কণ্ঠ - সায়ন মান্না

গল্প......

"কণ্ঠ"

সায়ন মান্না

     মাথার উপর সূর্যদেব নিজের কাজে ব্যাস্ত।আমি হাঁটছি।পাশে হাঁটছে আমার বন্ধু,নীল।গন্তব্য ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল। কিছুক্ষণ হাঁটার পর এসে পৌছালাম ভিক্টোরিয়ার মেন গেটের কাছে।ভেতর ঢুকবো সেই মুহূর্তে চোখ গেলো একটা ভিড়ের দিকে। কৌতুহলী হয়ে ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। দেখলাম একজন মধ্য বয়স্ক ছেলে গিটার হাতে নিয়ে গান গাওয়ার ভঙ্গিতে ঠোঁট নাড়ছে।মাথার চুল উস্কো-খুস্কো।বয়স হবে ২৪-২৫।পরনে সাদা রঙের অপরিষ্কার জামা,একটা জিন্সের প্যান্ট আর পায়ে ধুলোজমা বুট।মুখে লেগে রয়েছে একাকীত্বের ছাপ কিন্তু তৃপ্তির প্রতীক।
আমি নীল কে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলাম,"ছেলেটা পাগল নাকি?" 
- "না।" 
- "তাহলে ওইভাবে গিটার বাজিয়ে শুধু ঠোঁট নেড়ে যাচ্ছে কেনো? লোকেরা তো পাগল ভেবে ভিড় জমাচ্ছে।"
- "না পাগল নয়। একজন গায়ক বলতে পারিস।" ভারী গলায় নীল আমার প্রশ্নের উত্তর দিলো।
- " গায়ক?"
কণ্ঠ - সায়ন মান্না
- "হুম।ছেলেটার নাম দেবব্রত রায়।বাবা মা নেই। অনাথাশ্রমে বড়ো হয়েছে । ছোটো থেকেই গানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা।স্কুলে পড়াকালীন অ্যাক্সিডেন্টে নিজের কানে শুনতে পাওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে তাও নিজের নেশা ছাড়েনি। সুযোগ পেলেই রাস্তায় বসে গিটার বাজিয়ে গান গাইতো।শিক্ষকদের সাহায্যে নিজের গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে আর তখন থেকেই এখানে বসে গান গাওয়া শুরু করেছে।প্রত্যেকে খুব ভালোবাসতো ওর কণ্ঠস্বর।গলায় ছিল আলাদাই এক মাধুর্য"। কথাগুলো বলে কিছুক্ষণ চুপ থেকে গভীর নিশ্বাস নিয়ে আবার যা বলা শুরু করলো তার জন্য আমি একদমই প্রস্তুত ছিলাম না, "কিন্তু কিছু মাস আগে একদিন গান গাইতে গাইতে হঠাৎ গলা ধরে বসে ছটফট করেছিলো। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।কিছুদিন পর ওকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।তারপর আবার কিছুদিন পর থেকে এখানে বসে আবার ও গান গাওয়া শুরু করলো।জানিস,ও জানে ওর কিছু হয়নি কিন্তু আসলে ওর ভোকাল কর্ড বা যাকে বাংলায় বলে, স্বরতন্ত্রী..." 
- " ছিঁড়ে গেছে ?" আমি বিমর্ষ ভাবে জিজ্ঞাসা করলাম।
-" হুম, কিন্তু সেটা ওকে জানানো হয়নি কারণ জানতে পারলে হয়তো ছেলেটা পাগল হয়ে কি না কি করে বসে থাকতো,ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয় আমার।জানিস, ও মনে করে ওর গান সবাই শুনতে পায় কিন্তু সবাই শুধু ওর গিটারের তারের সংঘর্ষ শুনতে পায় যা তাদের মুগ্ধ করার জন্য যথেষ্ট। আশা করছি এবার সব পরিষ্কার তোর কাছে?" 
- " তুই এত কিছু জানলি কিভাবে?"
- " ওকে যেদিন আর যখন হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আমি তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম আর সবটা নিজের চোখে দেখেছি আর সত্যি বললে সেদিন আমি ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেছিলাম।" কথা গুলো শেষ করে হাত দিয়ে চোখ মুছলো নীল।
আমি চুপ রইলাম।
কণ্ঠ - সায়ন মান্না
সায়ন মান্না



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

১৬ মে ২০২২

এক মুঠো পয়সা | প্রত্যুষ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়