আর তারপর | গৌতম নায়েক

গল্প......

"আর তারপর"
গৌতম নায়েক
বীরভূম, পঃবঃ

        'গুপী গাইন বাঘা বাইন ভূতের রাজার কাছ থেকে তিনখানা জবর জবর বর তো পেয়ে গেল,' দাদু বললেন, 'কিন্তু তারপর কি হলো জানো?'

----- কি হলো? কি হলো?

----- ভূতের রাজা তো আসলে ভূত, তিনি তো আর ভগবান নন। ভগবানের বর সরাসরি খাটে। কিন্তু ভূতের রাজার বর বাস্তবায়নের জন্য তার তিন বিশ্বস্ত সাগরেদ ছিল। তারা রাজা মশাইকে বড্ড শ্রদ্ধা ভক্তি করতো। মামদো গুপী বাঘার পছন্দ মতো পোশাক সাপ্লাই করতো; আশীর্বাদী জুতোর ভিতরে থাকতো জ্বীন যে তাদেরকে তাদের ইচ্ছে মতো অদৃশ্য করে উড়িয়ে নিয়ে যেত আর শ্যাকচুন্নী সোনার থালায় তাদের পছন্দ মতো খাবার সাজিয়ে দিত। তারা অদৃশ্য হয়ে কাজ করতো, তাই গুপী বাঘা টেরই পেত না কি করে কি হচ্ছে। তারা তাদের খেয়াল খুশি মতো যখন তখন যা খুশি চেয়ে বসতো। স্থান কাল পাত্র জ্ঞান ছিল না তাদের। আর এই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তিন সাগরেদ নাজেহাল। 

          রাজামশাই যখন একদিন দুপুরে তার বিশাল অশ্বত্থ গাছের বড়ো কোটরের ভিতর রাজকীয় প্রাসাদে দিবানিদ্রায় মগ্ন তখন তিনটি বৃত্তাকার দপদপ করা উজ্জ্বল আলোয় তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। তিনি চোখ কচলে তার তিন সাগরেদকে দেখলেন। বেচারাদের চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। বড় ক্লান্ত আর বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। রাজা মশাই ঘুম জড়ানো বিস্মিত কন্ঠে বললেন ----

 'তোমরা যে বিষণ্ণ, বড়ো দেখি ক্লান্ত - ক্লান্ত - ক্লান্ত
ব্যাপারটা কি বলো, আছো কি জ্যান্ত - জ্যান্ত - জ্যান্ত?'

          রাজা মশাই- এর ঘুম ভাঙা দেখে তারা হাপুস নয়নে একসাথে কেঁদে উঠে সমস্বরে বলল,

      কি বিপদে যে ফেলেছেন মহারাজ
     ওদের সেবা ছাড়া নেই আর কোন কাজ।
     জানাতে এসেছি মোরা নালিশ তাই,
     বিহিত এর এক করা চাই - করা চাই - করা চাই

----- একটু কি বলবে বুঝিয়ে - বুঝিয়ে - বুঝিয়ে,
      কেন বলো কেঁদে মরো ককিয়ে - ককিয়ে - ককিয়ে?

মামদো -----
     কি স্টাইল উনাদের মহারাজ
    ক্ষণে ক্ষণে বদলায় ওরা সাজ।
    কোথায় বলো এত পায় প্যান্ট জামা?
    ইস্তফা দিয়েছেন টেলার মামা।
    হয়ে গেছি আমি বড় হয়রান,
     মনে হয় নিজেকে হনুমান।
     মহারাজ বলুন না কি করি
    আপনার বরে তো আমি মরি।
   আপনাকে করি বড়ো সম্মান,
    এখনও আছে তাই ওদের জান।

রাজামশাই -----
বুঝলাম, মামদোর সমস্যা - সমস্যা - সমস্যা
তবু বলি ছেড়ো না কোন আশা - কোন আশা - কোন আশা।

শুনি জ্বীনের কপাল কেমনে পুড়লো - পুড়লো - পুড়লো,
এগিয়ে এসে জ্বীন তুমি বলে ফেলো - বলে ফেল - বলে ফেল।

চোখের জল নাকের জল এক করে জ্বীন ----

ক্ষমতা আর নেই গো আমার,
দুটো লোক কাঁধে, মহা ভার।
রসিক যে তারা বড় ভ্রমণের,
বারোটা বেজে যায় পিঠ কাঁধের।
যেথা সেথা ধরে বসে খালি গান,
অপেক্ষায় অপেক্ষায় মোর যায় জান।
বিহিত করো গো ও মহারাজা
বনের মোষ তাড়ালে বৌ বলেছে, দেবে সাজা।

রাজামশাই ----- 

তোমার দুঃখুটা বলো শ্যাকচুন্নী - শ্যাকচুন্নী - শ্যাকচুন্নী
যুবা ভূতের হার্টথ্রব তুমি রাণী - তুমি রাণী - তুমি রাণী।
দীঘল ঐ চোখে জল মানায় না - মানায় না - মানায় না
থামাও গো সুন্দরী তোমার কান্না - তোমার কান্না - তোমার কান্না।

         শ্যাকচুন্নী ক্যাঁই ক্যাঁই করে কাঁদতে কাঁদতে নাকের সুরে বলল ----

মহারাজ ওরা যে বড় পেটুক
সবটুকু খেয়ে নেয় যেথা যেটুক।
পেটুক শুধু ওরা মোটে নয়,
সোনার থালা থলেতে ভরে নেয়।
হাতে পড়ে গেছে খুন্তির দাগ,
বর শুধু খেদায় মোরে, তুই ভাগ।
বলে, তোর জন্য ঘর হচ্ছে ছারখার,
হোল টাইম ডিউটি হবে না আর।

রাজামশাই ----

সমস্যা শুনে এখন আমি ভীত - আমি ভীত - আমি ভীত,
এত বর না দিলেই ভালো হতো - ভালো হতো - ভালো হতো।
দিয়ে ফেলেছি আর নেই আশা - নেই আশা - নেই আশা,
হারিয়েছি আমি বলার ভাষা - বলার ভাষা - বলার ভাষা।
এবার থেকা কে দেব বর দেখে শুনে - দেখে শুনে - দেখে শুনে,
একটা কি দুটো দেব গুনে গুনে - গুনে গুনে - গুনে গুনে।
দেখো, এবার হবো আমি সাবধান - সাবধান - সাবধান,
তোমরাই গাইবে মোর জয়গান - জয়গান - জয়গান।
আজই দেব কর্মখালির বিজ্ঞাপন - বিজ্ঞাপন - বিজ্ঞাপন,
কাজ ভাগ করে নেবে আপন আপন - আপন আপন - আপন আপন।
কাজ আট দশ শিফটে হবে - টে হবে - টে হবে,
তোমরা নিশ্চয় তাতে ভালো রবে - ভালো রবে - ভালো রবে।
নিজ নিজ টিমে তোমরা টিম লিডার - টিম লিডার - টিম লিডার,
বেতনও ডাবল করে দিলাম এবার - দিলাম এবার - দিলাম এবার।
আমার সম্পদ শক্তি তোমরাই - তোমরাই - তোমরাই,
দেখ যেন মোর মান না যায় - না যায় - না যায়।
আশা করি খুশিতে হবে গো আনমনা - আনমনা - আনমনা,
চলি তবে শেষ আজ আলোচনা - আলোচনা - আলোচনা।

          রাজামশাই আলোর কুন্ডলী হয়ে গাছের কোটরে ঢুকে গেলেন। তার তিন সাগরেদ আনন্দে আত্মহারা হয়ে সমস্বরে বলে উঠলো, 

জয় হোক আপনার, মহারাজ,
মন দিয়ে করবো মোদের কাজ।

               * * *

         আমরা অবাক হয়ে শুনতে শুনতে দাদুকে জিজ্ঞেস করলাম, ' আচ্ছা দাদু, তুমি পরবর্তী এতসব ঘটনা জানলে কি করে?"

        "আরে আমিই তো আগের জম্মে ভূতের রাজা ছিলাম রে, এ জম্মে তোদের দাদু হয়েছি," বলেই অকস্মাৎ দাদু হাত পা ছুড়ে তিড়িং বিড়িং করে নাচতে লাগলেন আর গলা ছেড়ে শুরু করলেন ----

"ভূতের রাজা দিল বর
জবর জবর তিন বর-----"

          দাদুর এমন পাগলপারা আচরণে আমরা সবাই ভয়ে অস্থির। আধমরা হয়ে গুটিসুটি মেরে বসে যখন পালানোর পথ খুঁজছি তখনই মা দরজার বাইরে থেকে দাদুর কান্ড দেখে হেসে লুটোপুটি খেতে খেতে বললেন, "সত্যিই বাবা, আপনি পারেনও বটে! এই বয়সে ছেলেমানুষী আপনার এখনও গেল না।"

লেখা পাঠানোর জন্য আহ্বান 
👇

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

১৬ মে ২০২২

এক মুঠো পয়সা | প্রত্যুষ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়