শেষ ঠিকানা | রুচিরা সাহা

গল্প......

"শেষ ঠিকানা"
রুচিরা সাহা
ইংলিশ বাজার, মালদা,পশ্চিমবঙ্গ,ভারতবর্ষ 
শেষ ঠিকানা | রুচিরা সাহা

বারীন চন্দ্র রায়।১৯৬৪সালে রিউজি হয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসেন।প্রথমে ঠাঁই হয়েছিলো একটি ক্যাম্পে।সঙ্গে ছিলো স্ত্রী আর একমাত্র পুত্র,বয়স আট বছর,আর একটি মেয়ে মাত্র চার বছরের।অর্থপুঁজি কিছুই ছিলো না।স্ত্রী ছিলেন খুব বুদ্ধিমতী।তিনি অসার সময় কিছু সোনার গহনা মাথার খোঁপার মধ্যে লুকিয়ে এনেছিলেন।আর শক্ত করে চুলের খোঁপাটি বেঁধে রেখেছিলেন।সেই সময় মাথায় ঘোমটা দেওয়ার প্রচলন ছিলো গৃহবধূদের।প্রায় দুই সপ্তাহ কষ্ট করার পরে বারীনবাবুর এক পরিচিত ব্যক্তির কথা মনে পরে হঠাৎ।তিনি সেই স্বদেশবাবুর  বাড়িতে গিয়ে ওঠেন স্ত্রী আর সন্তানদের নিয়ে।স্বদেশবাবুর গৃহে তাঁদের স্বসম্মানেই ঠাঁই হয়।চার বছরের মেয়েটির হঠাৎই জ্বর হয়।স্বদেশবাবুর সাথে বারীনবাবুও গিয়ে ডাক্তার ডেকে আনেন।ওষুধ দিলেন।কিন্তু বারীন বাবুর কাছে টাকা নেই অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।বারীনবাবুর স্ত্রী তখন খোঁপাটি খুলে গলার হারটি দেন প্রথমে দুজনেই নিতে অস্বীকার করলেও পরে সেটা বিক্রি করে কয়েকদিন চলে যায়।সন্ধ্যাবেলায় বারীনবাবু আশ্চর্য হয়েছিলেন স্ত্রীর বুদ্ধি দেখে।ভোরবেলা মেয়েটির জ্বর আরও বাড়ে পরেরদিন দুপুরে মারা যায়।সেদিন ছিলো পিতৃতর্পনের দিন।বারীনবাবু তাঁর চার বছরের কন্যা সন্তান হারান।স্বদেশবাবু বারীনবাবুর মনের অবস্থা বুঝে তাঁর অফিসের বড়বাবুকে অনেক বলে একটি পিওনের পদে চাকুরীর ব্যবস্থা করে দেন।স্বদেশবাবুর বাড়িতেই ভাড়া থাকতে শুরু করেন।ছেলেকে ভর্তি করান জিলা স্কুলে।কয়েক বছর বাদে সরকার থেকে  উদ্বাস্তুদের জন্য জায়গা দেওয়া হয় তাতে বারীনবাবুরও নাম রয়েছে।সরকার থেকে জায়গা পেলেন।নিজের চাকুরীর টাকা আর স্ত্রীর সম্পূর্ণ গহনা বিক্রি করে মাথা গোঁজার মতো করে বাড়িটি তৈরি করলেন।ছেলে প্রদ্যুৎ পড়াশোনা করার জন্য কলকাতায় গেলো।বারীনবাবু অফিস চলে গেলে তাঁর স্ত্রী বাড়িতে নানান ফুল ও ফলের গাছ লাগাতেন।আবার সেগুলোর যত্ন করতেন।সারা দুপুর অপেক্ষায় থাকতেন খোকার চিঠির।পাড়ার মেয়েদের দেখে তাঁর মেয়ের কথা মনে পরে যায়।এদিকে বারীনবাবুর চাকুরীতে উন্নতি হয় তিনি এখন আর পিওনের পদে নেই।অফিসের ক্লার্ক হয়েছেন।কাজেই মাইনেও একটু বেড়েছে।বারীনবাবু বাড়িটিকে সুন্দর করে তৈরি করলেন।তাঁর খোকার জন্য সুন্দর দুটি ঘর করলেন উপরে। পুজোর ছুটিতে প্রদ্যুৎ বাড়ি এলো।সকলেরই আনন্দ।ছুটির পরে আবার কলকাতায় চলে যায়।এর পরে প্রদ্যুৎ বাড়ি ফিরে এসে তাঁর বাবাকে জানায় সে ডাক্তার হতে চায়।বারীনবাবু ভেবেছিলেন পড়াশোনা শেষ করে কোনো চাকুরী করবে,কিন্তু মতের অমিল হলো।তিনি চিন্তায় পড়লেন টাকার সংকুলান কোথা থেকে করবে?তাঁর স্ত্রী অভয় দেন সব ঠিক হয়ে যাবে।তিনি বাংলাদেশ থেকে আসার কথাটা স্মরণ করিয়ে দেন।বারীনবাবু স্বদেশবাবুর সাথে আলোচনা করলে তিনি উৎসাহ দেন।তারপর টাকার ব্যবস্থা হয়ে যায়।প্রদ্যুৎ ডাক্তারীতে ভর্তি হয়।সেই সময় সে এক শিল্পপতির মেয়ের সাথে ভালোবাসায় আবদ্ধ হয়।ডাক্তারী পাশ করার পরে স্বদেশবাবুর ইচ্ছে ছিলো তাঁর মেয়ে ঝিমলির সাথে প্রদ্যুতের বিয়েটা দেবে।প্রদ্যুতের কাছে বারীনবাবু বিয়ের কথা তুলতেই জানতে পারেন প্রদ্যুৎ বিয়ে করে নিয়েছে।উনার মাথায় যেন একটা বাজ পড়েছিল।কিছক্ষন চুপচাপ থাকলেন।প্রদ্যুৎ কোনোদিনও জানতে পারেনি তাঁর মা বাবা কিভাবে তাকে পড়াশোনা করিয়েছেন।দুদিন পরে চলে যাওয়ার সময় কিছুটাকা দেয় তাঁর বাবার হাতে।বারীনবাবু অভিমানে সেটা নেন নি।কয়েক মাস বাদে তিনি চাকুরী থেকে অবসর নেন।অবসরের পরে স্ত্রীর অনুরোধেই একদিন কলকাতায় আসেন প্রদ্যুতের বাড়িতে। সে শ্বশুরবাড়িতেই থাকে।তাঁর বৌ একমাত্র মেয়ে।প্রদ্যুৎ না আসা পর্যন্ত বারীনবাবু আর তাঁর স্ত্রীর স্থান হয়েছিল বাড়ির বাইরে।প্রদ্যুতের কাছে শোনে সে খুব শীঘ্রই  কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করবে।বারীনবাবুর স্ত্রীর কান্নায় বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো।কিন্তু খুব চাপা স্বভাবের মানুষ।নিশ্চুপ থাকলেন।পরেরদিন খুব সকালে বাস ধরে নিজের বাড়িতে চলে আসেন।অনেক কষ্টের পরেও যে পুত্রের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াটা মন থেকে মেনে নিতে পারেন নি। পেনশনের উপর ভরসা করে দুজনের চলছিলেন।একদিন খবর পান অচেনা শহরের আশ্রয়দাতা স্বদেশবাবু মারা গেছেন।এদিকে বারীনবাবুরও বয়েস হচ্ছে।তাঁর স্ত্রী নিজের কোনো অসুখের কথা মুখেও আনতেন না।স্বামীকে কিভাবে সুস্থ রাখা যায় তিনি সেই চেষ্টাই করে যেতেন।পাড়ার লোকজনই একমাত্র ভরসার।একদিন বারীনবাবুর স্ত্রী রান্না করতে করতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান।সকলের সহযোগিতায় বৃদ্ধ বারীনবাবু হাসপাতালে নিয়ে যান।সন্ধ্যাবেলায় তাঁকে মৃত বলে ঘোষনা করে ডাক্তারবাবু।অনেক কষ্ট করে ছেলেকে খবর দেন।আসতে নাকি দিন দুয়েক সময় লাগবে।কাজেই চোখের জলে বৃদ্ধ বারীনবাবু স্ত্রীর সৎকার করেন।যাই হউক নিয়মরীতি মেনে শ্রাদ্ধশান্তি হলো।প্রদ্যুৎ চলে যায়।রয়ে যায় আশিতিপর বৃদ্ধ মানুষটি একাকী।পাড়ার লোকেরাই উনাকে দেখাশোনা করেন।হঠাৎ চার বছর পরে প্রদ্যুৎ আসে একসপ্তাহের জন্য।সে তাঁর বাবাকে বলে "তাঁদের সঙ্গে তিনি থাকবেন।কাজেই বাড়িটি বিক্রি করে দিলে ভালো।কেই বা থাকবে এখানে।খালি পড়ে থেকে নষ্ট হবে।" ছেলের সাথে থাকবে তাতে খুব খুশি হন বারীনবাবু।তিনি তাঁর পরিচিত সকলকে বলেন "তিনি শেষ জীবনটা খোকার কাছেই থাকবে।"এতে তাঁর শুভাকাঙ্খীরা খুব খুশি হন।বাড়িটি বিক্রি হয়ে যায় দুদিন পরে প্রদ্যুৎ একটি সাদা গাড়ি করে একটা বড় দরজাওয়ালা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়।সবুজ ঘাস,নানান গাছপালা,হরেকরকমের পাখি।প্রদ্যুৎ নেমে তাঁর বাবাকে নামতে বলেন।বারীনবাবু জিজ্ঞাসা করেন "তুই এখানে থাকিস খোকা?"প্রদ্যুৎ কোনো উত্তর দিতে পারলো না।মাথা নীচু করে বলে "আজ থেকে তুমি এই বৃদ্ধাশ্রমেই থাকবে বাবা।এখানে তুমি তোমার সমবয়সীদের সাথে কথা বলে সময় কাটাতে পারবে।হ্যাঁ,তোমার পেনশনটা সামনের মাস থেকে এই ঠিকানায় আসবে। আমি এখন আসি।বছরে একবার আসবো দেখা করে যাবো।আর প্রতি রবিবার ফোন করবো।"প্রদ্যুৎ গাড়ি নিয়ে চলে গেলো।আশিতিপর সহজ সরল বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে ধুতির কোছা দিয়ে চোখের জল মুছতে লাগলেন।তিনি একটি বারও বুঝতে পারেন নি ছলনার আশ্রয়ে তাঁর সখের বাড়িটি বিক্রি করিয়ে দিয়ে আজকের থেকে তাঁর  নতুন ঠিকানা হলো বৃদ্ধাশ্রম।কিছুক্ষনের জন্য ভেবেছিলেন স্ত্রী রমা কিংবা তাঁর মেয়ে প্রতিমা বেঁচে থাকালে কি এটাই হতো?প্রতি রবিবার অপেক্ষায় থাকেন খোকার ফোনের।কোনোদিনও ফোন আসে না।বৃদ্ধাশ্রমই হলো বারীন চন্দ্র রায়ের শেষ ঠিকানা।
শেষ ঠিকানা | রুচিরা সাহা
রুচিরা সাহা
লেখিকার পরিচয়:
মালদহ জেলার ইংলিশ বাজার শহরে লেখিকার জন্ম।পিতা স্বর্গীয় রাম গোপাল সরকার,পেশায় একজন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন।মতামহ স্বর্গীয় নিত্য রঞ্জন সরকার ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী,তিনি দুইবার ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কারাবরণ করেন। কবি খুব অল্প বয়সেই পিতৃ হারা হন।কিন্তু সমস্ত প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর হন।বেশ কয়েক বছর শিক্ষকতাও করেন ।স্কুল ও কলেজ পত্রিকায় লেখালেখি করতেন।তাঁর প্রথম কাব্য সংকলন -"অন্তরালে"।দরিদ্র শিশুদের বিনা পারিশ্রমিকে পড়ানো এবং স্বেচ্ছায় রক্ত দান করেছেন বিভিন্ন সময়ে।

লেখা পাঠানোর জন্য আহ্বান 
👇

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

১৬ মে ২০২২

এক মুঠো পয়সা | প্রত্যুষ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়