানতাম প্রিয়তমা।
দ্বিতীয় পর্ব
দ্রৌপদী:: তোমার তো সবকিছু জানার কথা অর্জুন।
কারন তুমি তো অন্তর্যামি।
এই বারোটি বৎসর কিভাবে কেমনে অতিবাহিত হল।
পঞ্চস্বামী আমার, কত সুখ কত আনন্দ হওয়া উচিত বল কৌন্তেয়।
নিয়মের বেড়াজালে আমায় আবদ্ধ করে নিজে নিজেই
নিয়মভঙ্গ করে বেরিয়ে পড়লে বহির্জগতে
কি না ব্রহ্মচর্য পালনের অছিলায় ধিক -- ধিক --
তোমাদের পুরুষ জাতিকে ।
আচ্ছা অর্জুন তোমার কি ব্রহ্মচর্য পালনের উদ্দেশ্য সফল ?
না তা পারোনি , পারোনি। আর নাপারারই কথা,
প্রথমে নাগ কন্যা ঊলুপী, পরে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা চিত্রবাহনের
কন্যা চিত্রাঙ্গদা, শেষে কিনা কৃষ্ণ ভগিনী সুভদ্রার সঙ্গে !
ভাবতে পারছিনা, একে একে এতো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে বীরভদ্রে !
অবশেষে সুভদ্রাকে কিনা সঙ্গে করে একেবারে ইন্দ্রপ্রস্থের অন্দরে নিয়ে
এলে।
কেমনে দেখব বল! কেমন করে আপন করব বল অর্জুন?
অগ্নিদগ্ধ হয়েছি বারবার।
ভেবেছিলাম এবার নাহয় অগ্নিশুদ্ধ হব তোমার জন্য আরো একবার,
বিশুদ্ধ মনে স্বচ্ছ চিন্তণে জীবনের বাকিটা সময় কাটাবো তোমার সাথে
জীবনের প্রথম প্রেম প্রথম ভালোবাসা গোপনে যা লালন করছিলাম,
এতোকিছুর পরেও তা পূর্ণতা পাবে, সব কিছু সুন্দর মধুময় হবে,
সেই স্বপ্ন লালন করছিলাম মনে মনে।
কিন্তু তুমিই বলো নিজ সতীনের সঙ্গে
কেমনে ভাগ করে নেব তোমাকে।
হে ফাল্গুনি সত্যিই যদি তুমি ব্রহ্মচর্য পালনের উদ্দেশ্য নিয়ে
বনবাসে গেলে, তাহলে কি এসবের খুব প্রয়োজন ছিল অর্জুন।
ছিঃ অর্জুন ছিঃ --।
অর্জুন:: তোমার গান্ডিবী আজ অসহায়,
কিন্তু তোমার প্রথম প্রেম তোমার প্রথম ভালোবাসা আজও
সেই আগের মত প্রাণচঞ্চল উজ্জীবিত আছে।
শুধু মাঝের কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে মাত্র।
দ্রৌপদী:: হ্যাঁ কালের নিয়মে সময় অতিবাহিত হয় সর্বদা,
দেখ একদিকে হস্তিনাপুর অন্যদিকে খান্ডবপ্রস্থ,
সেই খান্ডবপ্রস্থ পরিনত হল ইন্দ্রপ্রস্থে ময়দানবের সাহচর্যে।
দিকে দিকে পান্ডব কুলের জয়জয়কার আর সেটাই হল কাল।
আবার সাম্রাজ্য কায়েম আর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই,
শুরু হল দুই ভাতৃকুলের অন্দরে দ্বন্দ্বযুদ্ধ,
আর এই দ্বন্দ্ব চলতেই থাকলো অবিরত।
আচ্ছা অর্জুন তোমরা পঞ্চপাণ্ডব এবং প্রতিপক্ষ তোমারই শত ভ্রাতা
কৌরবগনের সাথে মত্তহলে পাশাখেলায়, শেষে কি পেলে !
মাতুল শকুনির চক্রান্তের কাছে তোমাদের বারংবার পরাজয়ের শেষে
সেই আমাকেই বাজি ধরতে হল কৌন্তেয়। এক্ষেত্রেও পাশার বাজিতে হেরে গেলে।
পঞ্চভ্রাতা সহায় সম্বলহীন নির্বাক শ্রোতা হয়ে বসে বসে দেখলেন
আপন সহধর্মিণীর লাঞ্ছনা গঞ্জনা আর অপমান।
অন্তঃপুর থেকে দুঃশাসন কর্তৃক বলপূর্বক কেশাকর্ষণ করে
সভামধ্যস্থলে নিক্ষেপণ। সভাস্থলের মধ্যমনি তখন আমি।
শতভ্রাতার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে হস্তিনাপুরের রাজসভাস্থল,
কুদৃষ্টি আর কটুক্তিতে মুখরিত হল সম্পূর্ণ রাজসভা।
হায় পঞ্চপাণ্ডব, হায় পঞ্চভ্রাতা, হে আমার শ্রেষ্ঠতর বলিষ্ঠ
পঞ্চস্বামী
এককোণে ভেজা মুষিকের মত ছলছল চোখে
তোমাদের আপন সহধর্মিণীর অপমান মুখবুজে সহ্য করে গেলে নির্দ্বিধায়।
হে বীর তোমাদের সম্মুখে দূর্যোধনের নির্দেশে আমার বস্ত্র উন্মোচনের
প্রদম্য ইচ্ছা, তৎক্ষণাৎ বস্ত্র আকর্ষণ দুঃশাসনের, একেবারে
সভামধ্যস্থলে।
সেই মুহূর্ত আমি রজস্বলা, ছিলাম এক বস্ত্রে।
বাঃ কি অনির্বচনীয় দৃশ্য ছিল তাই না কৌন্তেয়,
সোৎসাহে দেখার ইচ্ছা সকলের কৌতূহলী চোখ নিবদ্ধ শুধু আমার দিকে।
অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের কথা বাদই দিলাম,
কিন্তু তাঁর কর্ণকুহরে তো সবই প্রবেশ করেছিল হে পার্থ।
হে ফাল্গুনি সেই সভাস্থলে কে ছিলনা বল।
পিতামহ ভীষ্ম, কাকা বিদুর, অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য, কুলগুরু কৃপাচার্য
প্রমুখ এই বস্ত্রহরণের নিপুণ কলাকৌশল মনমুগ্ধকর দৃশ্য সকলে
উদগ্ৰীব হয়ে উপভোগ করছিলে নয় কি বল অর্জুন।
লজ্জা করেনা লজ্জা করেনা তোমার
তোমাদের নিজ পত্নীর কেশাকর্ষণ, বস্ত্রহরণ অপরের হাতে ,
কৈ তখন তো তোমাদের কাউকে গর্জে উঠতে দেখলাম না।
বলশালী পরমবিক্রম যোদ্ধার শক্তি কোথায়, কোথায় তোমার সেই বিক্রম,
যে নিজ পত্নীর বস্ত্র সম্বরণ করতে পারেনা,
তাঁর সেই শ্রেষ্ঠ বীরের মর্যাদা তুচ্ছাতিতুচ্ছ।
তাই তো সেইক্ষণে আমার ইষ্ট দেবতার স্মরন করা ছাড়া
আমার আর কোন উপায় ছিল না।
শেষে প্রিয় সখা কৃষ্ণের অদৃশ্য হাতে আমার বস্ত্র
আমার নারী জাতির সম্ভ্রম রক্ষা পেল হে গান্ডিবী।
হে অর্জুন, হে ধনঞ্জয় স্বপত্নীর সম্ভ্রম যেথায় ভুলুণ্ঠিত হয়
সেথায় তোমার পরমবিক্রম তেজপরাক্রম ধুলায়িত নয় কি পার্থ।
তাই তো তোমার মত বলবিক্রম সুপুরুষ
আমার স্বামী হিসাবে পেয়ে কি লাভ বল অর্জুন---- কি লাভ বল অর্জুন।।
লেখক পরিচিত:-
কবি হীরামন রায় নদীয়া
জেলার রানাঘাটের এক প্রত্যন্ত গ্ৰাম বঙ্কিমনগরে 1975 সালের 9ই ডিসেম্বর জন্ম
গ্ৰহন করেন। বি.কম. এবং আই.টি.আই পাস করার পর বর্তমানে তিনি ইছাপুর রাইফেল
ফ্যাক্টরিতে টেকনিক্যাল ডিপার্টমেন্টে কর্মরত। লোহা কাটা কাজের মাঝেও তাঁর
সাহিত্য চর্চার কলম চলছে জোরকদমে।
প্রত্যহ বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে
তাঁর লেখা প্রকাশের পাশাপাশি গত 2023 কলকাতা বইমেলায় ১) "রক্তিম সূর্য"
কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। পিতা - নারায়ন চন্দ্র রায় মাতা - তিলোকবালা
রায় এবং কবির এক ছেলে অর্ণব, এক মেয়ে অনুষ্কা এবং সহধর্মিণী মমতা কে সঙ্গে
নিয়ে সুখেই দিন অতিবাহিত করছেন। তারই ফাঁকে কলমকে সঙ্গি করে সাহিত্যের
আঙ্গিনায় বিচরণ করেন অবলীলায়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন