আমার  অ্যালোভেরা | রুচিরা সাহা

গল্প......

"আমার  অ্যালোভেরা"
রুচিরা সাহা 
কান্নবর্তী পরিবারে সাংসারিক গোলযোগের কারণে হঠাৎই একদিন শ্বশুর ভিটে ছেড়ে উনিশ দিন হোটেলে থেকে তারপর বাড়ি ভাড়া খুঁজে পেয়ে ছিলাম। একটি সুন্দর বাড়ির সম্পূর্ণ দোতলাটা।নতুন পরিবেশে অনেক খুঁজে পেলাম শঙ্করী নামে এক মহিলাকে। ছোটখাটো গড়ন, শ্যামলা রঙ, বাংলা করে শাড়ি পড়তো, মাথা ভর্তি লম্বা কেশ ছিলো। খুব সরল ও নির্লভী প্রায় সাড়ে চার মাইল পায়ে হেঁটে আসতো। ভোরের আজান পড়তো তখন ও বাড়ি থেকে বেরোতো। হেঁটে আসতে প্রায় দেড় ঘন্টা লেগে যেতো।ছয় বাড়িতে কাজ করতো নিতান্তই পেটের দায়ে।সবার প্রথমেই আমার বাড়িতে আসতো। মহানন্দা নদীর পাড়ে ছিলো ওর বাড়ি। কাজ করতে আসতো ওর বাবার বাড়ির পাড়াতে। যেটা ছিল ওর ছোটবেলা থেকে বড়ো হয়ে ওঠা। ওর বাবার বাড়িতে দূর্গা পুজো হতো। শঙ্করীদির বাবা নিজে হাতে প্রতিমা তৈরি করে পুজো করতেন। এখনো সেই পুজো হয়ে থাকে তবে খুব জাঁকজমক করে না হলেও সাধ্যমতো করা হয়। শঙ্করীদির বাড়িটি ছিলো সম্পূর্ণ টিন দিয়ে তৈরি। গরমের দিনে ছিচল্লিশ ডিগ্রী তাপমাত্রায় সেটা যে কী পরিমানে গরম হতে পারে যিনি থাকেন তিনিই বোঝেন তার কষ্ট। বয়সে আমার থেকে অনেকটাই বড়ো ছিলো, কিন্তু খুব ভালোবাসতো আমাকে। একটানা প্রায় আট বছরের বেশি কাজ করেছিলো আমার কাছে। আমার পুজোর ফুল এনে দিতো, মুদিখানা দোকানের জিনিসও এনে দিতো। জামাকাপড় কাচা, বাসন মাজা ছিলো খুবই পরিষ্কার। আজও ওর কাজের জুড়ি মেলা ভার। কাঁচা আম বেঁটে মাথায় দিলে নাকি রোদ্দুর লেগে অসুস্থ হয় না।  জানিনা এটা সত্যি কিনা। তবে ও গরমের দিনে দুপুরবেলা কাঁচা আম বেঁটে মাথায় দিয়ে আর একটা গামছা দিয়ে মাথা ঢেকে আসতো কাজ করতে  তিনটের সময়।কারণ ওকে তো সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। বর্ষার সময় বৃষ্টিতে কাক ভেজার মতো হয়ে আসতো।বাড়িতে ওর আলো ছিলো না। কুপি জ্বালিয়েই চালাতো। অক্লান্ত পরিশ্রম করে সেই টিনের বাড়িটি ইট দিয়ে গেঁথে পাকা  বাড়ি তৈরী করে। বৈদ্যুতিক আলো নেয়। শঙ্করীদির স্বামী আন্তররাজ্জিক শ্রমিক ছিলো। সেইবার পুজোর বেশ কয়েকদিন আগে এসেছিলো। দূর্গা পুজোর চতুর্থীর দিন বিকালের দিকে ওর স্বামীর স্ট্রোক করে। সে তখন অন্য একবাড়িতে কাজ করছিলো। শঙ্করীদির মেয়ে মাধুরী আমাকে ফোন করে সব কথা বলে। আমি শোনামাত্রই ওর খোঁজে বেরোই। দেখা পাই তখন ডেকে বলি "তুমি বাড়ি যাও মাধুরী তোমাকে ডাকছে।"উত্তরে সে বলে "আর একটা বাড়ি বাকী আছে করেই চলে যাবো।"জোড় করেই একটা রিক্সাতে তুলে দিয়ে বাড়িতে পাঠাই। ততক্ষনে ওর স্বামীকে হাসপাতালে নিয়ে চলে গিয়েছে। পরেরদিন দুপুরে ওর স্বামীর মৃত্যু হয়। আমি বিকালবেলা জানতে পারি তার স্বামী মারা গিয়েছেন। আমি দুই মাসের ছুটি দিয়েছিলাম ওকে। শঙ্করীদি তার স্বামীর শ্রদ্ধানুষ্ঠানে আমাকে যাওয়ার অনুরোধ করতে এসেছিলো। পরণে সাদা থান কাপড়, উস্কখুস্ক কেশ, খালি পা, শুকনো করুন মুখখানি দেখে বড়োই কষ্ট হয়েছিল। আমি একটা শাড়ি আর বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলাম।ওর স্বামীর মৃত্যুর ছয় মাসের মধ্যেই ওর মেয়ে মাধুরীর হঠাৎ বিয়ে ঠিক করে ফেলে কোনো খোঁজ খবর না নিয়ে। বিয়ের দিন আমি গিয়েছিলাম। পাত্রের সঙ্গে কথা বলছিলাম। সে কী কাজ করে, বাড়িতে কে কে আছেন? উত্তর শুনতে শুনতেই পাত্র পক্ষের একজন বলে ওঠে "আরে অর তু এর আগে দুইট্যা বিয়া কৈৱ্যা ছিলো, দুজোনাই পলাইয়া গ্যেছে।"আমি বলে উঠলাম "মানে?"লোকটি বলল "হাঁ অই তু আগে দুইট্যা বিয়া করি ছিলো, বউ চলি গেছে তাই আবার বিয়া করিবো, এই আর কী।"বলে হাত দুটো কচলে মাথা বাঁকিয়ে হাসছিলো। রাগে আমার গা জ্বলে গেলো। ডাকলাম "শঙ্করীদি তোমার মাথাটা কী একেবারেই খারাপ হয়ে গেছে এইরকম একটা ছেলের সাথে বিয়ে দিচ্ছো যে এর আগে দুটো বিয়ে করেছে। কোনো খোঁজ খবর কিছুই নেওনি কেন?বন্ধ করে দাও এই বিয়েটা। "ফ্যালফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল "ভেবেছিলাম মেয়েটার বিয়ে দিলেই বোধহয় ওর মুক্তি হবে। "হঠাৎ মাথা ঘুরে পরে গিয়েছিলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলে "না দিদি মেয়েকে একবার কনের সাজে সাজিয়ে দিয়েছি ও যে লগ্ন ভ্রষ্টা হবে গো দিদি, পাড়ার লোকে কী বলবে? আমি বাইচবো কী কৈৱ্যা।তুমি বাধা দিওনা। "বলে আমার হাত দুটো ধরে খুব কাঁদতে লাগলো।কিছুই করতে পারলাম না। বিয়ে হলো ওই রাতেই তারা নতুন বউকে নিয়ে চলে গেলো। অষ্টমমঙ্গলার পর মাধুরী আর শ্বশুরবাড়িতে যেতে চাইছিলো না। কিন্তু অনেক বুঝিয়ে ওকে পাঠানো হয়।একদিন হঠাৎ জ্বর হয় মাধুরীর। শ্বশুর বাড়ির লোকেরা ওকে বাসে উঠিয়ে দেয় একা একাই চলে আসে তার মায়ের কাছে। তার শ্বশুর বাড়িতে চিকিৎসা করাবে না কেউই। সারাদিন শুধুই পরিশ্রম করতে হবে বিশ্রাম বলে কোনো শব্দ সেখানে নেই। এর পর মাধুরী আর কোনোদিনও শ্বশুর বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবে নি। একটা পার্লারে কাজ করতে শুরু করে। মা মেয়ের কঠোর পরিশ্রমে সংসারটা চলতে থাকে। শঙ্করীদির ছেলে বিয়ে করে আলাদা থাকে। এবার কিছুদিনের মধ্যেই আমি আমার বহু শখের বাড়ি তৈরী করলাম।ও শুনে খুবই খুশি হয়েছিল।আবার কিছক্ষন পরে করুন মুখ করে বলে "আর কিছুদিন পরে তুমিও চলে যাবা দিদি।"আমি বলে ছিলাম "হ্যাঁ গো।তবে নতুন বাড়িতে তোমাকেও নিয়ে যাবো, নইলে আমি তো একা একা সব পারবোনা।"ও বলল "না দিদি আমার যাওয়াটা হবে না, মেয়েটা আছে তো।"নতুন বাড়িতে যাওয়ার জন্য আমি সব জিনিস গুছিয়ে নিচ্ছি ও আমার হাতে হাতে সব গুছিয়ে দিয়ে ছিলো। কোথা থেকে একগুচ্ছ      অ্যালোভেরা গাছ নিয়ে এসে আমাকে দিয়ে বলেছিলো "দিদি তোমার নতুন বাড়িখানাতে লাগিও।"আমি গাছ ভালোবাসি, খুব আনন্দেই সেটা গ্রহণ করেছিলাম।আমাকে নতুন বাড়িতে ঢোকার জন্য কতো সব নিয়ম কানুন বলে দিয়েছিলো। সক্কাল সক্কাল সূর্য ওঠার আগে পেতলের কলসীতে জল ভরে, মাথায় ঘোমটা দিয়ে, কোন পা আগে, কোন পা পরে। ভোর সাড়ে চারটার সময় বেরোবো। কিন্তু পৌনে চারটার সময় হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠলো। খুললাম। অবাক হয়ে তাকিয়ে বললাম "সে কী তুমি?"বলে  হ্যাঁ গো ঘরধোর গুলো মুছে দেই,বাসি ঘরে বেরোবা নাকি গো দিদি?"সেই চারটার সব ঘরবারান্দা মুছে দিয়ে চলে গেলো।যাবার সময় বলে "সাবধানে যেও দিদি "। মুসলধারে বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন আমি দোতলার বারান্দা থেকে তাকিয়ে থাকলাম। গাড়ি এলো যথা সময়ে ঠিক সাড়ে চারটার আগেই বেরিয়ে পড়লাম। অবশেষে আমার বহু কাঙ্খিত নতুন বাড়িতে এসে পৌছালাম। কিন্তু কেন জানিনা সেইদিন সারা রাস্তা শঙ্করীদির জন্য কেঁদে ফেলেছিলাম।এর মধ্যে চারটি বছর কেটে গেছে।অ্যালোভেরা গাছগুলোতে জল দেই অন্যান গাছের সাথে সাথে। বেশ বড়ো হয়ে গেছে গাছ গুলো। পুরোনো পাড়ার লোকেদের সাথে আমার এখনো বেশ ভালো যোগাযোগ রয়েছে। সেখানে একদিন কথা হতে হতে শুনলাম শঙ্করীদি মারা গেছে কয়েকদিন হলো।বিদ্যুতের শক খাওয়ার মতো শরীরটা ঝিঁ ঝিঁ করতে লাগলো আমার সমস্ত শরীর।খুব মন খারাপ নিয়ে বাড়িতে এলাম।ওই অ্যালোভেরা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। মানুষটি নেই আছে ওই গাছ গুলো। চিরকাল সরল সোজা নিরুপায় মুখটির স্মৃতি আমার  অ্যালোভেরা গাছগুলোর মধ্যেই রয়ে যাবে, আমার সেই শঙ্করীদি।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

১৬ মে ২০২২

এক মুঠো পয়সা | প্রত্যুষ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়