সিন্ধু বারোঁয়া | শ্যামাপ্রসাদ সরকার
গল্প......
"সিন্ধু বারোঁয়া"
শ্যামাপ্রসাদ সরকার
লেক টাউন,কলকাতা,পশ্চিমবঙ্গ,ভারতবর্ষ
একটি সতেজ মধ্যমাকৃতি ঈষৎ শ্যাম বর্ণের এক সুদর্শন যুবক তার অতিসপ্রিয় মহিষ চন্ডের পিঠে চেপে শরবনের মধ্যে তাকে তার খাদ্যের সন্ধানে নিয়ে চলল। ইদানীং বৃষ্টি কম হওয়ায় নদীর তীরের হাল্কা ঘাসজমিগুলি হরিদ্রাভ হয়ে আছে। চন্ড তার খাদ্যের বিষয়ে খুব খুঁতখুঁতে। কচি সবুজ টাটকা শষ্পলতা ছাড়া তার আহারে রুচি থাকেনা। চন্ডের পিঠে উপবিষ্ট যুবকটির নাম 'শরভ'। সিন্ধুনদের দক্ষিণপ্রবাহে একটি জনপদ আছে তার নাম 'নাহাল'। সে সেখানেই থাকে। তার একটি কুমোরের চালা আছে। সেখানে সে বিভিন্ন আকারের মাটীর পাত্র আর পোড়ামাটির খেলনা ও গহনা তৈরী করে বিক্রি করে। তার বাপ -মা কেউ নেই। একজন কুম্ভকার তাকে শরবনের ভিতর থেকে উদ্ধার করে প্রতিপালন করেছিল। যদিও এখানে কুম্ভকার বা বাস্তুশিল্পীর সেইভাবে পার্থক্য নেই। সবাই মোটামুটি সব কাজটাই করে চালিয়ে নিতে পারে।
সেদিন এরকমই একজন মানুষ ক্রৌঞ্চশিকার করতে শরবনে গিয়ে মাতৃপরিত্যক্ত অবস্থায় অসহায় ওই সদ্যোজাত শিশুটিকে দেখে নিজের কোলে আশ্রয় না দিলে সে অচিরাৎ বন্য বরাহের খাদ্যে পরিণত হত। শরবনের ভিতর থেকে ওকে পাওয়ার জন্যই ওর নাম শরভ।
শরভের পালকপিতাটি সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছে। তাই উত্তরাধিকারসূত্রে সে এই কুম্ভকারের চাকাটি আর চন্ড নামের মহিষটিকে সে লাভ করেছে। জনপদের বাকী প্রতিবেশীরাও তাকে বেশ স্নেহ করে। বিশেষতঃ এখানকার গোষ্ঠীপতি আহ্নিকের কিশোরী কন্যা চিহ্নিকা তার বাঁশির সুর শুনতে খুব ভালবাসে। চন্ডের পিঠে চেপে তারা প্রায়ই শরবনের ভিতর বাঁশী বাজাতে বাজাতে চলে যায়। চিহ্নিকা তখন আবিষ্ট হয়ে একদৃষ্টে শরভের দিকে চেয়ে থাকে। মনে হয় শরভ যেন বাঁশী বাজিয়ে তাকে পাথর করে রেখেছে।
নাহালের কাছে আরও একটি জনবহুল বড় নগরী আছে। ওরা তাকে বলে 'হরপ্পা'। ওখানে আজকাল দেশবিদেশ থেকে অনেক বণিক আসে। পোড়ামাটির পাত্র আর গহনার পরিবর্তে তারা ঝলমলে নরম পোষাক আর দামী রত্ন দিয়ে যায়। আবার অনেকসময় গমের বদলে বলদ বা মহিষও বিনিময় হয়ে থাকে। শরভের ইচ্ছা তার ব্যবসাটিকে এখান থেকে সরিয়ে হরপ্পায় নিয়ে যাওয়ার। সিন্ধুর এই অংশে অনাবৃষ্টি হয়না। তাই ফসলেরও অপর্যাপ্ত ফলন হয়। কিন্তু তার এই পরিকল্পনার কথা শুনলেই চিহ্নিকার চোখ থেকে জলের ধারা নামে। শরভও তখন নিজেও আর্দ্র হয়ে ওঠে। তাই ইচ্ছা থাকলেও তার আর হরপ্পায় যাওয়া আর হয়ে ওঠে না।
******************
সিন্ধুনদের পশ্চিমপ্রান্তের বোলান গিরিপথের অপর প্রান্ত থেকে এই সুউচ্চ বিপদসংকুল গিরিমালা পার করে একদল অশ্বারোহী সিন্ধুতীরবর্তী জনপদগুলিতে এসে প্রায়ই হামলা চালায়। এখানকার বেশ কিছু অঞ্চল এরা ইতিমধ্যেই বলপ্রয়োগে নিজেদের অধিকারে এনে পল্লী নির্মাণ করে আজকাল বসবাস করতে শুরু করেছে । এদের দেহ দীর্ঘকায়, সুগৌর ও পেশীবহুল আর স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে তাদের মাথায় লম্বা গৈরিক কেশগুচ্ছকে জটার মতো চুড়ো করে বেঁধে রাখে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল এদের চোখের মণির রঙ বিড়ালের চোখের মত হয় তাম্রাভ নয় নীলাভ। সিন্ধু অঞ্চলে বহিরাগত হয়ে এসে নিজেদেরকে বাহুবলে প্রতিষ্ঠা করলেও এরা গৃহনির্মাণে অতটা পটু নয়। এরা স্থানীয় অধিবাসীদের মতো পোড়ামাটির ইঁটের ব্যবহার সম্পর্কে অজ্ঞ।
মাটি, বাঁশ আর খড়ের ছাউনির কুটির নির্মাণ করেই এই জনজাতি বাস করে। তবে এদের অস্ত্রগুলিও ভারী চমকপ্রদ ও অদ্ভূত। 'অয়স্' নামের এক প্রকার শক্তপোক্ত ধাতু দিয়ে তারা বিশালকায় ভল্ল, খড়্গ, পট্টীশ, কুঠার প্রভৃতি বানিয়ে সেসব অস্ত্র হাতে নিয়েই ঘোরাফেরা করে। তারসঙ্গে অবশ্য ধনুর্বাণের ব্যবহারেও এরা বেশ পারদর্শী।
শান্তিপ্রিয় সিন্ধুবাসীরা যেমন এদের এড়িয়ে চলতে ভালবাসে এরাও একটা অনাবশ্যক ছ্যুঁৎমার্গীতা দেখিয়ে ওদেরকেও অবজ্ঞা করে। বাহুবলের সঙ্গে তাদের সুগৌর গাত্রবর্ণ ও পেশীসৌন্দর্য্যই এই বৈষম্যবোধের কারণ বলেই মনে করা যায়।
*************
শরভ একদিন নদীতে স্নানের সময় হঠাৎ দেখতে পেল বিশাল পোড়া কাঠের মত একটি কুমীর একটু দূরে একাকী স্নানরতা এক শ্বেতাঙ্গী মেয়ের দিকে ধীরে সাঁতার কেটে এগোচ্ছে। সে আর দেরী না করে দ্রুত ডুব সাঁতার দিয়ে মেয়েটির কাছে পৌঁছাল। সময়মত দেখতে না পেলে মেয়েটিকে কুমীরের খাদ্য হতে বেশীক্ষণ সময় লাগত না। আসলে কুমীরটিকে আসতে দেখে মেয়েটি ভয়ে নিশ্চল হয়ে গেছিল। শরভ তাকে পিঠে তুলে নিয়ে নদীর অপরপ্রান্তে সাঁতরে না উঠলে একটা দূর্ঘটনা ঘটতে পারত। বালুময় চরে পৌঁছে অনেকক্ষণ পরে মেয়েটি বিপদের হাত থেকে বেঁচে যাবার পর টের পেল যে সে এতক্ষণ বসনহীনা হয়ে আছে।অপরদিকে সম্পূর্ণ উন্মুক্তদেহে শরভের কটিবস্ত্রটিও সম্পূর্ণ সিক্ত। দুজন দুজনের দিকে কিছুক্ষণ বিহ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল তারপর চকিত বিদ্যূত শিখার মতো একদৌড়ে মেয়েটি শরবনের ভিতরে পালিয়ে গেল। সে এখন সদ্যযুবতী। একজন পুষ্ট পুরুষের পেশীবহুল স্পর্শ তাকে প্রকৃতিগত কারণেই এখন চঞ্চলা করে তুলেছে।
*************
বহিরাগত গোষ্ঠীদের নিজেদের মধ্যে 'আরিয়ো' বলে একে অপরকে সম্বোধন করে। এদের গোষ্ঠীপতির নাম 'মিত্রবাহু'। এরই কন্যা 'মিত্রাণী'কে শরভ সেদিন কুমীরের হাত থেকে রক্ষা করেছে। আর সাতটি সৌরদিবসের পর সে নিজের জীবনসাথী নির্বাচন করার অধিকার পাবে। মল্লবীর বৃকোদরের খুব ইচ্ছা যে সে ই মিত্রাণীকে লাভ করে। মিত্রাণী খুব সুন্দরী। তার মার্জারিনীর মত কটিদেশ তাকে নিয়ত প্রমত্ত করে তোলে। 'আরিয়ো'দের মধ্যে ইচ্ছামত সঙ্গী ও সঙ্গিনী নির্বাচনের অধিকার আছে। ওদের লোকাচারে কেবল মাতা, ভগিনী ও কন্যাগমন হল একমাত্র শাস্তিযোগ্য অপরাধ আর শাস্তিটি হল মৃত্যুদন্ড। এছাড়া যে কোন নারী বা পুরুষ প্রীতির সাথেই পরস্পরের আসঙ্গ কামনা করতে পারে এমনকি অপরিচিতের প্রতি বলপূর্বক রমণ করলেও তা দোষের বলে বিবেচিত হয়না। বৃকোদর ঠিক করেছে মিত্রাণী তাকে নির্বাচন না করলে সে একদিন শরবনের ভিতরে নিয়ে গিয়ে তার আসঙ্গকামনা করবে। এমনকি এজন্য বলপ্রয়োগেও সে পিছপা হবে না।
***************
সেদিনের ঘটনাটি শরভের মনে দীর্ঘ আলোড়ন তুলেছে। ওই সদ্যস্নাতা গৌরী কন্যাটিকে সে চাইলেও ভুলতে পারছে না। তার উন্মনা মনের বিকলন টের পেয়ে তার অতিপ্রিয় চিহ্নিকাও তাকে কটূবাক্য শুনিয়ে অভিমান করেছে। সেও আর ওর কাছে বাঁশী শুনতে আসে না। তীব্র একাকিত্বের প্রকোপে শরভের এখন বেশীর ভাগ রাত্রিই বিনিদ্র কাটে।
কদিন ধরে খুব তাপপ্রবাহে পানীয়জলের বড় অভাব দেখা দিয়েছে। নগরীর কূপগুলি প্রায় শুষ্ক। সবাই শ্রমসাধ্য হলেও মৃৎপাত্রে ঘাড়ে করে নদীবক্ষ থেকে জল এনেই পান করছে। সিন্ধু নদের জল সুমিষ্ট। তবে নদীর দীর্ঘগতিপথে তা কোথাও কোথাও একটু লবণাক্তও বটে।
শরভের ঘরেও পর্যাপ্ত জলের অভাব। সেও সকলের মত একটি বিশাল মৃৎপাত্র নিয়ে নদীর দিকে যাত্রা করে।
নদীর ধারে শরবনের ভিতর কোনও প্রাণীর নড়াচড়া দৃষ্ট হতেই সে একটি সূচালো পাথরের টুকরো হাতে এগোতে থাকল। খানিকদূর গিয়ে সে দেখতে পেল একজন দৈত্যকার গৌরদেহী বলশালী পুরুষ একটি অনিচ্ছুক নারীর ওপর বলপ্রয়োগ করছে। নারীটি যন্ত্রণায় একটি আর্তচিৎকার করে উঠতেই শরভ তাকে চিনতে পারল। এতো সেই নারী যাকে সে সেদিন নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিল। র দ্বিরুক্তি না করে শরভ তীক্ষ্ণ পাথরটি পিছন থেকে পুরুষটির মাথা লক্ষ্য করে সে সজোরে নিক্ষেপ করে। তার অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ দৈত্যটির করোটিতে সজোরে আঘাত করে রক্তপাত ঘটাতে সক্ষম হল।
যন্ত্রণার অভিঘাতে তৎক্ষণাৎ সে মেয়েটিকে বক্ষচ্যূত করে মাটিতে পড়ে সংজ্ঞাহীন হতেই তার দৃঢ়বাহুপাশ ছাড়িয়ে ওই মেয়েটি দৌড়ে এসে শরভকে আলিঙ্গন করল। তার বসনটি এখনো স্খলিত হলেও সে এযাত্রায় রক্ষা পেয়েছে।
শরভ মিত্রাণীকে বুকে চেপে ধরে থাকে। একটি পক্ষীশাবকের মত তার নরম দেহটি শরভের আশ্রয়ে ক্রমে নিবিড় হয়ে আসে।
কিন্তু এই অনন্য মুহূর্তটি বেশীক্ষণ স্থায়ী হলনা। কবেকার কোন প্রাচীন যুগীয় দৈত্য আচমকা নিদ্রাভঙ্গ শেষে ভূমিকম্পের মাধ্যমে হঠাৎ
যেন জেগে উঠল। মাটির ভিতর থেকে সেই তীব্র কম্পনে আশেপাশের অনুচ্চ পাহাড় থেকে প্রস্তরপিন্ড এদিক সেদিক থেকে বৃষ্টির মত কোথা থেকে গড়িয়ে আসতে লাগলো।
এমনকি সেই অতিলৌকিক প্রলয়ের ফলে হঠাৎ গতিপথ পরিবর্তন করে সিন্ধুনদী ক্রমশ তার ভয়ংকর জলরাশি নিয়ে ফুঁসে উঠে এক ভয়ানক দুকূলপ্লাবী বন্যায় দশদিক ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগল । হরপ্পা, লারকান, নাহাল সহ প্রভৃতি সিন্ধুবাসীদের জনপদ হয় বিশাল পাথরের স্তুপে চাপা পড়লো নয়তো সিন্ধুর জলরাশির প্রবল বন্যায় ভেসে গেল।
...
কিন্তু এত দূর্যোগের মধ্যেও শরভ আর মিত্রাণী যতক্ষণ পর্যন্ত জীবিত ছিল তারা একবারের জন্যও পরস্পরকে নিজের থেকে আলাদা করেনি। মৃত্যুদূতের শমন হাতে নিয়ে ছিটকে আসা প্রস্তররাশি আর অাকূলস্রোতা সিন্ধুনদের আকস্মিক ষড়যন্ত্রে তাদের কাহিনীটি চিরকালের মত অসমাপ্তই রয়ে গেল।
লেখা পাঠানোর জন্য আহ্বান
👇

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন