গল্প | হঠাৎ সব গল্প | বৈশালী দাশগুপ্ত
গল্প......
"হঠাৎ সব গল্প"
বৈশালী দাশগুপ্ত
প্রথম পর্ব
আজ সারা পাড়া আলোয় ঝলমল করছে। বৌবাজারের সেঁকড়াপাড়া লেনের বাসিন্দাদের মুখে চোখে আনন্দ প্রস্ফুটিত। প্রতিটা বাড়ির শিশুরা একে অপরের সাথে মিলিত হয়েছে আনন্দে মাতবে বলে। দেখে মনটা যেন বলে ওঠে-
"আনন্দেতে উছলে হাসিবাঁধ ভেঙেছে রাশি রাশি"।
পাড়ায় একদিকে সুজয় মিত্তিরের মেয়ের বিয়ে আর একদিকে চিন্ময় হালদারের ছেলের অন্নপ্রাশন। এখন পাড়ার লোকের নাজেহাল অবস্থা এই ভেবে, কে কার বাড়ি নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাবে। কিন্তু শিশুরা ব্যতিক্রম তারা দুই বাড়িতেই যাবে খাবারে ভাগ বসাতে।
বিয়েবাড়ির ব্যস্ততা, কেউ গয়না বাছাই করছে তো কেউ আবার শাড়ী। হঠাৎ হইচই -"ওরে গায়হলুদ এসে গেছে ছেলের বাড়ি থেকে"। সেই শুনে পল্লবীর মুখ লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে।
হলুদের আলতো ছোঁয়ায় আর গঙ্গোত্রীর ধারায় মনে হল সূর্যস্নাত রমনী ভোরের অলোকানন্দা থেকে উঠে এসেছে।
আজ পল্লবীর জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। কারণ তার পছন্দ করা জীবনসঙ্গীই তার জীবনে আসতে চলেছে। পল্লবীর দুটো হাত আজ আরও দুটো হাতে বাঁধা পড়বে। তার সাথে রয়েছে বিরহ। কারণ বহু স্মৃতি ছেড়ে পল্লবীকে যেতে হবে নতুন গৃহে। পাড়ার রোয়াকে বসে খেলা , এবাড়ি ওবাড়ির ছাদে গিয়ে আচার চুরি করা সবই মুহূর্তে হয়ে যাবে স্মৃতির বাক্সে বন্দি।
এরই মধ্যে পল্লবীর চিন্ময় কাকু তার ছোট্ট পলুকে আশীর্বাদ করে গেল। সাথে ছিল ছেলে মিছিল আজ তার অন্নপ্রাশন।
মিছিলকে বেঁধে রাখার সাধ্য কারোর নেই তাই তার মায়ের তিব্র ভর্ৎসনা -"উফ এই ছেলেকে নিয়ে আর পারি না। দুষ্টু কোথাকার, ঠিক বাবারই মতো"।
তাতে অবশ্য মিছিলের কিছু যায় আসে না। এখন সে জানলা দিয়ে ক্রিকেট খেলা দেখছে। কারণ পাড়ার ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার তাকেই রক্ষা করতে হবে। টানা রিক্সার ঘন্টির আওয়াজ তার খুব পছন্দ। তাই একটা রিক্সা দেখা থেকেও বিরত রাখছে না নিজেকে।
দ্বিতীয় পর্ব
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামল বৌবাজারের বুকে। শঙ্খ আর উলুধ্বনির শিহরিত আওয়াজ মাতিয়ে রাখল সারা মন্ডপকে। বিরহের সুর বহন করে বাজতে থাকল নহবতের বাজনা। চারিদিকে উল্লাস- "বর এসেছে বর এসেছে"।
পল্লবীর পিপাসু আঁখি আর বাঁধা মানল না। ছুটে গেল জানলার কাছে। চোখ দুটো একবার দেখে নিল বর বেশে আসা অনির্বাণ কে। দুটো কচি পানে মুখ ঢেকে নেমে এলো পল্লবী। কঠিন গাঁটছড়ার বন্ধনে অগ্নিকে সাক্ষী রেখে শেষ হল সাতপাকের বন্ধন। সাদা চিকন সিঁথিতে উঠল সিঁদুর। প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হল দুটো জীবন।
ভোর তখন পাঁচটা - "পল্লবী, মা দরজাটা খোল তাড়াতাড়ি"। পল্লবীর তখনও ঘুম ছাড়েনি। পল্লবীর স্বামী অনির্বাণ তাড়াতাড়ি উঠে দরজা খুলে দেখল সবাই ছুটোছুটি করছে।
- "কি হয়েছে কাকীমা ?"
পল্লবীর মা তখন কম্পিত হাত দুটো দিয়ে অনির্বাণ কে দেখাল এক বিভীষিকাময় ধ্বংসলীলা। চোখের সামনে ভেঙে পড়ল পল্লবীর চিন্ময় কাকুর বাড়ির এক অংশ। পাশের দুটো বাড়ি আগের থেকেই ধূলিসাৎ হয়ে পড়ে রয়েছে।
পল্লবীর ঘুম ভাঙল অসহ্যকর সব চিৎকার শুনে। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে প্রথমেই পল্লবী দেখল এক ভয়ার্ত দৃশ্য, মিছিলের রক্তাক্ত দেহ নিয়ে চিন্ময় কাকু ছোটাছুটি করছে। সে যেন এক ভয়ঙ্কর ধ্বংস স্রোত। কেউ দৌড়াচ্ছে তার সন্তাষকে নিয়ে আবার কেউ দৌড়াচ্ছে জীবনের শেষ সম্বলটাকে নিয়ে।
পল্লবীর বাবা তাড়াতাড়ি পল্লবী আর অনির্বাণ কে নিয়ে বাড়ি ছাড়তে শুরু করল।
সিঁড়ি থেকে নামার সময় আচমকা ভূমিকম্পে ছাদের একটি ভাঙা চাঁইয়ের টুকরো অনির্বাণের মাথায় পড়ল।
সারা পাড়া পুলিশ আর অ্যাম্বুলেন্সের কোলাহলে গমগম করছে। চলছে উদ্ধার কাজ। শয়ে শয়ে মানুষের জখম দেহ গুলো যাচ্ছে হাসপাতালে। পল্লবী তার স্বামীর এমন অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছে। হাসপাতালে অনির্বাণের বেডের পাশেই এক কোণায় বসে আছে চিন্ময় কাকু, যেন একটা পাথর। শুধু শোনা যাচ্ছে তার উদ্বেগের উষ্ণ শ্বাস।
অন্তিম পর্ব
আজ শহরের বুকে এই ঘটনা কেড়ে নিল শয়ে শয়ে প্রাণ। আর একদিকে হাসপাতালের বেডে শুয়ে লড়ছে কিছু নিরীহ জীবন। আর একদিকে তখনও হয়তো চলছিল এ.সি. অফিসে বসে কোলকাতা কে লন্ডন বানানোর পরিকল্পনা।
বহু পুরোনো স্মৃতি কাল অবধিও বহন করে চলছিল এই বাড়ি গুলো।
কোলকাতাতে যদি রাস্তার ধার দিয়ে ট্রাম না যায়। অলিগলি দিয়ে টানা রিক্সা যদি না চলে , বিকেলের পড়ন্ত রোদে যদি ব্যাটে লাগা ছক্কা না থাকে আর ধুতি পড়া বাবুদের বাজারের ব্যাগ থেকে যদি ইলিশের ল্যাজাটা উঁকি না দেয় তবে এ কোলকাতা কিসের কোলকাতা?
আজ সারা শহর জুড়ে কান্নার কলরব। শিশুদের বিষম আর্তনাদ। তার মধ্যে শোনা গেল পল্লবীর ঠোঁটের শব্দ -"অনির্বাণ তুমি আমায় ছেড়ে যাবে না তো!"
লেখিকার পরিচিতি-
জন্ম ১৩ই জুলাই, ২০০০সাল।
ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সাথে মোকাবিলা করে পড়াশোনা করা। খড়দহ জন্মস্থান হওয়ার কারণে গঙ্গার তটেই খুঁজে পাওয়া জীবনের ছোট গল্পের অঙ্গনকে। ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ে ওঠে জীবনের আঁধার। ১২বছর বয়েস থেকেই কবিতা লেখা শুরু। তারপর ভিক্টোরিয়া কলেজে শিক্ষাকালীন সময় থেকেই সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ। "সমকাল কথা","আজকের পার্থেনন" ইত্যাদি পত্রিকার মধ্যে দিয়ে সাহিত্য চর্চার উন্মেষ। এছাড়াও মহাভারতকে কেন্দ্র করে লেখনীর আঙিনায় এক প্রেরণার নির্যাস স্বরূপ "মহাভারত কথা" যা আজও অপ্রকাশিত। সম্পাদনা করেছি "এবং অবলাবান্ধব" পত্রিকা। তবে ভবিষ্যতে রবীন্দ্রমনন ও রবীন্দ্রভাবনাই হবে লেখনীর পথচলার পাথেয়।।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন