জিয়াগঞ্জ ব্রহ্মময়ী কালীবাড়ির ইতিহাস - অভিজিৎ দত্ত

প্রবন্ধ......

"জিয়াগঞ্জ ব্রহ্মময়ী কালীবাড়ির ইতিহাস"
অভিজিৎ দত্ত
মুর্শিদাবাদ,পশ্চিমবঙ্গ,ভারতবর্ষ 
জিয়াগঞ্জ ব্রহ্মময়ী কালীবাড়ির ইতিহাস - অভিজিৎ দত্ত

জিয়াগঞ্জের সবচেয়ে প্রাচীন কালীমন্দির হল জিয়াগঞ্জ পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের নিমতলাঘাটের ব্রহ্মময়ী কালী।শোনা যায় ১১৮৩সাল থেকে এই পারিবারিক পূজো শুরু হয়।তবে আগেও শুরু হয়ে থাকতে পারে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।কিন্ত মায়ের খাঁড়াতে যে সনটি পাওয়া যায় তাতে ১১৮৩সন লেখা আছে।

বর্তমানে নিমতলাঘাটর মন্দিরে এই পূজো চালু থাকলেও আদি পূজো চালু হয়েছিল বর্ধমান জেলার গলাতন পাতন এলাকায়।পরে সেখানে গঙ্গাভাঙন শুরু হওয়াই মাকে বর্ধমানের গলসি থানা এলাকার শ্রীধরপুরে স্থানান্তর করা হয়।কিন্ত সেখানে কলেরার চরম প্রকোপ শুরু হয়।গ্রামকে গ্রাম ধংস্ব হয়ে যায় তখন ব্রহ্মময়ী কালীর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুরুদাস ব্যানার্জি এই জিয়াগঞ্জে মায়ের ঘট নিয়ে চলে আসেন।তখন মা কালী তাকে স্বপ্নে দেখা দেন এবং নির্দেশ দেন নিমতলাঘাটে ,ঐঘাটের মাটি নিয়ে তাকে প্রতিষ্ঠা করার।এছাড়াও বলেন যত পা ঘাটে নামবি ততটা ছাগল বলি দিবি।সেই থেকে নিমতলাঘাটে এই পারিবারিক পূজো চালু আছে সেইসঙ্গে বলিপ্রথা।শোনা যায় এই মন্দির যখন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তখন কাশি থেকে দুজন পন্ডিত এসে এখানে চন্ডীপাঠ করেছিলেন।মন্দিরের পেছনের ঘাটটি এখনও কালী ঘাট নামেই পরিচিত। 

মায়ের পূজো শুরু হয় সকাল দশটা থেকে এবং সন্ধ্যায় ছয়টা থেকে।এই মন্দিরে বিপদতারণ পূজো,মঙ্গলচন্ডীর পূজো ইত্যাদি নানারকম পূজো হয় ঘটের উপর।প্রতিদিন অন্নভোগ হয়।তবে শনি ও মঙ্গলবারের ভোগে মাছ অবশ্যই দিতে হয়।তবে এই মায়ের আসল পূজো কালী পুজোর সময় হয় না।।মায়ের আসল পূজো হয় প্রতিবছর চৈত্র মাসের শেষ মঙ্গলবার।ঐসময় মায়ের পূজোতে অবশ্যই শোল মাছ রাখতে হয়।ঐ দিন সকলকে দিনের বেলায় প্রসাদ ও রাতে পাত পেড়ে খাওয়ানো হয় ।প্রতিবছর মাকে নতুন করে সাজানোহয়।চারবছর অন্তর নতুন করে মায়ের বিগ্রহ তৈরী করা হয়।এছাড়াও পূর্বে আজিমগঞ্জের দিক থেকে শিয়ালরা এসে মায়ের ভোগ খেত বলে তাদের জন্যও ভোগের ব্যবস্থা করা হত।একে শিবা ভোগ বলা হত।বর্তমানে এই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।এছাড়াও প্রতি অমাবস্যাতে মায়ের পূজো হয়।তবে মূল মন্দিরটি ভাগীরথীর গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে।

এই মায়ের পূজোকে কেন্দ্র করে নানা কাহিনী শোনা যায়।গুরুদাসবাবুর উত্তর পুরুষের কেউ একজন মারা যাওয়াই মায়ের পূজো চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।এক বৃদ্ধা তখন এই পূজোর দেখাশোনা করতেন। তিনি নিরুপায় হয়ে সেই সময়কার ধনী ব্যক্তি জিয়াগঞ্জ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীপৎ সিং এর বাবা শ্রী ছত্রপৎ সিংদের কুঠীতে যান এবং আর্জি জানান মায়ের পূজো চালানোর জন্য কিছু আর্থিক সাহায্য করতে। শ্রী ছত্রপৎ সব শুনে পূজোর দায়িত্ব নিতে চান কিন্ত শর্ত দেন বলিদান প্রথা বন্ধ করার। নিরুপায় হয়ে বৃদ্ধা সেই প্রস্তাবে রাজী হলেন।ছত্রপৎবাবু তিনজন সেপাইকে পাঠিয়েছিলেন মায়ের যেখানে বলি হয় সেখানকার হাঁড়িকাঠটি তুলে দেবার জন্য। তিনজন সেপাই অনেক চেষ্টা করেও সেই হাঁড়িকাঠটি তুলতে পারে নি।তারা অসহায় হয়ে ফিরে যায়।তখন শ্রী ছত্রপৎ সিং মায়ের মহিমা বুঝতে পারেন। তিনি তখন অপুত্রক ছিলেন। পুত্র কামনায় মায়ের কাছে মানত করেন এবং মায়ের আর্শীবাদে পরবর্তীকালে শ্রীপৎ সিং ও জগৎপৎ সিং নামে দুই সন্তানের জনক হন।

বর্তমানে ব্যানার্জি পরিবার মায়ের পূজো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে(অর্থাৎ যার যখন পালি পড়বে তাকে তখন পূজো চালাতে হবে)করছে।বর্তমানে খরচা অনেক বেড়ে গেছে।মায়ের সম্পত্তিও সেরকম নেই। মায়ের মন্দিরের কিছু জায়গা ছাড়া।ভক্ত জন ও যারা মায়ের কাছে মানত করেন তাদের যৎসামান্য সাহায্য ছাড়া মায়ের পৃজো চালানোর আর কোন সোর্স নেই। এই পরিস্থিতিতে সহৃদয় ব্যক্তিবর্গ ও ভক্তজনই ভরসা।জিয়াগঞ্জের সবচেয়ে প্রাচীন এই কালী মন্দিরের পূজো চালু রাখা এবং তাকে কালের কবল থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব স্হানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে স্হানীয় বাসিন্দা সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার-ব্যানার্জি পরিবার-সত্যেন্দ্র কুমার ব্যানার্জি ও শ্রীকান্ত ব্যানার্জি।
জিয়াগঞ্জ ব্রহ্মময়ী কালীবাড়ির ইতিহাস অভিজিৎ দত্ত

লেখা পাঠানোর জন্য আহ্বান 
👇

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

১৬ মে ২০২২

এক মুঠো পয়সা | প্রত্যুষ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়