গল্প | রুম নং ১০২ | রবীন্দ্রনাথ দাস
গল্প......
"রুম নং ১০২"
রবীন্দ্রনাথ দাস
বিলাসপুর,ছত্তিসগড়,ভারতবর্ষ
প্রথম পর্ব
অফিসের কাজে অসীম কোলকাতা থেকে কালকা মেলে কালকা স্টেশন তারপর সংযোজক ট্রেনে সিমলা স্টেশনে নামার পর পোটার এসে সেখানকার ভাষাতে বললো, "কোন হোটেল বাবু? " অসীম একটু ক্লান্ত থাকায় উত্তরে বললো, " কোনো ভালো হোটেলে নিয়ে চলো। " পোটার, "ম্যালে ভালো হোটেল হবে, কিন্তু উপরে অথাৎ চড়াই অনেক। " অসীম চিন্তা করলো, দু- তিন দিনের কাজ সিমলায় তারপরে আবার দিল্লী বললো, " কাছাকাছি কোনো হোটেলে চলো। " পোটার ল্যাগেজ নিয়ে স্টেশন থেকে বেড়িয়ে, পাহাড়ের চড়াই রাস্তা ধরলো। অসীমের এই প্রথম আসা সিমলায় তাও আবার অফিসের কাজে, কালকা থেকে ট্রেনে আসার পথে জীবনে প্রথম এতোগুলো টানেল ভেদ করে আসা ভীষণ রোমাঞ্চকর মনে হয়েছিল অসীমের, চড়াই রাস্তায় কষ্ট হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোহিত হওয়াতে তেমন কষ্টের উপলব্ধি হলেও গুুরুত্ব দিলো না। হোটেল হিমালয়ে পোটার এনে হাজির করায় পোটারের পয়সা মিটিয়ে দিয়ে রিসেপশনিস্টের সাথে কথা বলে রুম বুক করে নিয়েছে। রুম বয় ল্যাগেজ নিয়ে দোতলায় ১০২ নম্বর চাবি দিয়ে খুলে সবকিছু বুঝিয়ে এবং দেখিয়ে দিলো। রুম বয় যাবার সময় বললো, "বাবু কিছু দরকার পড়লে, ফোন করবেন, আমি চলে আসবো। " এই বলে সে চলে যেতে, অসীম সমস্ত ক্লান্তি যেন বিছানায় ঢেলে দিয়ে শুুুুয়ে পড়লো, মনে হলো আহা, কি আরাম এতোটা Journey -পর।
দ্বিতীয় পর্ব
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো, অনেক বেলা হয়েছে, পেটে খিদে যেনো বাড়াবাড়ি শুরু করে দিয়েছে। ব্যাগ থেকে পাঞ্জাবি পায়জামা বের করে বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে, রুম থেকেই ফোনে খাবারের অর্ডার করে, ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। প্রকৃতির শোভা দেখতে দেখতে বিমোহিত অসীম, এমন সময় কলিং বেলের আওয়াজে অসীম দরজা খুলে দিতে, রুম বয় খাবার টেবিলে খাবার রেখে বেড়িয়ে গেলো। রুম বয় বেড়িয়ে যেতেই খাবার মনের আরামে খাওয়া শেষ করে প্লেট দরজার বাইরে রেখে দিয়ে, ব্যালকনিতে চেয়ার নিয়ে সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়াকে মুক্ত আকাশে মনের আনন্দে মুুক্তি দিয়ে অফিসের ফাইল থেকে প্রয়োজনীয় পেপার দেখে গুছিয়ে নিলো পরের দিনের জন্য । ভাত ঘুমে চোখ বুঝে আসতেই বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লে, জানতেই পারলো না কখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ব্যালকনি থেকে দেখলো চারিদিকে অন্ধকারের মধ্যে নিয়ন আলো আলাদা পরিবেশ সৃষ্টি করেছে বেশ ভালো লাগার অনুভূতি মনকে ছুঁয়ে গেল, এখন কি করবে ঠিক করতে না পেরে চায়ের অর্ডার দিয়ে চা আসতেই চায়ের কাপে চুুুুমুক দিয়ে টিভিতে নিউজ দেখতে দেখতে রাত হয়ে এলো। অসীম যদিও আগেই রাতের খাবারের অর্ডার দিয়ে রেখেছিলো। এমন সময় বেলের আওয়াজে দরজা খুলে দিতে রুম বয় খাবার যথা স্থানে রেখে চলে যেতেই, খানিকক্ষণ টিভি দেখে খাবার খেয়ে, কাল সকাল সকাল তৈরি হয়ে বেড়িয়ে পড়তে হবে এসব ভেবে, মোবাইলে অলার্ম দিয়ে দেখলো রাত প্রায় বারোটা, আর দেরি করা নয় বিছানায় শুয়ে পড়লো কিছুক্ষণ বাদে সবে চোখে ঘুম এসেছে এমন সময় বেলের আওয়াজে ঘুমের ব্যাঘাত হতেই চিন্তা করতে লাগলো রুম বয় কিসের জন্য? এবার বলে দেবে যখন তখন ডিস্টার্ব না করে। আবার ভয় হলো ঘড়ির দিকে নজর দিতে দেখল রাত প্রায় একটা, এই সময় রুম বয় আসার কথা নয়, চিন্তা করতেই আবার বেলের শব্দ, কেমন যেনো অজ্ঞাত কারণে ভয় শরীরের মধ্যে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। তবুও সাহসিকতার সাথে বিছানা থেকে উঠে একটি লাইটের আলো জ্বালিয়ে দরজা খুলেতেই দেখে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। চিন্তা মুক্ত হয়ে অসীম জিজ্ঞাসা করলো, "কি ব্যাপার বলুন। " আগন্তুক, "ভিতরে আসতে পারি কি? " অসীম, "আসুন, বসুন।" বলে সোফা দেখিয়ে দিলেন। অসীমের শরীরে ভারি ভারি ভাব অনুভূতি হলো কিন্তু আগন্তুক কে বুঝতে দিলো না, আগন্তুক যথারীতি আতিথেয়তা গ্রহণ করে সোফায় বসলেন।
অন্তিম পর্ব
অসীম, "আপনি হঠাৎ এতো রাতে, রুমে কোনো সমস্যা? " আগন্তুক, " না তেমন কিছু নয় রাতে ঘুম আসছে না, তাই রিসেপশনে জেনে ছিলাম, আমার পাশের রুমে আপনি বাঙালি তাই..। " অসীম ভদ্রতা বজায় রেখে জানতে চাইলো, "আপনি কি কম্পানির কোনো কাজে, না ঘুরতে এসেছেন? " আগন্তুক, " না সেরকম কোনো জরুরি কাজে নয়, ঘুরে বেড়ানো আমার বরাবরের অভ্যাস। সেই সুবাদে এখানে আসা। " অসীম বলল, " আমি ভাবলাম রুম বয়় হবে হয়়়তো একটু রাগ হচ্ছিল আবার ভাবলাম ভূূূতুরে কোনো ব্যাপাার নয়তো এতো কিছু ভেবে দরজা খুললাম, যাক্ ভালো হলো পাশেই আপনি আছেন। বিছানায় সিগারেট প্যাকেট রাখা ছিল সেটা হাতে নিয়ে বললো, " অভ্যাস আছে? " আগন্তুক, "অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, না নেই। " অসীম প্যাকেট থেকে সিগারেট একটি বার করে, লাইটারের আগুন জ্বলে উঠতেই দেখলো, সোফায় বসা ভদ্রলোক নেই। অসীমের হাত পা শিউরে উঠলো, বুঝতে পারলো এতো রাতে ভুতের পাল্লায় পড়েছে। কারণ এর আগে অফিসে অনেক গল্প শুনেছে, কিন্তু নিজের জীবনে এমন ঘটবে বুঝতে পারে নি। অসীম রুমের সব লাইট জ্বালিয়ে, ঘড়ি দেখলো রাত দেড়টা এতো রাতে কি করবে, ঠিক করতে না পেড়ে সিগারেটের পর সিগারেট ধরিয়ে সময় কাটাতে লাগলো। বুঝতে পারলো পরেরদিন কাজ হবার নয়। সকাল হতেই সটান রিসেপশনে এসে বিস্তারিত ভাবে জানালা। রিসেপশনিস্ট বললেন, " এই নিয়ে তিনবার ঘটনা ঘটলো, এবার ভাবছি, রুমটা বন্ধ করে দেব। " অসীম, "এখন কি উপায় বলুন?" রিসেপশনিস্ট, "আপনাকে রুম পরিবর্তন করে দিচ্ছি। " অসীম "আপনারা জেনে শুনে এমন রুম দিচ্ছেন, এটা মোটেও ঠিক করেননি।" রিসেপশনিস্ট, " আসলে ভদ্রলোক ওই রুমে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করার পর সব রকম পূজাপাঠের পদ্ধতি যা যা করার করেছি, তবুও ওর উৎপাত কমছে না, কিন্তু বিশ্বাস করুন ও কারো এখনও পর্যন্ত কোনো ক্ষতি করেনি, এবার আপনার ব্যাপার। "অসীম, "আমার আর এই হোটেলে থাকার মোটেও ইচ্ছা নেই, দয়া করে কাগজ তৈরি করুন আমি পাশের হোটেলে চলে যাব। " রিসেপশনিস্ট, " সেটা আপনার ইচ্ছা, আপনি লাগেজ গুছিয়ে ফেলুন, আমি বিল বানিয়ে দিচ্ছি। "
অসীম অল্প সময়ের মধ্যে লাগেজ গুছিয়ে নিচে এসে হোটেল ছেড়ে পাশের হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা হলো..।
লেখক পরিচিতি
রবীন্দ্রনাথ দাস জন্ম কোলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন।কবি শৈশব এবং কৈশোর বেড়ে উঠেছেন কোলকাতায়। পিতা শান্তি রঞ্জন দাস, মাতা নীহার কণা দাস । কোলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে শিক্ষা লাভ করে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক । নানা কর্ম ব্যস্ততার মধ্যেও সাহিত্য চর্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
একক কাব্যগ্রন্থ "অঞ্জলি " কোলকাতা বইমেলা ২০২৩ প্রকাশিত হবার পর যৌথ কাব্যগ্রন্থ "দুই বাংলার কাব্যমালা" বাংলাদেশ গ্রন্থমেলায় আন্তপ্রকাশ করে।
তাঁর কিছু প্রবন্ধ, ছোট গল্প এবং অনেক কবিতা সন্মানিত করেছেন বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন