নিভৃতচারিণী | সামসুজ জামান
গল্প......
"নিভৃতচারিণী"
সামসুজ জামান
বেশ বুঝতে পারি ছায়ামূর্তিটা আমাকে দেখেই সর্বদা দূরে সরে থাকার চেষ্টা করে। আমি অন্ধকার ঘর থেকে যখন ওর দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকি তখন ও বারান্দার ঠিক পাশটিতে ফুল বাগান থেকে উঠে আসা বড় গাছগুলোর আড়াল থেকে বারবার উঁকি ঝুঁকি মারার চেষ্টা করে। আমি শত চেষ্টা করেও কিছুতেই আমার চোখদুটো বন্ধ করতে পারিনা। মনে হয় যেন আমার স্বপ্নচারিনী এটা। স্পষ্ট একটা প্রতিচ্ছবি আমার মানস নেত্রে ভেসে উঠে। আর চোখ দুটোতে তখন স্বপ্নালু আলো জেগে ওঠে।
জানি ত্যাগের মধ্যেই প্রেমের পূর্ণতা কিন্তু সে তো কথার কথা। ত্যাগ ও ভোগের দ্বন্দ্ব বেঁধে যায় মনের মধ্যে মাঝে মাঝে। ভোগের আকাঙ্ক্ষা বড় প্রকট হয়ে দাঁড়ায় আর সেই আশায় সবসময় ঘর বন্দী হয়ে থাকাটা আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনা। আর ঠিক তখনই মাঝে মাঝে ঘর ছেড়ে অন্ধকার বারান্দায় বেরিয়ে পড়তে বাধ্য হই আর সঙ্গে সঙ্গেই ভুল বুঝতে পারি। ছায়ামূর্তিটা অন্ধকারের সঙ্গেই লীন হয়ে যায়।
আমার কল্পনা বিহারিনীকে সামনাসামনি দেখতে ইচ্ছে যায়। চোখের জল কে সাক্ষী রেখে ওকে আমি বুঝিয়ে দিতে চাই কত ব্যথা হৃদয়ে আমার। কিন্তু ওর সমস্ত বোধ শক্তি নিশ্চয়ই লোপ পেয়ে গেছে না হলে সবের শেষ আছে অথচ ওর সর্বনাশী খেলার কেন শেষ নেই। ও কিছুতেই বুঝে না ওর চিরন্তনী লুকোচুরি খেলা টা কে নিয়ে ও ছুটে বেড়ায় গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে।
কখনো বা ঘরের ডিম লাইটটা জ্বালিয়ে ব্যালকনির দিকের জানালাটা খুলে দিলে বাগানের গাছগাছালিতে মৃদু মৃদু হালকা সবুজ আলো পড়ে গাছগুলোর পাতায় পাতায় আর এক কল্পনার রাজ্য গড়ে তোলে। আমার মনে হয় সেটা যেন একটা স্বর্গীয় পরিবেশ। এই পরিবেশেই যেন মানসকন্যার আবির্ভাব ঘটাতে পারে। কিন্তু না সব ভুল সব বৃথা হয়ে যায় এমন স্বর্গীয় পরিবেশের পেতেও তাকে কিছুতেই ধরে রাখা যায় না। গাছের পাতায় আলো ফুটতেই সেই মায়ার খেলা স্তব্ধ হয়ে যায।
আমি এখন খুব সহজেই বুঝতে পারি তার আবির্ভাব ঘটল সামনে যাওয়ার চেষ্টা করা একেবারেই বৃথা। আড়াল থেকে উঁকি দিলে সেকি জানতে পারেনা? গাছের আড়ালে নিজেকে কিছুটা গোপন রেখে মায়ার খেলা খেলেই চলে। অথচ আমাকে সামনে দেখেই তার যত লজ্জা আর যত আপত্তি।
কাল রাত্রে বিশ্বপ্রকৃতি কিছুটা স্তব্ধ হয়ে আসার পর তাকে যখন দেখেছিলাম, তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম কিছুতেই আজ তার সামনে যাচ্ছি না। আমাকে রোজ রোজ সে ফাঁকি দিয়ে বেড়ায় সুতরাং আজ আড়াল থেকে তাকে প্রাণভরে দেখব। দেখি কতক্ষণে এসে আমার সম্মুখ থেকে বিদায় নিতে পারে। একমনে গভীরভাবে চেয়ে আছি সেদিকে। সে ও নিজে থেকে বিদায় নিচ্ছে না। বহুক্ষণ কেটে গেল সেই গাছগাছালির মায়াবী আলো-আঁধারিতে। আমি পরিষ্কার তার উপস্থিতি বুঝতে পারছি।কিন্তু একসময় নিজেরই ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো হঠাৎ চলে এলাম বারান্দায়। আর সঙ্গে সঙ্গেই আমার পরাজয় কারণ সে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।
তারপর কিছুতেই আর ঘুম আসছিল না। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের অপরাধে নিজেকে বড় দোষী বলে মনে হচ্ছিল। ঘড়িটার দিকে তাকালাম - দুটো বেজে দশ মিনিট। মনে-মনে অভিমান হল ঘরের দরজা ইচ্ছে করেই খোলা রাখলাম। কিন্তু হঠাৎ বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু কিসের ধাক্কায় নিদ্রাভঙ্গ হল। ঘড়িটার আলো জ্বলছে দুটো বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট। বাইরে দূরের আলোগুলো জ্বলছে অথচ ঘর অন্ধকার কেন বুঝলাম না। মাথার কাছে সুইচে হাত দিলাম, আলো জ্বললো না। খুব আশ্চর্য হলাম। মনে মনে এর কারণ চিন্তা করছি এমন সময় মনে হলো কে যেন ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিল! কিন্তু বেশী কিছু ভাবনা মনের মধ্যে ঠাই পাওয়ার আগেই দুহাতে আমার গলার শিরা চেপে ধরার চেষ্টা করল। গলার স্বর শুনে অন্ধকারে ও বুঝলাম এ সুদীপ ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। কারন ও ই এই মুহূর্তে আমার সবথেকে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। এমন গভীর রাতে আমার ঘর খোলা পেয়ে সুদীপ ঘরে প্রবেশ করার পিছনে কি রহস্য থাকতে পারে সেটা আমার কাছে অজানা নয়।
আমি কথা বলার আগেই সুদীপ বাঘের মতো লাফিয়ে পড়ল আমার বুকের উপর। দুটো কঠিন হাত যেন পাথরের মত আমার গলায় চেপে বসে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে সুদীপের প্রশ্ন - সত্যি বল কাল রাতে কার সঙ্গে অত কথা বলছিলি? কিন্তু বলার মতো শারীরিক বা মানসিক কোনো শক্তিই তখন আমার নেই।
কিন্তু সেই মুহূর্তেও দরজার দিকে চোখ পড়তেই আমার জ্বালা যন্ত্রণা যেন অন্তর্হিত হয়ে গেল। দরজা দিয়ে প্রবেশ করছে রণরঙ্গিনী মূর্তি। অথচ তার জ্যোতির্ময়ী রূপ দেখে আমার হৃদয় যেন জুড়িয়ে গেল! সুদীপ হঠাৎ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে নিশ্চল ভাবে বসে পরলো। হাতদুটো শিথিল হয়ে গেছে। এই অবসরে প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠলো প্রচন্ডভাবে আমার মনের মধ্যে। ক্ষিপ্র গতিতে সুদীপের দিকে এগিয়ে যাবার কথা ভাবছি। আশ্চর্য! ঠিক সেই মুহূর্তেই মূর্তিটা হাত ইশারায় আমাকে নিষেধ করল।
আমি একটু লজ্জিত হলাম। ছায়ামূর্তিটা আমার দিকে চেয়ে যেন দুষ্টু মিষ্টি মৃদু হাসি হাসলো। সুদীপ হাত জোড় করে মূর্তিটার দিকে চাইতে মূর্তিটা ইঙ্গিতে ওকে চলে যেতে ইশারা করতেই সুদীপ দ্রুত ঘর ছেড়ে প্রস্থান করলো।
আশ্চর্য! যে মূর্তি টাকে দেখার বাসনায় প্রতিনিয়ত আমার চেষ্টার ত্রুটি নেই সেই মূর্তি খুব কাছে অথচ তাকে স্পর্শ করার সাহস পেলাম না। তার শরীর থেকে বিচ্ছুরিত আলোয় আমার সারা ঘর আলোকিত হয়ে আছে। আমি নিস্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম আমার প্রতিদিনের স্বপ্নচারিনীর দিকে। আর অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম এও কি সম্ভব?
সুইচে হাত দিয়ে লাইট জ্বালানোর আবার চেষ্টা করতে ও খুব মৃদু এবং মিষ্টি স্বরে বলল- আমি চলে যাই তারপর জ্বালবে।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম-: সুদীপের হাত থেকে তুমি আমায় বাঁচালে কেন?
প্রত্যুত্তরে ও বলল - তুমি না থাকলে যে আমার অস্তিত্ব মিথ্যা। আমার অস্তিত্বের তাহলে আর কোন প্রয়োজন নেই। আমিও তো এতদিন নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলতাম।
প্রশ্ন করলাম -তুমিই কি আলো বন্ধ করেছো?
- হ্যাঁ। ওর উত্তর।
কিন্তু কীভাবে তুমি জানলে সুদীপ আমায় খুন করতে আসবে?
ও আবার হাসল। পাগলের মত হাসিতে লুটিয়ে পড়ল। তারপর আস্তে আসতে বলল-- মনের মানুষের....। হঠাৎই কথা বন্ধ করে থেমে গেলও। আমি খুব অবাক হয়ে ওর দিকে চাইলাম।মনে হল লজ্জায় মুহূর্তের মধ্যে ওর মুখটা যেন রাঙা হয়ে উঠলো।
আমি আকুল হয়ে উঠলাম -- এতদিন কেন তবে লুকোচুরি খেলায় নিজেকে লুকিয়ে রাখতে?
- তোমার পরীক্ষা হচ্ছিল ওই খেলার মধ্যে দিয়ে। ধৈর্যের মধ্যে দিয়েই তো মূল লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় -- একটু দার্শনিকের মত কথা বলল ও। আর তারপরই এক আশ্চর্য কান্ড করলো। হঠাৎ আমার কাঁধে মাথা রেখে নিজেকে হারিয়ে ফেলল যেন। বুঝলাম ওর চোখ জলে পরিপূর্ণ। পাগলের মত বলে উঠলো কিন্তু আমার জন্য তুমি তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে তুচ্ছ ভেবে কেন এত রাতেও দরজা খুলে রেখেছিলো বলো? আজ তোমাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে। বলো কেন? যদি সুদীপ তোমাকে.......! এ পর্যন্ত বলেই হঠাৎ যেন একটা শিহরন খেলে গেল ওর সারা শরীর জুড়ে।
আমি কি উত্তর দেব মনের উত্তরের পৃষ্ঠা সাদা হয়ে আছে বললাম - তুমি তো আছো।
কতক্ষণের স্পর্শ জানিনা হয়তো আমি সম্বিত হারিয়ে ফেলেছিলাম। ও হঠাৎ বলল - এবার আমায় বিদায় দাও ভোর হয়ে আসছে।
আমি বললাম -আচ্ছা এমন অলৌকিক ঘটনা মানুষের জীবনে ঘটে লোকে বিশ্বাস করবে?
ও উত্তর দিল- লোকের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের উপর কিছু নির্ভর করে? আর তাছাড়া কথাটা প্রকাশ করো না কোথাও, অকারনে তুমি সকলের কাছে অকারণে হাসির খোরাক হয়ে যাবে। তোমার পূর্বজন্মের অনেক ভালো কাজের পুরস্কার এটা। পূর্বজন্মের ভালোবাসার ফল। ভালোবাসার মৃত্যু ঘটে না কখনো কথাটা বিশ্বাস করো তো?
আমি সেই উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করলাম -আবার আসবে তো?
ও খিলখিল করে হেসে উঠল আবার - আমি তো রোজ তোমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় এসে দেখে যাই। আসবো না আবার?
- কিন্তু আমিতো তোমাকে প্রতিদিন দেখতে পাই না।
- সেই জন্যই তো গাছের ডালে পাতায় আমি খেলে বেড়ায়। আর আমি তো একান্তই তোমার, তাই আমি কি না এসে নিজেই দূরে সরে থাকতে পারবো?
একটু পরেই ঘরের সবুজ আলোটা হঠাৎ জ্বলে উঠল। ও বলল - এই আলো জ্বেলে তুমি আমার আগমনের পরিবেশ সৃষ্টি করো। এখন এই তো জ্বাললাম।
- এখন ওটা নিভিয়ে দাও। এমন স্বর্গীয় আলোর চ্ছটার কাছে ও আলো অনেক মলিন। আমি এ কথা বলার সাথে সাথে আলো নিভে গেল।
ও একটু এগিয়ে যেতেই কখন আমার চোখে জল এসে গিয়েছিলো। মনে হলো ওকে একবার বড় আপন করে কাছে টেনে নিই। কিন্তু আমি কিছু ভাবার আগেই আমার কপালে চুম্বন রেখা একে দিলও। নিজেকে আমার বুকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল আমার যাবার সময় তুমি এমনভাবে কাঁদলে আমি কেমন করে যাই বলো? একটু থেমে আবার বলল -- তুমি আমায় চিনতে পেরেছো তো? আমি তোমার সেই...
কথা কেড়ে নিয়ে উত্তর দিলাম আমি - তোমাকে চিনব না সেও কি সম্ভব?
আমার চোখের জলে ওর বুকটা ভিজে গেলো। ও করুণ মুখে শুধু আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি বললাম চলো সোনালী তোমায় বিদায় দেবো হাসিমুখে।
সোনালী আমার পা ছোঁবে বলে নত হয়েছিল, ওকে টেনে তুলে নিলাম। কিন্তু চোখের জলটাকে কোনমতে আটকে রাখা যাচ্ছিল না। একটু পরে সোনালীকে নিয়ে এগিয়ে চললাম। বললাম- এবার এসো। ও বলল বিদায় দিতে কষ্ট হচ্ছে না? আমি বললাম চোখের জলটা কি বিনা কারণে? তুমি আবার আসবে এটাই আমার মনের সান্তনা।
আবার একটু হাসল সোনালী। তারপর আরেকটু এগিয়ে চলল। নিভৃতচারিণীর সেই চলে যাওয়ার ছবি দেখতে দেখতে আমি অবাক হয়ে ভাবলাম - এও কি সম্ভব? এই পৃথিবীতে আসলে আশ্চর্য বলে কোন কিছুই নেই। বাগানের চাঁপা ফুলের গাছটা সহসা ডালপালাগুলো একবার দুলিয়ে দিল একটু জোরে।
লেখা পাঠানোর জন্য আহ্বান
👇

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন