দায়িত্ব অঙ্গীকার | সুনন্দিতা দত্ত

গল্প......

"দায়িত্ব অঙ্গীকার"
সুনন্দিতা দত্ত
বাঁকুড়া,পশ্চিমবঙ্গ,ভারতবর্ষ 

প্রথম পর্ব 

রীতা দেবী বলে উঠলেন : নে বাবু !! এইবার বৌমার হাতে ভাতের সাজানো থালা টা দিয়ে ওকে বল,-"আজ থেকে সমস্ত ভাত-কাপড়ের দায়িত্ব নিলাম আমি"। 
   কথাটা হাসি মুখে সৌমেন শুনে নিলেও , পূরবীর মনটা মোচড় দিয়ে উঠলো এই ভেবে যে "আমি এতো শিক্ষিত মানুষ হয়েও কেউ একজন আমার খাওয়া পড়ার দায়িত্ব নিতে চলেছে , একপ্রকার বোঝা টানার মতো । আর এটা আমাকে মুখ বুজে মানতে হবে !! না, পারবো না"।

হঠাৎ , পূরবী হালকা হাসি দিয়ে বলে উঠলো ,-"থাক না মা , কি দরকার এসব অকথ্য নিয়মের , যেখানে আমি নিজেই একজন শিক্ষিত-সাবলম্বী মেয়ে, তার চাইতে আমরা তো একে অপরের ভাতকাপড়ের দায়িত্বের পরিবর্তে দুজন দুজনের প্রতি ভালোবেসে আগলে ভালো রাখার দায়িত্ব টা নিতেই পারি... এতে দুজনের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা দুটোই থাকবে!!" 

এ কথা শুনে কিছুটা চটে গিয়ে  রীতা দেবী বললেন - "এ কি অলুক্ষণে কথা রে মেয়ের , তা তুমি তো বাপু পড়াশোনা বাদ দিয়ে চাকরি বাকরিও তো কিছুই করো না । ঐ বাড়ি থেকে আসার পর এ বাড়িতে তোমার খাওয়া পড়ার দায়িত্ব টা আমার ছেলে নেবে না তো কি করবে । ওকেই তো সামলাতে হবে তোমায় ।" 

দ্বিতীয় পর্ব  

    কথাগুলো বড্ড বিঁধলো পূরবীর মনের মধ্যে। তবুও একমাত্র সৌমনের কথা ভেবে ওদের ভালোবাসার কথা ভেবে সব সহ্য করে নিয়ে ঐ নিয়মই মানতে হলো তাকে । যদিও পূরবী এ বাড়িতে নতুন সদস্যা, এখুনি হয়তো এতটা তর্কে জড়ানো উচিত নয় ভেবে চুপ করে থাকলো ।

সম্পন্ন হলো রীতিমতো বৈবাহিক নিয়ম-কানুন। 

এভাবেই কাটিয়ে দিলো জীবনের তিন বছর পূরবী আর সৌমেন একসাথে। এখন পুরো বাড়িটাই তার নিজের , যেনো এ বাড়ি ছাড়া সে আর কিছুই বোঝে না , কোথাও মন টেকে না । সবাইকে ভালোবেসে আগলে গুছিয়ে নিয়েছে বেশ সুন্দর করে সবটা পূরবী একা হাতেই। রীতাদেবীর (পূরবীর শ্বাশুড়ি) বয়সও বেড়েছে , তাই পূরবী এখন ওনাকে ভীষন আদর যত্নে রাখে ।
সাথে নিয়মিত ওষুধ দেওয়ার সাথে সাথে সৌমিক বাবুকেও (পূরবীর শ্বশুর) নজরের খেয়ালে রেখেছে সে।
    একটা ছোট্ট মেয়ে আছে বছর দুয়েকের। 
সবাইকে নিয়ে আজ এই তার ভরা গোছানো পরিপাটি একটি সংসার ।
কিন্তু এরই মধ্যে তার স্বামীর চাকরি কিছু কারণবশতঃ স্থগিত আছে বেশ কয়েক মাস। তবে সংসার ঠিকই চলে যাচ্ছে ভালোভাবে।
  কারন , আজ এই চারটি মানুষের খাওয়া পড়ার দায়িত্ব সে একাই মাথায় তুলে নিয়েছে বেশ কিছু মাস। পূরবী এখন একজন ফুড ডেলিভারীর কাজে নিযুক্ত। বাড়ির সব কাজ সেরে প্রতিদিনের মতো কিছু খাবারের লিস্ট থেকে খাবার বানিয়ে বাড়ি-বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসে নিয়মিত । এর থেকে যা রোজগার হয় তা দিয়ে মোটামুটি ভালোভাবেই চালিয়ে নিতে পারে সে। পূরবী জানে না , তার এই দায়িত্ব ঠিক কতদিনের !! জানে না এটাও কতোটা পর্যন্ত সে পারবে এগিয়ে যেতে একা পায়ে হেঁটে । স্বামীর এই বিপন্ন সময়ে আজ লড়াই টা তার একার।

অন্তিম পর্ব

এরকম দুঃসময়ে যেখানে সেদিনের ভাতকাপড়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা নিজের মানুষ গুলোও, কেউই পাশে নেই , সেখানে এই একদিন আসা পরের বাড়ির মেয়েটাই শক্ত করে স্বামীর হাত ধরে রেখে নিশ্চিত করছে প্রতিটা মুহূর্ত । চরম বিষন্নতায় খুশিতে রাখছে তার শ্বশুর-শাশুড়িকে । পুচকে কোলের বাচ্চা টাকেও সেই কিঞ্চিৎ সময়ের মধ্যেও আগলে রেখেছে যত্নে। যতোই হোক আজ দায়িত্ব টা ওর একার , শুধু একজন স্ত্রী হিসেবে নয় আজ , একজন মা আর একজন মেয়ে হিসেবেও লড়াই টা তার একার।

কে বলেছে , মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে দায়িত্ব টা শুধু তার স্বামীর ই হয় !! বিয়ে মানেই দায়িত্ব টা দুজনের প্রতি দুজনের আগলে রাখার ।
শক্ত হাতে ভাতের থালা আর বাঁচার জ্বালা নিয়ন্ত্রণ করে একটু বেশিই সুন্দর সংসার সাজানো।
  বিয়ের পর একটা ছেলে যখন একটা মেয়ের দায়িত্ব নেয় সেটা নিয়মের মধ্যে আয়োজন করে দেখানো হয় , কিন্তু ষাট-সত্তর বছর ধরে একটা মেয়েও যে সবার চোখের আড়ালে নিয়মিত প্রাণপণ চেষ্টা করে বাড়ির প্রত্যেকের ভাত-ডালের হিসেব থেকে ওষুধের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে নজর রাখে বাড়ির ছাদ থেকে সদর দরজা অব্দি ,, তার দায়িত্ব প্রমাণের ;
 কই ? আয়োজন হয়না তো কখনো !!

কেনো হয়না ?? মেয়েদের দায়িত্ব টা কি সহজেই চাইলে তুলে দেওয়া যায় মাথায় ??
   না , আসলে আমরা মেয়েরা এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এরকম প্রথা কে মেনে নিয়েছি বা নিচ্ছি নিজের ইচ্ছায়।

আমরা জানি আমাদের ঘটা করে কেউ কোনোদিনই দায়িত্ব পালন দেখানোর আয়োজন না করলেও আমি যেই বাড়িটাই সিঁদুর পরে দাঁড়িয়ে এই বাড়িটা আমার নিজের বাড়ি , আজ থেকে এখানের সব মানুষগুলো আমার নিজের মানুষ ।তাই শেষদিন পর্যন্ত সবার দায়িত্ব আমার ।
আসলে এই ভাত কাপড় প্রথা নামক বস্তুটিতে ঐ "আজ থেকে তোমার ভাতকাপড়ের দায়িত্ব আমি নিলাম"- এটা বলার মধ্যে যে কতখানি অবজ্ঞা লুকিয়ে থাকে সেটা আজও অধিকাংশ মেয়েই বোঝে না। সহজ চলিত রীতি হিসেবেই এই নিয়ম মেনে নিতেও আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি হাসিমুখে।
   যেখানে বিপদের সময় একটা মেয়েও পারে এক নিমিষেই একা হাতে দায়িত্ব তুলে নিতে ,সেখানে একটা ছেলের এই অস্বাভাবিক কথাটা না বললেই নয় এই দিনে।
থাকুক না দায়িত্ব-কর্তব্য দুটো মানুষের পরিপূরক ভাবে ভালোবাসা ভালোরাখায়।

তবে এই শতাব্দীতে এসে কিছুটা সমাজ হয়তো বদলেছে । এখন দেখেছি অনেক বাড়িতে এই অবিবিধ নিয়মআচার চললেও বলতে বলা হয়না যে ঘটা করে সাক্ষী রাখুক স্ত্রীর দায়িত্ব পালনের। 
    আশা রাখি , সমাজ সংস্কৃতি একদিন ঠিকই বদলে যাবে সময়ের সাথে সাথেই। মানুষ শিখবে স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব কর্তব্য পালনে উভয়েরই  সমানাধিকার আছে। এই প্রাচীন প্রথার একদিন অবশ্যই অন্তঃসার ঘটবে।
এই বাঙালি বিয়ের সত্যি তথাকথিত নিয়ম-কানুন বদলে গিয়ে হয়তো নব বিবাহিত দম্পতিরা তাদের বৈবাহিক জীবনে প্রথম নিয়মরীতি পালনে সকলের সামনে ভাতের সাজানো থালায় দুজনেই হাত ধরে রেখে একই অঙ্গীকারবদ্ধ হবে এই বলে- " আজ এই মুহুর্ত থেকে আজীবন একে অপরের পরিপূরক হয়ে এই সংসার সহ তোমাকে আগলে রাখার দায়িত্ব নিলাম স্ব-ইচ্ছায় "।

দায়িত্ব টা থাকুক দুজনের । বিবাহিত জীবনের প্রতি পদক্ষেপ তাহলেই হবে সুন্দর সহজ সাবলীল।
দায়িত্ব অঙ্গীকার | সুনন্দিতা দত্ত

লেখিকার পরিচিতি-

আমি সুনন্দিতা দত্ত।
আমি বাঁকুড়া জেলার, বিষ্ণুপুর থানার অন্তর্গত বিষ্ণুপুরের বাসিন্দা। আমার বাবা- শ্যামাপদ দত্ত ও মা- পুতুল দত্ত । 
আমি একজন মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। আমার যোগ্যতা - বি.এ (গ্র্যাজুয়েশন কমপিল্ট)।
আমি ছোট থেকে সেভাবে গোছানো ভাবে লিখতে না পারলেও ছন্দে ছন্দে মিলিয়ে লিখতে শুরু করেছিলাম। কখনো ভাবিনি এই লেখালেখি বিষয়টা আমার একদিন ভালোলাগা ভালোথাকা হয়ে উঠবে । বরাবরই লিখতে একটু বেশিই ভালোবাসি । মাঝেমধ্যে পচ্ছন্দের কবিতা ,ছড়া পাঠও করেছি মঞ্চে উপস্থিত হয়ে। 
ধীরে ধীরে এই লেখালেখির প্রতি মা বাবা খুব আগ্রহ প্রকাশ করেন । পাশেও থেকেছেন , থাকছে এবং থাকবে বরাবরই । আমিও বড়ো হওয়ার সাথে সাথেই এই লেখালেখি বিষয়টা কে শক্ত হালে ধরতে শুরু করি নবম-দশম শ্রেনীতে । ডাইরিতে লিখতাম ,এখনো লিখি । তার সাথে আমার ফেসবুক একাউন্ট থেকে , পেজ থেকে , ইউটিউব চ্যানেল থেকে বিভিন্ন স্বরচিত কবিতা ,গল্প , কথোপকথন কিম্বা অন্য লেখক লেখিকার লেখাও পাঠ করে থাকি । আমি বিভিন্ন পেজ , পত্রিকা তে লেখালেখি করি । আপনাদের সকলের আশীর্বাদ ও ভালোবাসায় বেশ কিছু প্রাপ্তি অর্জন করতে পেরেছি এই অবধি । আরো এগিয়ে যেতে চাই ।
 এটা সবার খুব ভালো লাগে এবং আমাকে সকলে অনুপ্রাণিত করে। বন্ধুবান্ধব, প্রিয়জন কাছের মানুষ , খুব সাহায্য করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
আমার নতুন কিছু লেখা শোনানোর বেশ কয়জন ধরাবাঁধা প্রথম শ্রোতা (যেমন- মা , প্রিয়বন্ধু , দিদি ) বরাবরই উৎসাহিত করে আর মনোযোগ দিয়ে শোনে । ওরাও আমার এই চেষ্টা কে আরো দশগুণ ইচ্ছেয় বাড়িয়ে দেয় প্রতিবারই । আমি একাধারে আঁকাআঁকি, সংগীত চর্চার পাশাপাশি এই ইচ্ছেটাকে অন্যতম বলে মনে করি আমার । আর সেই কারনেই সারাদিন সমস্ত কাজের ফাঁকে ,অবসরের ফাঁকে একটু লেখালেখির চেষ্টা করি।

আমি চাই এই লেখালেখির মাধ্যমে আরো ভালো ভালো লেখা উপহার দিতে আপনাদের মতো স্বহৃদয়বান পাঠকদেরকে ।
লেখাতে থাকুন, পড়তে থাকুন , সুস্থ থাকুন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

১৬ মে ২০২২

এক মুঠো পয়সা | প্রত্যুষ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়