আবাসনের প্রহরীটি | রুচিরা সাহা
গল্প......
"আবাসনের প্রহরীটি "
রুচিরা সাহা
ইংলিশবাজার,মালদহ,পশ্চিমবঙ্গ,ভারতবর্ষ
হীরালাল চক্রবর্তীর বাড়িতেই রয়েছে একটি মুদিখানা দোকান। মুদিখানা দোকানের সাথে সাথে পুরোহিত্যও করতেন।তিন ভাইয়ের সংসারে তিনিই ছিলেন বড়।কানে কম শুনতেন।পাড়ায় তিনি কালা হীরা নামেও পরিচিত ছিলেন।অন্য দুই ভাই চাকুরী করতেন। স্ত্রী দেখতে ছিলেন পরমা সুন্দরী।তিন বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন।মামা বাড়িতেই বড় হন।আর্থিক অবস্থা খারাপ কাজেই বধির হীরার সাথে তাঁর বিয়ে হয়।চারটি ছেলে মেয়ে তাঁর।বড় মেয়ে উষা।সে দেখতে ঠিক তার মায়ের মতো।ওরপরে স্বপন,লক্ষ্মী,খোকন।দোকানে সেরকম জিনিসপত্র বিক্রি হত না।কানে কম শুনতো সেই জন্য যিনি জিনিস কিনতে আসতেন উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে কথা বলতে হত সেই অসুবিধার জন্য লোকে আসতো কম।তার স্ত্রী সংসারের কাজের মাঝে একটু একটু করে দোকানে জিনিসপত্র বিক্রি করে,গোবর কুড়িয়ে এনে ঘুঁটে দিয়ে,কোনোরকমে সংসার চালাতো।ছোট ছেলেটি ছয় বছর বয়স থেকেই তার বাবার সাথে মুদিখানা দোকানটিতে বসতো।লক্ষ্মী তার মায়ের সাথে সংসারের কাজকর্ম করে পড়াশোনা করতো।স্বপন ছিল তাঁদের অত্যন্ত আদরের সন্তান।কাজেই স্বপন একটু আহ্লাদে বড়ো হয়।মুদিখানা দোকানে কোনোদিনও সে বসতো না।পড়াশোনায় মধ্যম ছিল,তবে হস্তাক্ষর অত্যন্ত সুন্দর।প্রচুর ঐশ্বর্য্যশালী বন্ধু ছিল তার।আর্থিক অভাব থাকলেও হীরালাল ছেলের আবদার পূরণ করতেন।এই ঐশ্বর্য্যশালী বন্ধুদের সঙ্গ তাকে জীবনের অন্ধকারের পথে নিয়ে যায়।এদিকে উষা ছিলো একেবারে নির্বোধ ।কেউ একটু কিছু খেতে দিলে সারাদিন তার বাড়ির সব কাজকর্ম করে দিতো।স্বপন মাধ্যমিক পাশ করে ভালো নম্বর পেয়ে। একহারা রোগা পাতলা চেহারা পুষ্টির অভাব ছিল যথেষ্টই।মাধ্যমিক পাশ করার পরে সে একটি কাঠের কারখানায় ম্যানেজারের পদে নিযুক্ত হয়।শুরু হলো তার নতুন জীবনযাত্রা।কারখানার মালিকের ছয়টি ছেলেমেয়ে।দুটি মেয়ে আর একটি ছেলে বিবাহিত।বয়স্ক মালিক তাকে খুব স্নেহ করতেন,সেই সঙ্গে গিন্নিমাও।হীরালাল বোধহয় একটু স্বস্তি পেয়েছিলেন।সংসারে একটু আর্থিক অবস্থার উন্নতি হতে লাগলো।সকাল আটটার সময় মালিকের কাছে থেকে চাবি নিয়ে কারখানা খুলে সব কিছুই একা সামাল দিতো।কোন মিস্ত্রী এলো না,কী কী কাজ করাতে হবে, মেশিনপত্র দেখা,ইত্যাদি রাত্রি আটটা পর্যন্ত কারখানা খোলা থাকতো।তারপরে বন্ধুদের সাথে একটু আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরতো টলতে টলতে রাত্রি সাড়ে এগারোটার পরে।এইভাবে চলতে লাগলো জীবনযাত্রা।এদিকে ঊষা বড়ো হয়ে যেতে থাকে।ও যেকোনো কথাই সজোরে হাসতে হাসতে বলতো ।সেইজন্য পাড়ার বেশিরভাগ লোকের কাছে হাস্যকর হয়ে ওঠে।একদিন সে একটি ছেলের ভালোবাসায় পড়ে ।মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে পরিমল।ছয় মাস ভালোবাসার পর একদিন উষাকে তার বাড়ি থেকে পালাতে বলে তাকে বিয়ে করবে বলে।ঊষার খুব আনন্দ সে নতুন বউ সাজবে।পরিমলকে ভালোবেসে সে একদিন বিকেলে বাড়ি থেকে বেরোয় কাউকে কিছু না বলে।এদিকে পরিমল অপেক্ষা করছিলো।উষা আসতেই সে মোটর বাইকে করে সোজা চলে আসে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে।সন্ধ্যে গড়িয়ে গেছে উষা বলতে থাকে "বিয়ে কোথায় হবে?"
পরিমল বলে "এইতো আর কিছুক্ষনের মধ্যেই সব হয়ে যাবে।"
রাত্রি এগারোটার সময় একটি মহিলা আসে।পরিমল উষাকে বলে "ও তোমাকে বিয়ের কনের সাজে সাজিয়ে দেবে তুমি ওর সাথে যাও।সামনের মন্দিরেই আমরা বিয়ে করবো।"
উষা সেই মহিলার সাথে যায়।একটি বাড়িতে খুব আলো জ্বলছে।সেইখানে উঠে উষা।চারিদিকে অন্যান্য মেয়েরাও খুব সেজেগুজে রয়েছে।ভেতরে ঢুকতেই দেখে বয়স্কা আর এক মহিলা।তিনি পান চিবোচ্ছেন।গায়ে অলংকারে ভর্তি।মহিলাটি সেই বয়স্কা মহিলাকে বলেন "এই নিন মাসি "।
উষা প্রথমে থতোমতো হয়ে যায়। এই বয়স্কা হলেন দুলালীবাঈ।তিনি শুধু ওই মহিলাটিকে বলেন "যা ওকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে তৈরী করে নিয়ে আয়।"
উষা বলে "পরিমল কোথায়?আমাদের বিয়ে?"
মহিলাটি উত্তর দেন "এখানে কোনো বিয়ে হয় না।আর এখান থেকে আর সমাজে ফিরে যেতে পারবে না কোনোদিনও।
এখানে তোমাকে পরিমলই বিক্রি করে দিয়ে গেছে।তোমার মতো আরও দুজন আছে এখানে।"শুনতে শুনতেই উষা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় মাটিতে।
এদিকে ঊষার বাড়িতে খোঁজাখুঁজি চলছে।পাড়ার লোকজন একে অপরের বাড়িতে খোঁজ খবর করছে।অবশেষে পরেরদিন সকালে ঊষার বাবা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করে।পরিমল ততক্ষনে পালিয়ে গেছে উষাকে নিষিদ্ধপল্লীতে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে।সোজা সরল ঊষার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করেছিল।একদিন ঘটনাক্রমে পাড়ার একটি স্বেচ্ছাসেবীর দল সেখানে পৌঁছায়।তাঁরা উষাকে শর্ত সাপেক্ষে সেখান থেকে নিয়ে আসে বাড়িতে।ততদিনে উষা তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। মাস দুয়েক পরে জানা যায় সে অন্তঃস্বত্তা।তারপরে সে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়।কিন্তু সে জন্মান্ধ। বাবার বাড়িতেই থাকতে শুরু করে।এদিকে স্বপনের মালিকের ছোটো মেয়ের বিয়ে।বাড়িতে অনেক লোকজনের আনাগোনা।বড়ো মেয়ে বিজলীর মেয়ে মন্দিরা বেশিরভাগ সময় দাদু দিদার কাছে থাকতো।প্রতিদিন সকালে যখন স্বপন কারখানা খোলার জন্য চাবি নিতে আসতো মন্দিরা দোতলার বারান্দা থেকে দেখতো।কখন যে মন্দিরা ওকে ভালোবেসে ফেলেছিল সে নিজেও জানে না।বিয়ে বাড়িতে মন্দিরা স্বপনের সাথে সাথে থাকে।পরে বলে ফেলে সে তাকে ভালোবাসে।বিয়ে খুব ধুমধাম করে হয়।বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাওয়ার পরে সবাই চলে যায়।কিন্তু মন্দিরা থেকে যায়।তার মায়ের সাথে গেলো না।এদিকে স্কুল খুলে গেছে গরমে ছুটি শেষ।শুধু দিনে ওই একটিবার দেখার আশায় সে পরীক্ষা পর্যন্ত দিলো না।পড়াশোনায় ইতি টানে।একদিন মন্দিরা স্বপনে সাথে পালিয়ে বিয়ে করে নেয়।সারাদিন বাড়িতে না পেয়ে বাড়ির লোকজন খোঁজ করে সন্ধ্যাবেলা দেখা যায় মন্দিরার সিঁথিতে সিঁদুর।স্বপনের বাড়িতে রয়েছে।মামারা অনেক চেষ্টা করেও মন্দিরাকে নিয়ে যেতে পারেনি।কিন্তু স্বপন নিজের স্বভাব পরিবর্তন করে নি।রোজ রাত্রে সে নেশাগ্রস্ত হয়ে বাড়িতে ফিরতো।মন্দিরাকে সেখান থেকে নিয়ে যাবার উপায় বার করার জন্য মালিক স্বপনকে কাজ থেকে বরখাস্ত করে।কিন্তু কোনো ফল হলো না।বিজলী বারংবার তার বাবা আর ভাইদের দোষারোপ করতে থাকে।কেউই মেনে নিতে পারে নি স্বপনকে। মুদিখানা দোকানটি স্বপনের ভাই চালায়।একদিকে ঊষা আর তার অন্ধ ছেলেকে নিয়ে হীরালাল চক্রবর্তীর জীবন ওষ্ঠাগত তখন মন্দিরা সেই অভাবের সংসারে আসে এবং মন্দিরার স্বামী স্বপন বেকার।হীরালাল ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে।প্রচন্ড অভাব মন্দিরার সংসারে।বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পড়িয়ে ,সেলাই করে কোনোরকমে দিন অতিক্রান্ত হতো। স্বপন অন্য এক কাঠের কারখানায় কাজ করে,কিন্তু সব তার নেশায় শেষ হয়ে যায়।মন্দিরা একদিন অসুস্থ হয়ে পরে।পাড়ার লোকজনের কাছে শুনে মন্দিরার দাদু যায়। গম্ভীর প্রকৃতির লোক।তিনি স্বপনকে একটি সরকারি চাকুরী করার কথা বলেন।চাকুরীর পরীক্ষা দিয়ে চাকুরী পায়।কিন্তু বেশি দিন সেই চাকুরী করলো না ছেড়ে দিয়ে চলে আসে বাড়িতে।দুই মেয়ে তার।মন্দিরার মা বিজলী মেয়ের কষ্ট দেখে প্রতি মাসে টাকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।মন্দিরা সেই টাকা ফিরিয়ে দেয়।তার দিদির বিয়েতেও যায় নি।সে বুঝে ছিলো তার স্বামীকে কেউ পছন্দ করে না।স্বপনকে ও খুব ভালোবাসতো।নেশা করে মন্দিরাকে মাঝে মধ্যে মারধোর করতো,মুখ বুজে চুপচাপ থাকতো।হঠাৎ একদিন মন্দিরার শ্বাশুড়ি মারা যায়।যক্ষা হয়েছিল।আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় চিকিৎসার ঘাটতি থেকে যায়।হীরালাল ছোটো মেয়ে লক্ষ্মীর বিয়ে দেয় যৎসামান্য আয়োজন করে। খোকন বিয়ে করে বাবাকে নিয়ে থাকে।সে দিদি ঊষাকেমেনে নেয় নি কোনোদিনও।ঊষার অন্ধ ছেলেটিকে কেউ কিছু দিলে তবেই ওর খাওয়া হতো।হীরালাল মারা যাওয়ার পরে দুই ভাইয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক আর ছিল না।খোকন নিজের মতো তার পরিবার নিয়ে থাকে।মন্দিরা একদিন জামাকাপড় মেলতে গিয়ে পা পিছলে ছাদ থেকে পরে যায়।হাসপাতালে ভর্তি ছিল আট দিন।মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেয়েছিলো আর পায়ের হাড় ভেঙে যায়।স্বপনের অনুপস্থিতি সকলের আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। স্বপন টাকার জন্য একটি আবাসনে রাতের প্রহরীর কাজ শুরু করে।মন্দিরার চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন।সকালে কাঠমিস্ত্রীর সাথে কাজ করতো আর রাতে আবাসনে ।কাজেই ও বাড়িতে যেতে পারতো না। তার না ছিল খাওয়া না ছিল ঘুম।একটা প্যান্ট শার্টে ডিউটি করতো।আবাসনের সামনে দিয়ে ঝালমুড়িওয়ালা যেতো তার কাছে ওই বিকেলেবেলা দশটাকার ঝালমুড়ি কিনে কিছুটা খেতো আর বাকী টুকু সে আবাসনের সব আবাসিকরা ঘুমিয়ে পড়লে খেতো।এক সপ্তাহের বেশি চললো এইভাবেই।একদিন সেই আবাসনের এক আবাসিক অনিন্দ্যবাবু পেশায় একজন ডাক্তার ,তিনি দেখেন রাত্রি সাড়ে দশটার সময় একটি কাগজে মোড়া একটি পুটলী থেকে শুধু মুড়ি খাচ্ছে।তিনি সেদিন রাতে দেখে চলে যান।পরেরদিন সকালে ওকে ডাকেন।এক কাপ চা আর বিস্কিট দেন।সন্ধ্যার পরে অনিন্দ্যবাবুর সহধর্মিনী দ্বিপান্বিতা একটু বেরিয়ে ছিলেন।আবাসনে নতুন প্রহরী দেখে তাকে জিজ্ঞাসা করেন ---”আপনার বাড়ি কোথায়?
স্বপন উত্তরে বলে ---"ওই যে মহানন্দা নদীর বাঁধের পাশে সিনেমা হলটির কাছে।"
দ্বীপান্বিতা বলেন তাই? আমার খুব পরিচিত পাড়া ওটি "।বয়স্ক মানুষ,ময়লা পোশাক পরা,ঠান্ডার মধ্যে পরণে একটা গরম পোশাক নেই দেখে তিনি যেতে যেতে বলেন "গরম পোশাক আনেন নি কেন?”
উত্তরে প্রহরী বলে "আমি তো বাড়িতে যাই না তাই সঙ্গে নেই মাথা নীচু করে বলে।"
দ্বীপান্বিতা জিজ্ঞাসা করে আপনার নাম কী?
প্রহরী উত্তর দেয় "স্বপন চক্রবর্তী। আপনার বাবার বাড়ির লাইনের শেষের বাড়িটি আমার বাড়ি।আমাকে চিনতে পারছেন না।"
দ্বীপান্বিতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।মুখ থেকে আর কোনো কথা বেরোচ্ছিল না।এই সে ব্যক্তি যাকে সে ছোট্টবেলা খুব ভয় পেতো।সেদিন আর সন্ধ্যাবেলা বেরোলো না।সোজা নিজের ফ্ল্যাটে চলে এলো।চুপচাপ ফ্ল্যাটের ব্যালকোনিতে দাঁড়িয়ে থাকলো।মনে পড়ে যেতে লাগলো তার সে ছোট্ট মেয়েবেলার কথা।ক্লাস থ্রী বা ফোরে পড়ে সকালে স্কুল ছিল । দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরে একটু বইখাতা নিয়ে বসতো কিন্তু তার মন চলে যেতো পাড়ার তারই সময়বয়সী ছেলেমেয়ের সাথে খেলার জন্য।বাড়ি থেকে বাইরে বেরোনো বারণ ছিলো।সুযোগ পেতো তার মা যখন দুপুরে দিবানিদ্রা যেতেন। পেয়ারা গাছ বেয়ে,প্রাচীর টপকে ওদের সাথে খেলায় মেতে যেতো।ধরাও পড়েছে অনেকবার বকুনি,এমন কী মায়ের কাছে মার ও খেতো।কোনো কিছুতেই লাভ হয় নি তখন এই স্বপনকে দেখিয়ে ভয় দেখানো হয়ে ছিলো।সে নাকি অনেক দূরে নিয়ে চলে যাবে।আর কোনোদিনও কাউকে দেখতে পাবে না।তাছাড়া স্বপন খুব চিৎকার করতো।স্বাভাবিকভাবেই আট বছরের দ্বীপান্বিতা সত্যি সত্যি ভয় পেয়েছিল আর দুপুরে পাড়ার বন্ধুদের সাথে খেলতে বেরোতে না।স্বপনকে দেখলেই সে ভয়ে গুটিয়ে যেতো। বড়ো হয়েও সেই ভয়টা থেকেই গিয়েছিলো।কিন্তু স্বপনের বউ মন্দিরার সাথে দ্বিপান্বিতার বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। মন্দিরা সেলাই ভালো জানতো।কাজেই তার অনেক জামা,সালোয়ার কামিজ ও তৈরী করে দিতো।রোজ রাত্রি নয়টার পরেই অনিন্দ্য বাড়িতে আসে।সেদিন আবার বলে সেই প্রহরীকে রাতে কিছু খেতে দিতে। ব্যাস..দ্বিপান্বিতার ভয়ে হাত পা কাঁপতে লাগলো। অনিন্দ্য জিজ্ঞাসা করে কী হয়েছে।তিনি তার কাছে সব শুনে সজোরে হাসতে থাকেন।রাতের খাবার দ্বীপান্বিতা একা দিতে যেতে সাহস পায় না সঙ্গে অনিন্দ্যকে নিয়ে যায়।খাবার পেয়ে খুব খুশি প্রহরী। আবাসনের কয়েকজন আবাসিক ঠিক করে প্রহরীর খাবার প্রতিদিন সবাই মিলে দেবে।দুই সপ্তাহের মধ্যে মন্দিরা বাড়ি ফিরে এসেছে।একটি মাস পূর্ণ হয়ে গেছে।স্বপন আট হাজার টাকা নিয়ে বাড়িতে হাজির হলো।সবাই ওকে দেখে চমকে যায়।মন্দিরার তো স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে।সে স্বপনকে চিনতেও পারলো না।দীর্ঘ বাইশ বছরের বিবাহিত জীবনে এই প্রথম সে তার স্ত্রীর হাতে টাকা তুলে দিলো।কিন্তু নিয়তির এমনই পরিহাস যে মন্দিরা আজ একটা পাথরের সমান।বিছানায় শুয়ে আছে। স্বপন এই অবস্থা দেখে শুধু চোখের জল ফেললো।চলে এলো তার কাজের জায়গা সেই আবাসনে।অনিন্দ্য কোনোভাবে জেনে যায় ওর পারিবারিক অবস্থা। তারপরে সব আবাসিকরা মিলে ঠিক করেন স্বপনকেই চব্বিশ ঘন্টা প্রহরী থাকবে।স্বপনের খাওয়ার দায়িত্ব সকলে মিলেমিশে নিলেন।সকালের টিফিন,আর রাতের খাওয়া দ্বিপান্বিতার কাছে পায়।সকলে মিলে ওকে খুব আপন করে নেয় কিন্তু ওর মনের ভেতরে জমা রয়েছে হিমালয় পর্বতের সমান দুঃখ।এখানে থেকে সে মাসে বাড়িতে আট হাজার টাকা করে দেয় কোনো রকমে সংসারটা চলে যায়।বছর দুয়েকের মধ্যে দুটি মেয়েরই বিয়ে হয়ে যায়।মন্দিরা একাই থাকতো।স্বপন দিনে দেড় ঘন্টার ছুটি পেতো।সেই সময় সে মন্দিরার জন্য সামান্য কিছু রান্না করে দিয়ে আসতো।একদিন হঠাৎ স্বপনের দিদি ঊষা আর ওর জন্মান্ধ ছেলের কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না।তিনদিন পরে জানা যায় রেলগাড়ির ধাক্কায় মা ছেলে দুজনেরই মৃত্যু হয়।ভবঘুরে মা আর জন্মান্ধ ছেলে ট্রেনে ভিক্ষা করে বেড়াতো।স্বপন খবরটি শুনে ভেঙ্গে পড়ে খুব।তবুও এখন ওর বাঁচা শুধু মন্দিরার জন্য।প্রায় ছয় বছর পার হয়ে গেছে।একদিন ওই সাড়ে দশটার পরে বাড়ি গিয়ে রান্না করতে গিয়ে দেখে মন্দিরার দুটো চোখ স্থির হয়ে আছে,হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। আগেরদিনের খাবার ওই রকমই রাখা আছে।কখন যে সে তাকে ছেড়ে চলে গেছে জানে না।এদিকে স্বপনের আবাসনে ফিরতে দেরি হচ্ছে জল নেই একজন আবাসিক অনেক চেষ্টা করে কোনোরকমে জলের ট্যাঙ্কটি ভর্তি করে।দ্বীপান্বিতা স্বপনের বাড়িতে যায়।আগে ও যে রকম দেখেছিলো বাড়িটি এখন আর সেই রকম নেই।চারিদিক ভেঙ্গে পড়েছে।ভেতরে স্যাতস্যাতে অন্ধকার একটি মাত্র ঘর।বিছানায় পরে আছে তার মেয়েবেলার সেই সেলাই করা মন্দিরাদি।আর বেচারী প্রহরী স্বপন চুপচাপ বসে চোখের জল ফেলছে। নিজেকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে চেয়েছিলো ওর ভালোবাসার মানুষটি যেন সুস্থ হয়।দ্বীপান্বিতা ওর বাড়িতে দাঁড়িয়ে অনিন্দ্যকে ফোন করে।দ্বীপান্বিতা সৎকারের টাকা দিলে সেটা নিতে চায় নি।বলেছিলো ”আমি ওর জন্যই তো টাকা রোজগার করে বড়োলোক হতে চেয়েছিলাম।”বলে খুব কাঁদতে লাগলো।তবে ও নিজের পরিশ্রমের টাকা দিয়ে সৎকার সম্পন্ন করে ছিলো।তারপর থেকে ওর ঠাঁই হলো সেই আবাসনে।এখানে ও সবার সাথে থাকে,সকলের কাজকর্ম করে আদেশ বা হুকুম মতো।ছোট বাচ্চারা স্বপন আঙ্কেল বলেই ডাকে।যে দ্বীপান্বিতা ছোটবেলা ভয় করতো এখন সে নিজেই ওর জন্য ভালো কিছু রান্না করলে ঠিক এসে দিয়ে যায়।নববর্ষ,দূর্গাপুজো,শীতের সময় সকলেই ওকে জামাকাপড়,খাওয়াদাওয়া সবই দেয়।তবুও ও মাঝে মধ্যে মন্দিরার ছবিটা দেখে চোখের জল ফেলে।এখন বয়স হয়েছে অনেক।সে কাজ ছাড়তে চাইলেও আবার এই আবাসনের মায়া ছাড়তে পারে না।দৃষ্টি শক্তি ক্ষীণ হয়ে গেছে,চলতেও অসমর্থ।মেয়েদের কাছে থাকবে না।ওই আবাসনে অন্য নতুন দুইজন প্রহরী এসেছে।কিন্তু স্বপনের শেষ ঠিকানা কিন্তু এই আবাসন।এখানেই একটি ছোট্ট ঘরে সে থাকে।অন্য দুই প্রহরীর অভিভাবক হয়ে।সবাই আমরা নিশ্চিতে ঘুমিয়ে পরি রাতে।জেগে থাকে ওই সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ প্রহরীটি।
লেখা পাঠানোর জন্য আহ্বান
👇

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন