গল্প | নিয়তি | রুচিরা সাহা
গল্প......
"নিয়তি"
রুচিরা সাহা
মালদা, পশ্চিমবঙ্গ,ভারতবর্ষ
প্রথম পর্ব
প্রত্যন্তর গ্রাম থেকে শহরে পড়াশোনার জন্য আসে শশীকান্ত আর নিশিকান্ত দুই ভাই। শশীকান্ত পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ছিল।চতুর্থ শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে আর দাদা নিশিকান্ত অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হয়। দুই ভাইয়ের মধ্যে বয়সের তফাৎ ছিল প্রায় চার বছরের। শশীকান্ত ডবল প্রমোশন পায়। তাঁরা চার ভাই দুই বোন। বড়োভাই রাধাকান্ত আর মেজো ভাই আমলাকান্ত গ্রামের ইস্কুলেই পড়াশোনা করে।
উনাদের বাবা ছিলেন কবিরাজ মশাই। গ্রামে তাঁর বেশ ভালো পরিচিতি ছিল।ছোট ছেলে পড়াশোনায় ভালো ছিল বলে তাঁর শখ ছিল শহরের কোনো নামী ইস্কুলে পড়াবেন। কিন্তু তিনি অকালেই মারা যান । স্ত্রী নিরুপমা দেবী থেমে থাকেন নি। ছোট ছেলে শশীকান্তর সাথে নিশিকান্তকেও পাঠিয়ে দিলেন শহরে।ব্রিটিশ তখন দেশ শাসন করছে। স্বামীর অকাল মৃত্যুর পরে তিনি একাই সব কিছু দেখাশোনা করতেন। বড়ো ছেলে রাধাকান্ত পড়াশোনা শেষ করেছে।শশী কান্ত আর নিশিকান্তকে নতুন ইস্কুলে ভর্তি করানো হলো। হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করা হলো। সুন্দর বড়ো লাল রঙের ইস্কুল, কদম, নিম, কৃষ্ণচূড়া, আবার একটি বেলগাছ ও ছিল।. কিন্তু কদম গাছটি দেখে শশীকান্তের তাঁর বাবার কথা মনে পরে যায়। গ্রামে কদম গাছ থেকে পড়ে গিয়েছিল দুবছর আগে তাঁর বাবা ওষুধ দিয়ে সারিয়ে তুলেছিলেন। রাতে হোস্টেলে মাকে ছাড়া থাকতে শশীকান্তর বড়ো কষ্ট হয়েছিল। দুই ভাইকে আলাদা ঘরে দেওয়া হয়েছিল। একটা ঘরে তিনজন করে ছাত্র থাকতো। পরপর দুইদিন সারারাত কেঁদে কাটিয়েছে। হোস্টেল সুপার কাছে ডেকে সস্নেহে বোঝান।তারপরে ধীরে ধীরে ইস্কুলের পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়।বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয় শশীকান্ত। অত্যন্ত শান্ত ছেলেটি ধীরে ধীরে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে থাকে এবং সকলশিক্ষকদের মধ্যেমনি হয়ে ওঠে।নিরুপমা দেবী মাসে একবার দেখা করতে আসতেন বড়ো ছেলে রাধাকান্তকে সঙ্গে নিয়ে। সেই সময় পর্দা প্রথা ছিল, কিন্তু নিরুপমাদেবী ছিলেন এ সবের বাইরে তাঁর স্বামী মেয়েদের শিক্ষারকথা ভাবতেন।তিনি সাদা শাড়ি পড়তেন এবং মাথায় ঘোমটা টেনেই কথা বলতেন।পড়াশোনা একটুআধটু জানতেন।সঙ্গে আনতেন দুই ছেলের জন্য বাড়ির তৈরি ঘি, মুড়ি, চালভাজা।দুইছেলেকে দেখে আবার চলে যেতেন। তবে সেই সময় কিন্তু এখনকার মতো বাস, রিক্সা, অটো, টোটো এসব ছিল না যাতায়াতের জন্য ছিল ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি, স্টিমার, ট্রেন। নিরুপমাদেবী ঘোড়ার গাড়িতেই যাতায়াত করতেন। নিশিকান্ত ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেয় পাশ করার পরে গ্রামে ফিরে যায়। শশীকান্ত থেকে যায় হোস্টেলে। ছুটি ছাড়া বাড়ি যাওয়া হয় না। বিকেলে সব ছেলেরা খেলা করে কিন্তু শশীকান্ত একাই কদম গাছটির তলায় বসে থাকে, এই কদম গাছটি তাঁর গ্রামের কথা মনে করিয়ে দিতো। এইভাবে নিশিকান্ত চলে যাবার দুবছর পরে শশীকান্ত ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেয় এবং প্রথম স্থান অধিকার করে।এর পরে কলেজে ভর্তি হন। ছুটি হলেই গ্রামের বাড়িতে আসতো।, সবার খোঁজখবর নিতো । এই শশীদার আসার অপেক্ষায় থাকতো গ্রামের পারুল।ছোটবেলার খেলার সাথী ছিল পারুল। পারুল এখন বড়ো হয়ে গেছে।শশীদাকে দূর থেকে উঁকি দিয়ে দেখলো। শশীদার অনেক পরিবর্তন হয়েছে গায়ের রং শ্যামবর্ণই ছিল, লম্বা অনেক, হয়ে গেছে। শশীকান্তের সাথে গ্রামের আশেপাশের লোকজন দেখা করতে আসতো । বড়ো দাদা ও মেজোদাদার বিয়ে হয়ে গেছে। দুই দিদিরও বিয়ে হয়ে গেছে। শশীকান্ত বাড়িতে এলে সবাই আসে তখন সারাবাড়িতেই হৈচৈ পড়ে যায়, রামুকাকার আনন্দের সীমা থাকে না ছোট বাবু এসেছে বলে। শশীদার বাগান থেকে আম পাড়া চাইই পারুলের.। এদিকে বাড়ির অন্য দুই বৌয়ের হাতে হাতে কাজ গুছিয়ে দেয়, প্রতিদিন নিরুপমা দেবীর সাথে
গল্প করে সন্ধ্যের আগেই বাড়িতে ফিরে যায় পারুল।ছুটি শেষ শশীকান্ত আবার কলেজে চলে যায়। ইংরেজি নিয়ে স্নাতক পরীক্ষায় ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট হয়ে গোল্ড মেডেল পায়। গাঁয়ের মেঠো পথ দিয়ে রামুকাকার সাথে আসছে শশীদা পারুল দূর থেকে দেখতে পেয়ে ছুটলো শশীদার বাড়ি।
দ্বিতীয় পর্ব
পারুল --"জ্যাঠাইমা শশীদা এসেছে।"
নিরুপমাদেবী --"তাই শশী এসেছে!"
তিনি আনন্দে সবাইকে ডাকলেন।
বাড়ি ফিরে এসে শশিকান্ত তাঁর মা নিরুপমাদেবীকে প্রণাম করে সোনার মেডেলটি হাতে দেয়। সন্তানের কৃতিত্তে নিরুপমা দেবীর খুব আনন্দিত, দুঃখ একটাই যদি শশীকান্তের বাবা দেখে যেতেন।পারুল এসে দূর থেকে মেডেলটি দেখে।আর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে শশীদার মুখের দিকে।
এদিকে স্বাধীনতার জন্য চলছে আন্দোলন।শশীকান্তকে কলকাতায় পাঠাতে ভয়ও পান কিন্তু ছেলের আবদারকে মেনে নেন।
বিকেলবেলা পারুল শশীকান্ত কে জিজ্ঞাসা করে "আবার চলে যাবে?"
শশীকান্ত "হ্যাঁ রে।"
পারুল "কবে যাবে?"
শশীকান্ত "কেন?"
আবারও পারুল জিজ্ঞাসা করলো "সত্যি সত্যি চলে যাবে?
শশীকান্ত আবারও বলল "হ্যাঁ।"
আর কিছুবললো না ছলছল চোখে বাড়ি চলে গেলো। এবার আর পারুল শশীকান্ত কলকাতায় যাবার সময় এসে দাঁড়ালো না গ্রামের সেই মেঠো পথের ধারে।
শশীকান্ত এম. এ. পড়ার জন্য কলকাতায় চলে যায়।কলকাতায় পড়তে এসে থাকতেন মেসবাড়িতে। বেশ দুজন ভালো বন্ধু ছিল সেই মেসে। তাঁরা তিনজনেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। শশীকান্তের ছিল ইংরেজি। তাঁর একবন্ধু যোগ দেন স্বাধীনতা আন্দোলনে,তিনি গ্রেপ্তার হন ব্রিটিশ সেনারবাহিনীর হাতে। যাইহোক শশীকান্ত স্নাতকোত্তরেও সোনার মেডেল পান। চাকুরীর খোঁজ করেন। কিন্তু বাড়িতে তাঁর মায়ের শরীর খারাপ শুনে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসে।বেশ কয়েক মাস থাকেন বাড়িতে। গ্রামেরছোট বেলার বন্ধুদের সাথে সময় কাটে আর গ্রামের একটি ইস্কুলে পড়াতে শুরু করেন।এরমধ্যে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে।কলকাতার একটি কলেজে অধ্যাপনার জন্য ডাকপায়।নিশিকান্ত চাকুরী পেয়েছে বেশ কয়েক বছর হয়ে গেছে। নিশিকান্তের বিয়ের ছয়মাস পর তাঁর স্ত্রী মারা যান ম্যালেরিয়ায়।
নিরুপমাদেবী আবার নিশিকান্তের দ্বিতীয়বার বিয়ে স্থির করেন।বিয়ের কয়েকমাস পরেই অন্যত্র বদলি হয়ে যেতে হয়। স্ত্রী থাকেন গ্রামের বাড়িতেই। বছর দুয়েক পর নিশিকান্ত শহরে একটা বাড়ি কেনেন নিয়ে আসেন স্ত্রীকে। বেশ সুন্দর সংসার করছিলেন তিনটি ছেলেমেয়ে নিয়ে। তাঁর স্ত্রীর টিবিতে মারা যান। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য নিরুপমাদেবী এলেন নিশিকান্তের বাড়িতে সঙ্গে এলো রামুকাকা। শশীকান্ত কলকাতায় একটি কলেজে অধ্যাপনা করেন। প্রায় দুই বছরের মধ্যে নিশিকান্ত এবার অনেক দূরে বদলি হলেন। নিরুপমাদেবীর কথামতো শশীকান্ত কলকাতা থেকো ফিরে আসেন এবং তাঁর মা ও নিশিকান্তের ছেলেমেয়েদের সাথে থাকতে শুরু করেন। পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র আর ইংরেজিতে ছিলেন প্রখর। কাজেই ঘটনাক্রমে তিনি সেখানেই একটি কলেজে অধ্যাপনা করার সুযোগ পেয়ে যান। নিরুপমাদেবী এবার শশীকান্তের বিয়ের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। কিন্তু ছেলের উপযুক্ত পাত্রী পাচ্ছিলেন না।শশীকান্তের বিয়ের প্রতি ছিল অনীহা। সময়ের অজুহাত দিতেন।বড়োভাই রাধাকান্ত অনেক দেখেশুনে শশীকান্তের জন্য পাত্রী ঠিক করেন। সেইসময় জাতিপাতের বিচার ছিল, কিন্তু নিরুপমাদেবী ছিলেন এর বাইরে তিনি জাতিপাত মানতেন না। সুলেখাকে দেখে নিরুপমাদেবীর ভালোই লাগে ফলে দিনক্ষণ সব ঠিক হয়, জ্যোষ্ঠ মাসে গ্রীস্মকালীন ছুটিতে শশীকান্তের বিয়ে হয়। সারা গ্রামের লোক নিমন্ত্রিত ছিল। খুব ঘটা করেই নিরুপমাদেবী ছোটপুত্রের বিয়ে দেন। গ্রীষ্মের ছুটি শেষ কলেজ শুরু হয়ে যাবে কাজেই শশীকান্ত নববধূ সুলেখাকে নিয়ে চলে যান। সপ্তাহখানিক বাদে নিরুপমাদেবী নিশিকান্তের ছেলেমেয়েদের নিয়ে শহরে আসেন তাদেরও ইস্কুল খুলে গেছে। এবার সাথে আসে রামুকাকার ছেলে রঘু। রঘুই সংসারদেখাশোনা করে কারণ নিরুপমাদেবীর বয়স হয়েছে। সুলেখা ছিল অত্যন্ত আধুনিকা। তিনি নিরুপমাদেবী এবং নিশিকান্তের ছেলেমেয়েদের সাথে মানিয়ে চলতে পারছিলেন না। সংসারে অশান্তি শুরু হলো। এই অশান্তি নিরুপমাদেবীর মানসিক আঘাত হানে। নিদারুন কষ্টের পরিণতি হয় সুলেখা শশীকান্তকে নিয়ে আলাদা বাড়িতে যখন চলে যায়। নিজের মনের কাছে শুধু জানতে চাইতেন বারবার কোথাও কী কিছু ভুল হয়ে গেছে।পুজোর ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে সবাই একত্রিত হয়েছে শুধু সুলেখা বাদে। সেই বছর নিরুপমাদেবী প্রথম শশীকান্তকে ছাড়া পুজো কেটে ছিল।
অন্তিম পর্ব
শশীকান্ত একেবারেই নিরীহ প্রকৃতির তিনি সুলেখার সাথে তর্কে নিজেকে জড়াতে চাইতেন না। শশীকান্ত প্রতিদিন বিকেলে কলেজ থেকে ফেরার পথে মা নিরুপমাদেবীর সাথে দেখা করতেন। তবে গ্রামের বাড়ি থেকে কেউ এলে তাঁদের সাথে দাদা নিশিকান্তের বাড়িতেই দেখা করতো। সুলেখা কারো সাথে যোগাযোগ রাখতো না,শুধু নিজের বন্ধুবান্ধব নিয়েই ব্যস্ত থাকতো। শশীকান্ত গরীব ছেলেমেয়েদের আর্থিক সাহায্য করতো। একদিকে নিরুপমা দেবীর বয়স বাড়তে থাকে একদিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। নিশিকান্ত চাকুরী ছেড়ে দিয়ে চলে আসেন বাড়িতে।অনেক ডাক্তার, কবিরাজ দেখানো হয় কিন্তু সুস্থ আর হয়ে ওঠেন না। রোজ আসে মন খারাপ নিয়ে ফিরে যায়। সেদিন ছিলো বেজায় বৃষ্টি।সকাল থেকেই নিরুপমাদেবীর অবস্থা খারাপ হতে থাকে, শশীকান্ত কলেজে ক্লাস নিলেন না সোজা চলে আসেন তাঁর মায়ের কাছে।চুপ করে বসে থাকে কিন্তু কখন যেন তিনি ঘুমিয়ে পরেন। রঘুর কান্নার শব্দে তিনি তাকান। বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে একটা ঠান্ডা বাতাস বইছে তার মা আর নেই সেটা বুঝে পারে।রঘু গেলো শশীকান্তের বাড়িতে। দরজার কড়া নাড়তেই। দরজাটা খোলেন সুলেখা। রঘু তাঁকে নিরুপমাদেবীর মৃত্যু সংবাদটা দেন। কিন্তু তিনি সেখানে গেলেন না। এর পরে নিরুপমাদেবীর মৃত্যুদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। শ্রাদ্ধশান্তির পরে শশীকান্ত কলেজে যান। তবে মন খুব খারাপ। তবে এখন ছুটি পেলেই গ্রামের পুরোনোটিতে চলে যান, ছোট্টবেলার স্মৃতির সন্ধানে।শশীকান্তের বাড়িতে সুলেখার তির্যক বাক্যের জন্য কোনো কাজের লোকই বেশি দিন থাকে না। কলেজ থেকে আসার পরে বিকেলবেলা চা দিয়ে গেলো এক মহিলা সাদা কাপড় পরা ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢাকা।চা খেয়ে নিজের লাইব্রেরি ঘরে বই পড়েতে চলে যান ।পরেরদিন সকালে তাঁর টেবিলে খবরের কাগজ, চা এক গ্লাস জল ঢাকা দিয়ে রাখা, অন্য দিন তো বলতে হয় আজকে না বলতেই সব হাতের কাছে। কলেজ যাওয়ার সময় খেতে বসেছে ঠিক তাঁর মা যেভাবে দিতো খেতে সেইভাবেই সাজানো খাওয়ার থালাটি।সুলেখা বেরোলো তনিমাকে নিয়ে স্কুলে দিতে। শশীকান্ত খেয়ে কলেজে চলে যায়। সারাদিন পড়ানোর পরে বেশ ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরতেই চা, জলখাবার দিয়ে গেলো মহিলাটি। পরীক্ষার খাতা দেখতে ব্যস্ত, রাতে সুলেখা খাওয়ার জন্য ডাকে । খেতে খেতে শশীকান্ত সুলেখাকে বলে "আজকে কী তুমি রান্না করেছো?,"
সুলেখা --"না,আমি ওই গরমের মধ্যে রান্না করতে পারবো না।তাছাড়া তনিমার পড়াশোনাটা তো আমাকেই দেখতে হয় "।
শশীকান্ত জিজ্ঞাসা করে ""রামু কাকা."... বলে থেমে যায়.
সুলেখা বলে -"কে?"
শশীকান্ত বলে "কিছু না " বলে খেয়ে উঠে চলে যায়।
একদিন কলেজ থেকে ফিরতে একটু দেরি হয়, তনিমা একটি ছোট্ট ছেলের সাথে খেলা করছিলো, মহিলাটি তনিমা ও সেইছোট্টছেলেটিকে ডাকলো সন্ধ্যে হয়ে গেছে। কণ্ঠস্বরে শশীকান্ত খুব আশ্চর্য হয়ে ছিলো, মনে মনে ভাবলেন খুব পরিচিত কণ্ঠস্বর।কিন্তু বাড়িতে ঘরে আসার পরে সব ভুলে পরীক্ষার খাতা দেখতে লাগলো। পড়াশোনা করে তনিমা তার বাবার গলা জড়িয়ে ধরে কোলে বসে নানানকথা বলতে লাগলো। বলতে বলতে হঠাৎ বলে "বাপি জানো আন্টি খুব ভালো। আমাকে নিজে হাতে খাইয়ে দেয়, চুল বেঁধে দেয়, আমার ড্রেস কেচে দেয়, আর জানো দীপু আমার বই গুলো দেখে আর বইয়ের পাতার গন্ধ শুকে।"
শশীকান্তবাবু বলেন --"দীপু কে?
তনিমা -"ওই যে আন্টির ছেলেটা গো। "
একদিন শশীকান্ত দেখে ছোট একটি ছেলে তাঁর লাইব্রেরি ঘরের আলমারিতে রাখা বই গুলো অবাক দৃষ্টিতে দেখছে, তিনি ঘরে ঢুকতেই সে চমকে ওঠে। শশীকান্ত চেয়ারে বসে ছেলেটিকে বলে "বই দেখছিস?"
ছেলেটি ঘাড় নেড়ে বলে "হুঁ."।
শশীকান্ত বলে -"পড়তে পারবি?"
সে বলে "হ্যাঁ "
শশীকান্ত একটু হাসলো।
সকালে চা খেতে খেতে শশীকান্ত সুলেখাকে বলে " ওই বাচ্চাটিকে এই সামনের কোনো ইস্কুলে ভর্তি করলে কেমন হয়? কিছু অক্ষর জ্ঞান তো হবে। "
সুলেখা বলে "যা ভালো বোঝো "।তবে আমার কাজ বাদ দিয়ে শুধু পড়া নিয়ে যেন না থাকে।"
শশীকান্ত সুলেখাকে বলে "তাহলে ওকে এই কাছাকাছি কোনো ইস্কুলে ভর্তি করে দিও।"
সুলেখা বলে " আমার সময় নেই তুমি ওর মাকেই বলো। "----বলে ডাকলেন "দীপুর মা, ও দীপুর মা।
তাড়াতাড়ি করে হাজির হয় দীপুর মা।শশীকান্ত দীপুকে ইস্কুলে ভর্তির কথা বলে ঘোমটায় ঢাকা মুখখানি মাথা নীচু,শুধু ঘাড় নেড়েই সম্মতি জানায়। দীপু ইস্কুলে ভর্তি হলো। সংসারটা দীপুরমা খুব ভালো করে গুছিয়ে রেখেছে। সারাদিন কাজ করেই চলে একদিন বিকেলে ঘোর কালো করে মেঘ এলো আকাশে , এলোমেলো বাতাস বইছে, ধুলো উড়ছে,মেঘের গুরুগম্ভীর শব্দ,আবার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, দীপুর মা জানাল দরজা গুলো বন্ধ করে সিঁড়ি নীচে নেমে যাচ্ছে, হঠাৎই ঝোড়ো হাওয়ায় তার মাথার ঘোমটাটি খুলে যায়, তাড়াতাড়ি ঘোমটাটি মাথায় টেনে নেয়। শশীকান্তের চোখ পড়তেই হতবাক হয়ে যায়। বাইরে মুশলধারে বৃষ্টি পড়ছে সব ঝাঁপসা দেখা যাচ্ছে, ঝোড়ো হওয়ার দাপট, আকাশের বুকে বিদ্যুতের ঝলক। মনের অশান্ত সমুদ্রের ঢেউগুলো উথালপাথাল করে আছড়ে পড়তে লাগলো তার বুকের মাঝে। সারারাত চুপচাপ বসে। নিয়তির কোন পরিহাসে তার গ্রামের সহজ সরল পারুল আজ তার বাড়ির পরিচারিকা দীপুর মা।
লেখিকার পরিচিতি
মালদহ জেলার ইংলিশ বাজার শহরে কবির জন্ম।পিতা স্বর্গীয় রাম গোপাল সরকার,পেশায় একজন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন।পিতামহ স্বর্গীয় গোবিন্দ চন্দ্র সরকার ছিলেন মালদহ জেলায় ইংরেজ আমলের একজন প্রতিষ্ঠিত কবিরাজ মশাই।মাতা শ্রীমতি বীনা সরকার এবং মতামহ স্বর্গীয় নিত্য রঞ্জন সরকার ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী,তিনি দুইবার ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কারাবরণ করেন। কবি খুব অল্প বয়সেই পিতৃ হারা হন।কিন্তু সমস্ত প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর হন।বেশ কয়েক বছর শিক্ষকতাও করেন ।আকাশ নীল, স্বপ্নের উড়ান, কুহেলিকা, প্ৰেমতৃষ্ণা, বিরহের গান কাব্য, নিশির ডাক, একমুঠো প্রেম,ঝরাপাতা ইত্যাদি একাধিক যৌথ সংকলনে কলম ধরেছেন। নিজের একক কাব্য সংকলন "অন্তরালে"।এছাড়া একাধিক পত্রিকায় লেখালেখি করেন।

খুব সুন্দর, একটি গল্প আজ পড়লাম, আগামী দিনও এমন সুন্দর লেখা প্রকাশ হোক, আশা করি।
উত্তরমুছুনআন্তরিক ধন্যবাদ,
মুছুনআমাদের পাশে এবং সাহিত্যের সাথে থাকুন। 🙏🏻
খুব ভালো লাগলো লেখাটি পড়ে। আগামীদিনে আরো ভালো গল্পের আশা রাখছি।
উত্তরমুছুনআন্তরিক ধন্যবাদ,
মুছুনআমাদের পাশে এবং সাহিত্যের সাথে থাকুন।