সফরনামা | কুহেলী ব্যানার্জী
গল্প......
"সফরনামা"
কুহেলী ব্যানার্জী
বীরভূম,পশ্চিমবঙ্গ,ভারতবর্ষ
ট্রেনের হুইসেলটা বেজে উঠলো। ছাড়ল ঠিক সাড়ে আটটা নাগাদ। পাক্কা কুড়ি মিনিট লেট। ট্রেনে চাপলেই জানলার ধারটা আর্যর চাই –ই। এই নিয়ে মিঠির সাথে প্রতিবারই একবার করে ঝামেলা বাঁধে। আজ অবশ্য সৌভাগ্যবশত সেটা আর হয়ে ওঠে নি। ওপাশের একটা জানলা মিঠি ও পেয়ে গেছে। ও আর মা দুজনে পাশাপাশি বসেছে। ট্রেনটা আজ একটু ফাঁকা ফাঁকাই। বড়দিনের ছুটিতে এবার আর কোথাও যাওয়া হল না। বাড়িতেই কাটাতে হবে। মায়ের স্কুল ছুটি থাকলে কি হবে বাবার অফিসে নাকি অনেক কাজ। ছুটিই পাবে না। গতবার ওরা রাজস্থানে গেছিলো। দারুন জায়গা। সিনেমার পর্দায় দেখা সোনারকেল্লাকে স্বচক্ষে দেখার অনুভূতিটাই ছিল অন্যরকমের। ফেলুদার গল্পে পড়ার পর থেকেই আগ্রহটা বেড়ে গেছিলো যেন দশগুণ ।
আর্য জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল। গাছপালা, ঘরবাড়ি সব যেন সাঁই সাঁই করে ছুটছে। মাঠ ভর্তি পাকা ফসল। সর্ষের খেত এদিকে প্রচুর। মাঠকে মাঠ হলুদ হয়ে আছে। আগে নাকি আখ চাষও হতো আজকাল অনেক কমে গেছে। একটা পাখি উড়ছিল দেখে মনে হচ্ছিলো ট্রেনটার সাথে যেন ওর যেন কোন কম্পিটিশন চলছে। ঠিক যেমন মানুষে মানুষে চলে। তবে পার্থক্য এই যে কখনো তা চোখে পড়ে কখনো আবার চোখের বাইরেই অনেক কিছু রয়ে যায়। শীতের সকালটা বেশ পরিস্কার থাকলেও এখন বাইরেটা কেমন ধোঁয়াটে । কুয়াশার মাঝেই একবার পাখিটা এগোয় যায় তো একবার ট্রেনটা। বেশ মজা লাগছিলো। ঝিক্ঝিক্ ঝিক্ঝিক্ ...ট্রেনটা আপন খেয়ালে ছুটে চলেছে। নিজস্ব ছন্দে। আর সেই ছন্দে যেন সকলেই তাল মিলিয়েছে। কেউ দুলে দুলে পেপার পরছে মন দিয়ে। কেউ আবার দুলুনির মাঝে ঢুলে ঢুলে পড়ছে ।
হঠাৎ এক ভদ্রলোক ধপ্ করে আর্যর সামনের সিটে এসে বসলো । আর্য ভাবল, ট্রেনটা তো অনেকক্ষণ থেকেই চলছে তবে লোকটার আবির্ভাব হোল কোথা থেকে। যাক্ গে। এসব ভেবে লাভ নেই। কে না কে তার ঠিক নেই। স্টেশনে কেনা টিনটিনের বইটা হাতে নিয়ে ও ওটাতেই মনোনিবেশ করলো। মা বলে আর্য নাকি বইয়ের পোকা। তাই প্রতিবার জন্মদিনে ওর একগুচ্ছের বইয়ের প্রাপ্তিযোগ ঘটে। আর বই মেলা তে গেলে তো রক্ষে থাকে না। কোনটা ছেড়ে যে ও কোনটা কিনবে ভেবেই পায় না। মাকে একবার এ স্টল তো অন্য স্টলে নিয়ে যায়। এবার জন্মদিনে ফেলুদার সিরিজ পেয়েছিল। এই তো দুদিন হল শেষ করেছে। ফেলু মিত্তির এখনো যেন ওর মনের মধ্যে ছেয়ে আছে।
চা, চা, গরম চা এ –এ -- হকার রা হেঁকে যায়। মাঝে খটাস খটাস করে আওয়াজ ওঠে -পালিশ, পালিশ। বাদামওয়ালা, চানাওয়ালা, ঘটিগরম আরও কতরকমের হকারের আবির্ভাব হয়। তাদের বলার স্টাইলও ভিন্ন ভিন্ন। সব মিলিয়ে বেশ একটা উপভোগ্য ব্যাপার ....অন্তত আর্যর কাছে তো বটেই। ট্রেনের এই জার্নির এক অদ্ভুত মাদকতা আছে। ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করে যে কাকুগুলো তারা তাস খেলতে বসেছে। মাঝে মাঝে সেখান থেকে নানারকম আওয়াজ ভেসে আসছে।
আজ স্টেশনে ওরা বেশ খানিকটা আগেই পৌঁছেছিলো। এবার ওরা তিনজনেই শুধু বাড়ি যাচ্ছে। বাবা দুদিন পর আসবে। এখনো মনে আছে প্রথম প্রথম যখন বাবার কাজের জায়গায় ওরা আসে তখন ওর একদম ভালো লাগতো না। মা ও খুব কান্নাকাটি করতো। স্কুলে তো ওর কেও বন্ধুই হতে চাইত না। কতদিন ক্লাসের পর চুপচাপ বসে থাকতো। একা একা। এখন অবশ্য ওর অনেক বন্ধু। টিফিনের পর জমিয়ে খেলা হয়। খেলার চোটে দিনের শেষে স্কুল ড্রেসটার রঙটাও বদলে যায়।
কমিকসের বইটা ও একমনে পড়ছিল। আদর্শ কাকু ওর চুলটা ঘেঁটে দিয়ে পরের স্টেশনে নেমে গেলো। ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করা এই কাকুটাকে বাবা এর আগে অর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। কাকুটা খুব সুন্দর গান গায়। আর্য হঠাৎ খেয়াল করলো সামনের ভদ্রলোক ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখ পড়তেই একটু হাসলেন। ও বিশেষ আমল দিল না । ভাল করেই জানে যে অপরিচিত কারো সাথে ঝট্ করে কথা বলা উচিত নয়। আজকাল ট্রেনে কত দুর্ঘটনা ঘটে।আর্য একটু দূরত্বে থাকার চেষ্টা করল। তোমাকে অনেকটা হ্যারি পটারের মতো লাগে, চশমাটাও ঠিক সে রকমই – বলে উঠলেন। আর্য একটু লজ্জা পেয়ে গেল। তবু সেটা যাতে প্রকাশ না হয় তায় গম্ভীর হয়ে রইলো। ও যেখানে মাউথঅরগ্যান বাজানো শেখে সেখানেও সব দাদা দিদিরা ওকে পটার বলে ডাকে। এমন কি স্কুলের স্যাররাও ওই নামে ডাকেন।
সামনের ভদ্রলোক মানে কাকুটা পাশে বসা এক দাদুর সাথে গল্প করছেন। আর্য এবার আর খেয়াল না করে পারলো না ( অবশ্য এর যথেষ্ট কারণও রয়েছে )। কাকুটা দেখতে একটু বেঁটেখাটো, মাথার চুল পাতলা, ফরসা। পরনে হাল্কা আকাশী চেক শার্ট প্যান্ট। ওঠার পর থেকেই কোলের কাছে একটি ব্যাগ যত্নে আঁকড়ে রয়েছেন। মাঝে মাঝেই ভেতরটা চেক করছেন। নিশ্চয় মূল্যবান কিছু রয়েছে। আর্যর কেমন যেন সন্দেহ হল। আচরণটা যেন অন্যরকম। থেকে থেকেই মা আর বোনকে খেয়াল করছে। ব্যাপারটা ওর ভালো ঠেকল না। আজকাল ফেলুদার রহস্য উপন্যাস পড়ে ওর কেমন জানি অনেক কিছুই নজরে পড়ে। মগজটাও যেন অনেক ধারালো হয়ে উঠেছে। এই যেমন ভদ্রলোক এত ফিটফাট অথচ জুতো জোড়া বড়ই মলিন। যে কোন সময় ছিঁড়ে যেতে পারে । রিষ্ট ওয়াচটাও টাইটানের বহু পুরনো কোন মডেল। জুতো এবং ঘড়ি দুটোর কোনটাই ওনার সাথে যেন মানানসই নয়।
ঝালমুড়ি আর ডিম সিদ্ধ খেয়ে চোখটা সবে একটু লেগেছে হঠাৎ হাসির আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে গেলো। তাকিয়ে দেখে কাকুটা বোনের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলেছে। নানারকম অঙ্গভঙ্গি করছে আর মজার মজার কথা বলছে সেই শুনে বোন খিলখিল করে হেসে উঠছে। মা ও হাসছে। আর্য মা কে সাবধান করার চেষ্টা করলো। যতই হোক বাবা সঙ্গে নেই একটু সাবধান তো থাকতেই হয়। কিন্তু মায়ের কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই। আর্যর রাগ হয়। ব্যাগ নিয়ে বারবার এই সচেতনতাটা সত্যিই তো অস্বাভাবিক। দাদুটা না হয় ঘুমচ্ছে কিন্তু মায়ের নজরে কেন আসছে না। অবাক লাগছে। ব্যাগে আবার বোম – টোম নেই তো। ব্যাপারটা বেশ গম্ভীর। কিছু একটা করতেই হয়। এ সময় বাবাকে ও খুব মিস করে। ফোন করার চেষ্টা করে কিন্তু সিগন্যাল পায় না। কাকুটা একটা চকলেট বাড়িয়ে দিয়েছে ওর দিকে। ভয়ে ওর মুখটা শুকিয়ে গেলো। ভেবে পেলো না কি করবে। উঠে বাথরুমের দিকে চলে গেল। বেশিক্ষণ আবার বাথরুমের কাছে থাকা যাবে না,নইলে মা আবার চিন্তা করবে। ট্রেনটার স্টপেজ কম। তিন চারটে স্টপেজ পর ওরা নেমে যাবে। ফিরে এসে মায়ের কোল ঘেঁষে ও চুপ করে বসে রইলো। এক বাউল গান ধরেছে।
‘’ আমি অপার হয়ে বসে আছি
ওহে দয়াময়,
পারে লয়ে যাও আমায়। ‘’
ট্রেনের সুরের সাথে অদ্ভুত ভাবে মিশে যায় গানটা। ট্রেনেই বোধহয় সবচেয়ে ভালো লাগে। কি সুন্দর দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তোলে কাকুটা। একতারা হাতে একের পর এক কতো গান গেয়ে যায়। কতজন গানের জন্য অনুরোধ জানায়। আর্য গানের কথা গুলো বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু সুরগুলো ওর মনকে বড় টানে। ট্রেনের অধিকাংশ যাত্রীরাই একমনে শুনতে থাকে । সময় কিভাবে পেরিয়ে যায় বোঝায় যায় না।
ওদের স্টেশন চলে এসছে। ব্যাগ পত্র গুছিয়ে নিয়ে নেমে পড়লো। উঃ কি শান্তি। বাঁচা গেছে। শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক পৌঁছানো গেলো। বাড়ি ফিরে সব শুনে মা বলল - দূর বুদ্ধ উনি ওনার মেয়ের জন্য ব্যাগের মধ্যে মোয়া নিয়ে যাচ্ছিলেন। সে নাকি খুব ভালবাসে। গতবার সব ভেঙে যাওয়ায় একটুও খায়নি। মেয়ে বড় অভিমানী । ছোট আর আদরের ও। তাই এবার খুব সাবধানে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তোর এত কি করে নজরে পড়লো রে? ব্যাপারটা কি? ওরে আমার ফেলু মিত্তিরের চেলা রে । সারা ট্রেন বুঝি মগজাস্ত্রের কারবারি চলছিলো ? ওর মাথায় ছোট্ট একটা টোকা মেরে তারপর হো হো করে হেসে উঠলো।
লেখা পাঠানোর জন্য আহ্বান
👇

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন