অনুগল্প | বন্ধু | নাসরিন বানু
অনুগল্প......
"বন্ধু"
নাসরিন বানু
দক্ষিন দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ,ভারতবর্ষ
বাবাকে মনে পড়ে না। মার মুখখানি একটু একটু মনে পড়ে। মা ছেড়ে গেছে! কোথাও নাকি মরেই গেছে সুমন নিশ্চিত নয়। তবে একটা কথা মনে আছে, যেদিন প্রথম সন্ধ্যায় মা হারিয়ে গেল ধীরে ধীরে রাত এলো শিয়ালদা স্টেশনে!ঘুরে ঘুরে কেঁদেছিল সুমন। বয়স তখন তার কত ছিল সে সঠিক জানে না অনুমান করছে চার থেকে পাঁচ বছর হবে!সুমন নিজের অজান্তেই বড় হয়ে হতে থাকলো। সে ফুল বিক্রি করত, না খেয়ে দিন পার করত। সুমনের জীবন বড় কষ্টদায়ক ছিল! সুমন মাঝে মাঝে চুরিও করত কিন্তু কখনো সে ধরা পড়েনি কোন এক ঘটনা ক্রমে সন্দেহজনক ভাবে সে একবার প্রবল মার খেয়েছিল। মাথা ফেটে গিয়ে রক্ত ঝরছিল ।হাতে আঘাত লেগেছিল তবে সে ছিল সম্পূর্ণ নির্দোষ! কোথায় কিভাবে কার যেন কি চুরি হয়েছিল সেই সন্দেহে পুলিশ সুমন কে সামনে পেয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেয় আর সুমনকে যাওয়ার সময় বলে সুস্থ হলে জেলে নিয়ে যাবে। সুমনের হাতে-পায়ে, কপালে, ব্যান্ডেজ বেঁধে দেওয়া হয়।প্রকৃত চোর কে!তা না জেনে সুমনকে পুলিশ শাস্তি দেয়। সুমন হাসপাতালে কতদিন ছিল, সে কথা তার মনে আসে না। তবুও তার অনুমান সে হাসপাতালে এক মাস কিংবা দুই মাস হবে। হাসপাতালে থাকাকালীন একজনের সঙ্গে সুমনের বন্ধুত্ব হয় সেই ছেলেটি তার পাশের বেডের নাম জয় ।এক দুর্ঘটনাতে জয় পঙ্গু হয়ে যায়। জয় ক্লাস নাইনে পড়াশোনা করে পুলিশ মাঝে মাঝে সুমনকে হাসপাতালে দেখতে আসতো । বেডে শুয়ে শুয়েই জয় পেনসিল জোগাড় করে সুমনকে এক-দুই লেখা শিখিয়েছিল। আর চিনতে শিখিয়েছিল অ-আ ক-খ একটু একটু পড়তে শিখেছিল সুমন জয়ের কাছে।
ধীরে ধীরে সুমন সুস্থ হয়ে ওঠে। একদিন হঠাৎ পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে যায় জেলে।তাকে বেশ কয়েক মাস বন্দি করে রাখে।তারপর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সুমন কোথায় গিয়ে উঠবে তা সে ভেবে পায় না, হঠাৎ করে তার মনে হল বন্ধু জয়ের কথা। হাসপাতালে থাকাকালীন জয় সুমনকে তার ঠিকানা বলে দিয়েছিল। সুমন জয়ের বাড়িতে গিয়ে ওঠে। সুমন দরজার কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলে তাকিয়ে দেখে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু সুমনকে চিনতে জয়ের আর একটুকুও দেরি হলো না,বলল আরে! সুমন যে! কোথা থেকে আসলি?ভেতরে আয়, জয় সুমনকে ভেতরে নিয়ে গেলে বলল তুই বস! আমি আসছি তারপর ভেতর থেকে সুমনের জন্য জয় কিছু খাবার এনে সামনে দিল। সুমন ভীরু মনে হাত দিল খাবারের দিকে। খাওয়ার পরে দুই বন্ধু মিলে গল্প করতে লাগল। জয় সুমনকে বলল এইবার কি করবি বল কিছু ভেবেছিস? সুমন কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে। তারপর দীর্ঘশ্বাস! ফেলে জবাব দিল এখনো ঠিক করিনি রে! তবে জয় সুমন কে বলল তুই আমাদের এইখানে থাকবি?জয়ের কথা শুনে সুমনের মনে কিছুটা সাহস এল। সুমন জয়কে বলল আমার কোন আপত্তি নেই আমি এখানেই থাকবো। সুমন মনে মনে খুব আনন্দ অনুভব করল।জয় তাকে বলল তোর ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারব না রে! সুমন জয়দের বাড়ি থাকতে লাগলো এবং জয়ের পড়াশোনা করতে শুরু করল আর জয়দের বাড়ির হালকা কাজ করতো ঘর-পরিষ্কার করা, জল এনে দেওয়া, ফুলের গাছে জল দেওয়া ইত্যাদি কাজ করতো। জয় যেমন ভাল ছেলে জয়ের মা বাবা সুমনকে খুব ভালোবাসতো দেখাশোনা করতে ভালো। জয় যেমন ভাল ছেলে সুমনও তেমনি ভালো ছেলে। জয়ের মা বাবা সুমন কে খুব ভালোবাসতো। জয়কে যা খেতে দিত সুমনও তাই খেত। সুমনকে দেখাশোনা করতে ভালো । সুমন ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠল সে সবকিছুকে আরও ভালো করে জানতে শিখলো বুঝতে শিখলো ।সুমনের কোন বাড়ি-ঘর নেই সে জয়ের মা-বাবাকে ভালো শ্রদ্ধা করত এবং সে তাদের পরিবারে খুব আপন হয়ে দাঁড়ালো।
লেখিকার পরিচিতি-
লেখালেখি আমার ব্যক্তিগত জীবনের একটি পেশা।আমার লেখা কবিতা গল্প বেশ কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন সাহিত্য পরিষদেও আমার লেখা গল্প, কবিতা কে সেরা সম্মানীয় করা হয়েছে। আমার বাড়ি উত্তর দিনাজপুর জেলার হেমতাবাদ থানার অধীনে। বর্তমানে আমি বালুরঘাটে বসবাস করছি। নিজেকে নিয়ে আমি ভীষণভাবে আনন্দিত, আপ্লুত এবং উৎসাহিত।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন