বাড়ি থেকে পালিয়ে | গৌতম নায়েক

গল্প......

"বাড়ি থেকে পালিয়ে"
গৌতম নায়েক

সেই যে মাথা নামিয়ে বসেছে আর মাথা তুলছে না ছোটন।

বাবা বললেন, 'কেমন গোঁয়ার দেখেছো! একটা কথা বলছে? ওকে ধরে মারাই উচিত। ওর হিমেত ( হিম্মত ) ঘুঁচে যাবে।'

মা বললেন, 'এত মাথা গরম করো না তো। ছেলে বড় হয়েছে তো। এখন মারধর করা কি ঠিক? তাছাড়া কি হয়েছে আগে জানতে তো দাও।'

----- কি হয়েছে বললে তবে তো।


মা, ঠাকমা, বড়মা, বাবা, জ্যেঠু, দাদারা তার সাথে জমায়েত হয়েছেন বেশ কিছু পাড়া প্রতিবেশী। 
ঝাঁকে ঝাঁকে প্রশ্ন উড়ে আসছে ছোটনের দিকে,  'কি হয়েছিল? কোথায় গিয়েছিলিস? কোথায় ছিলিস সারাদিন? আর কে ছিল তোর সাথে? খাওয়া দাওয়া করেছিস? ইত্যাদি ইত্যাদি!' কিন্তু ছোটন একেবারে স্পিক টি নট। 

ছোটন অনেকটা বাড়ির চাপে পড়েই এবারে বি.এ ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে সাঁইথিয়া কলেজে। কিন্তু ওর পড়াশুনায় মতি বরাবরই ছিল না। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পরেই ওর মাথায় কোন বন্ধুর কৃপায় ঢুকে গেছে হিউজ টাকা পয়সা না থাকলে পড়াশুনা করে কোন লাভ নেই। কেননা, চাকরি করতে হলে অলিখিত অর্থনৈতিক যোগ্যতাও থাকা দরকার। তাই সে আর লেখাপড়া না করে বরং কাজের সন্ধান করবে। কারণ, তার বাবার চাকরি করে দেওয়ার মতো পায়া  জোড় আর টাকা কোনটাই নেই। কিন্তু তার বাবা তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, ' তোমাকে এত ভাবতে হবে না সংসার নিয়ে, তুমি পড়াশুনাটা চালিয়ে যাও। যতদূর পড়তে চাইবে আমি যত কষ্টই হোক তোমার খরচ ঠিক জোগাড় করবো। আমি সুযোগের অভাবে পড়তে পারিনি। তোমাকে সুযোগ দিচ্ছি, তুমি পড়ো।' আর কি - ই বা বলার থাকতে পারে ছোটনের।

ছোটন আজ সকালেই একটি খাতা হাতে আর পকেটে পেন গুঁজে বেরিয়ে ছিল টিউশন পড়ার নাম করে। কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় গড়িয়ে গেলেও আর বাড়ি ফেরেনি। যেখানে সকাল দশটা এগারোটার মধ্যে বাড়ি ফেরে সেখানে দুপুর গড়িয়ে গেল। দুশ্চিন্তায় বাড়ির লোকের দুপুরের খাওয়া দাওয়া পর্যন্ত হয়নি। বাড়িতে কান্নার রোল। টেলিফোনের ব্যবস্থা তখন একেবারেই ছিল না, না ছিল ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা। বাড়ির পুরুষেরা সাইকেল নিয়ে যে যেদিকে পারলো বেরিয়ে গেল খবর নিতে। সকল আত্মীয় বাড়িতে, বন্ধুদের বাড়িতে, স্যারের বাড়িতে খবর নিয়ে সন্ধ্যার দিকে সকলে মুখ কালো করে ফিরে এলো। ছোটনের কোন খবর নেই। সে বেপাত্তা।

সেই ছোটন রাত্রি দশটা নাগাদ চোখ মুখ শুকিয়ে উস্কখুস্ক চুলে সকলকে অবাক করে দিয়ে বাড়ি ঢোকে। ছোটনকে দেখা মাত্র বাড়ির থমথমে পরিবেশ ভেঙে ছোটনের মা তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে ছোটন সেই যে মুখ বন্ধ করে ঢুকেছে আর মুখ খোলেনি। 

তার কাছ থেকে কোন তথ্য না পেয়ে সকলে হতাশ হয়ে তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া সেরে নিয়ে যে যার ঘরে কিছুটা হলেও শান্তিতে শুতে গেলে ছোটনের ঠাকমা তার পিছু পিছু গেল তার ঘরে। ঠাকমাকে একা পেয়ে ছোটন তাকে বলে, 'আমার বন্ধুর এক দাদা কলকাতায় একটা কোম্পানিতে কাজ করে। সেই দাদা বলেছিল একটা কাজ জোগাড় করে দেবে কলকাতা গেলে। দাদা গড়িয়ার একটা ঠিকানায় যেতে বলেছিল আজকে। তাই আমি কলকাতা গিয়েছিলাম।

----- তারপর কি হলো?

----- ইন্টারসিটি ট্রেনটা হাওড়ায় ঢুকলো, সবাই ট্রেন থেকে নামছে দেখে আমিও নামতে যাচ্ছি, কিন্তু গেট থেকে লোক দেখে আর নামিনি।

----- তার মানে?

----- আর বোল না ঠাকমা সে কি দেখলাম!

----- কি দেখলি?

----- ঠাকমা গো, এত লোক আমি জীবনেও দেখিনি। যেদিকে তাকাচ্ছি সেদিকেই দেখি লোক। মাটি দেখা যাচ্ছে না, শুধুই নীচের দিকে মানুষের পা আর উপরের দিকে মানুষের মাথা!

----- তখন কি করলি, ভাই?

----- আমি আর প্লাটফর্মে পা - ই রাখিনি। আবার ঘুরে গিয়ে ট্রেনের সিটে বসে পড়লাম। কারন, জানতাম এই ট্রেন টাই আবার ঘুরে যাবে সাঁইথিয়া। কিছু পরে ট্রেনটা সেডে চলে গেল। দুটো আড়াইটার দিকে আবার সেটা স্টেশনে ফিরে এলো তারপর সাড়ে তিনটের সময় ছাড়ল।

----- তাহলে খাওয়া দাওয়া কি করেছো?

----- কি আর খাবো? জল পর্যন্ত খায়নি। পরে ট্রেনে ঝালমুড়ি উঠেছিল, ঝালমুড়ি আর চা খেয়েছি একবার। ক্ষিধা আর পিপাসা যা পেয়েছিল গো! সাঁইথিয়াতে নেমে স্টেশনে জল খেলাম। কাউকে না বলে চাকরি করতে যাওয়ার নেশা আমার কেটে গেছে ঠাকমা। আর বাড়ি থেকে কখনও বেরবো না।

ছোটনের কথা শুনে ঠাকমা হেসে উঠলেন।
বাড়ি থেকে পালিয়ে | গৌতম নায়েক

লেখা পাঠানোর জন্য আহ্বান 
👇

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

১৬ মে ২০২২

এক মুঠো পয়সা | প্রত্যুষ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়