আলো-আঁধারি | শান্তনু ঘোষ

গল্প......

"আলো-আঁধারি"
শান্তনু ঘোষ
বলাগড়, হুগলী,পশ্চিমবঙ্গ,ভারতবর্ষ 
আলো-আঁধারি | শান্তনু ঘোষ

রেলিঙে মানিপ্ল্যান্টের লতাপাতায় জ্যোৎস্নার আলো এসে পড়েছে। বারান্দার চেয়ারে শরীরটাকে এলিয়ে বসে আছে সন্দীপ, দেখছে জ্যোৎস্নার আলো আঁধারি।-হ্যালো, হ্যাঁ, একটু ধরো আমি দিচ্ছি?-কার ফোন সুতপা? কে করেছে?-কারা যেন কলাবতী পত্রিকা থেকে। টিভির সুইচ অফ করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সুতাপা ফোন দেয়, সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে।-হ্যালো, কে? কে? ও সঞ্জয়, বলো ভাই কেমন আছো? উত্তর আসে ভালো। -আপনি কেমন আছেন?-এই আছি আর কী। সপ্তাহ খানেক আগে একবার তোমাদের পত্রিকার সহ-সম্পাদক ফোনে খোঁজ খবর নিয়েছে।-আসলে না দাদা, আমাদের পত্রিকা হয়ে গেছে। এবারের সংখ্যাটা বার্ষিক। দূরের অনেককেই চিঠিপত্র পাঠানো হয়ে গেছে অনুষ্ঠানের। -তোমরা কী আর করবে, এরকম একটা পরিস্থিতি, গোটা দেশ যেখানে একজোট হয়ে লড়ছে। -এবারের সংখ্যায় আপনার ঘর কবিতাটি আছে, পরের সংখ্যায় আপনার সাক্ষাৎকারটি যাবে। অনুষ্ঠানের ব্যাপারে পরে কথা বলে নেব, আপনার কিন্তু আসা চায়। -না না ভাই যাব, নিশ্চিন্তে থাকো। দ্রুত পৃথিবীর আরোগ্য কামনা করি, ভালো থেকো, আর কি.........। সুতপা চা নিয়ে রেলিঙে আসে। বাড়িতে থাকলে সন্দীপ এই সময় চা খায়। সন্দীপের হাতে চা দিয়ে শাড়ির আঁচলে গলার ঘাম মোছে সুতপা, ক'দিন বেশ গরম পড়েছে। চায়ে চুমুক দেয় সন্দীপ।- কে ছিল ছেলেটি?-ওকে তুমি চিনবে না, ওরা কলাবতী নামে পত্রিকা করে, আন্তরিক। ভেবে দেখো, লকডাউনে প্রত্যেকে যখন ভয়ে সিঁটিয়ে ওদের মাথায় তখন পত্রিকার চিন্তা, ফোনে খোঁজ খবর নিচ্ছে, কে কেমন আছে। জানিনা, লকডাউনের দ্বিতীয়পর্ব, কতদিন যে মানুষকে গৃহবন্দী থাকতে হবে......। সন্দীপ গৃহবন্দী। ছাত্রদেরও ছুটি দিয়েছে অনির্দিষ্ট কালের জন্য। সন্দীপ তবলা বাদক। মফস্বলের বাড়িতে বাড়িতে ক্লাস করায়। সংসারে মানুষ বলতে স্বামী- স্ত্রী। সন্তান হয়নি। সন্দীপের বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই, সুতপার কয়েক বছর কম। এক বছর হল তারা এখানে ভাড়ায় আছে । আগে ত্রিবেণী ছিল। সন্দীপ ও তার স্ত্রী সুতপার এ পড়ায় অনেকের সাথে সখ্যতা, ভালো সম্পর্ক। তবলা বাজিয়ে ছাড়াও সন্দীপ কবিতা লেখে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যায়, সময় করে। বড় কোন কবি নয়, ভালো লেখে, নাম আছে। এইতো যে বছর এখানে প্রথম ভাড়ায় এলো সে বছর এখানে পুজোর অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেছে, বাজনদারও তো থেকেছে অনেকের কথা রাখতে। ক্লাবের ছেলেরা খুবই সমীহ করে। -বলছি,ঋতু ফোন করেছিল।-কখন?-দুপুরে। কিছু বলছিল?-না তেমন কিছু নয়, ভালো আছে। -আমার কথা কিছু বলছিল ?-জিজ্ঞাসা করছিল, জামাইবাবু বাড়ির বাইরে যায় কিনা। -তুমি কি বললে? আমি বললাম, না রে শুধু শুধু তুই চাপ নিচ্ছিস, আমরা ঠিক আছি, তোরা সাবধানে থাকিস। ও বলেছে রাতে ভিডিওকল করবে। -সন্দীপ দা, ও সন্দীপ দা, আমি বাবান। দরজাটা একবার খুলুন। -কারা আবার এই সময়, দাঁড়াও দেখি। সন্দীপের পিছন পিছন সুতপাও এগিয়ে যায় দরজা খোলে। সন্দীপ কে দেখে বাবান বলে, আমরা দাদা। -কি ব্যাপার, ভাই?-ও কিছু না, খোঁজখবর নিতে এলাম, আর তেমন করে দেখা করা হয়ে উঠে না, তাই….। চারদিকে লকডাউন চলছে, ক্লাবের পক্ষ থেকে মানুষের হাতে এই কিছু কিছু তুলে দিচ্ছি। আমাদের ক্লাবে আপনারও তো কম অবদান নেই। আপনিও তো এপাড়ায় আছেন অনেকদিন হয়ে গেল । পাশ থেকে মন্টু বলে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি দেখছিস, বৌদির হাতে দে। -না না, ভাই এসবের প্রয়োজন নেই, সন্দীপ ও বলে, তোমাদের ফিরিয়ে দিচ্ছি এমন ভেবো না। এমন দিনে তোমরা যে মানুষের পাশে আছো এটিই অনেক, বিপদে মানুষ এ সাহায্যের কথা বহুদিন মনে রাখবে। তোমরা এক কাজ করো ওই সাহায্য টুকু পৌঁছে দাও ও পাড়ার উত্তম কাকুর হাতে। ভাঙা পায়েও কী সুন্দর ধুনুচি নাচ করে পূজার ক'দিন। সকলকে কেমন আনন্দ দেয়। দরজার সামনে সকলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, বিষন্ন হয়ে পড়ে।- কিরে বাবান আমি ভুল বললাম ? দীনেশ বলে, সন্দীপ দা উত্তম জেঠু আর আমাদের মধ্যে নেই। এতদিন মেয়ের বাড়ি ছিল। করোনা আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়। গতকাল রাতে মারা গেছে। জামাই-মেয়ে কোয়ারান্টিনে। মেয়ের বাড়ি থাকতে ফল নিয়ে বসতো ওখানের বাজারে। স্তব্ধ- নীরব সন্দীপ । তার চোখের সামনে ধুনুচি নাচ মন কেমন করা মায়া ছাড়া কিছু নয়। এরপর কেউ আর বিশেষ কিছু বলেনি। শুধুমাত্র সুতপার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একটি কথা, তোমরা ভালো থেকো। দরজার পাল্লায় হাত দিয়ে সন্দীপ ওদের চলে যাওয়ায় চোখ বুলায়।
শান্তনু ঘোষ
শান্তনু ঘোষ

লেখা পাঠানোর জন্য আহ্বান 
👇

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

১৬ মে ২০২২

এক মুঠো পয়সা | প্রত্যুষ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়