সামান্য অসামান্য - প্রবাল মুখোপাধ্যায়

রম্যরচনা......

"সামান্য অসামান্য"

প্রবাল মুখোপাধ্যায়
   আকাশ গঙ্গায় সেদিন নক্ষত্রমণ্ডলীর সভা বসেছে। গুরুত্বপূর্ণ সভা। প্রধানমন্ত্রী বৃহদ্রথ সকলের ঘরে ঘরে বার্তা পাঠিয়েছেন, নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হওয়া চাই, এই সভায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হবে। প্রায় সকলেই উপস্থিত হয়েছেন। তরুণ, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ, যুবতী, কিশোরী, প্রায় নিষ্প্রভ হয়ে ওঠা বৃদ্ধা, মধ্য যৌবনেই নিভু নিভু জ্যোতিষ্ক সবাই আছেন। এমনকি সাড়ে চোদ্দ কোটি আলোকবর্ষ দূরে কোন্ এক নেবুলা থেকে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশু নক্ষত্রটিও এসে উপস্থিত হয়েছে। নক্ষত্ররাজ ভীমকেতু তখনও এসে পৌঁছননি। শিশু নক্ষত্রটিকে ঘিরে সকলেরই অসীম কৌতূহল। প্রত্যেকেই জেনে নিতে চায় এই নেবুলার অবস্থান ঠিক কোথায়। কতদিন সে এই নেবুলায় অবস্থান করেছে। গ্যাসীয় পিণ্ড আর মহাজাগতিক বস্তুকণা মিলে তার শরীর গড়ে তুলতে কত সময় নিয়েছে। নেবুলার কেন্দ্রে উত্তাপ ঠিক কতটা। জন্মমুহূর্তে তার ললাটে ঠিক কতটা পরমায়ু স্থির হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সামনের সারিতে মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল। নক্ষত্ররাজ উপস্থিত হয়েছেন। চোখ তুলে শেষের সারি পর্যন্ত দেখে নিলেন। তাঁর দৃষ্টি যেন খানিক স্তিমিত। কাকে যেন খুঁজছেন, পাচ্ছেন না। দুই চোখে খানিক হতাশা। মন্ত্রী বৃহদ্রথ এগিয়ে এসে কানে কানে কী যেন বললেন। নক্ষত্ররাজের চোখ গেল দশম সারির একেবারে কোণে বসে থাকা তরুণ নক্ষত্রটির দিকে। কেমন যেন আনমনা। সবার সাথেই বসে আছে, অথচ যেন একলা। ঘরশুদ্ধ মানুষের মধ্যেই অবস্থান, অথচ কেমন যেন সকলের ছোঁয়াচ পার হওয়া চাহনি। থেকে থেকে মাথা নাড়ছে, মুখে একরাশ বিষাদ, নিঃশ্বাসের গতি ধীর, উৎসারিত আলোয় চতুর্দিক আলোকিত হয়ে উঠেছে, শুধু ওর মুখখানি অন্ধকারে ঢাকা। আলোর সাম্রাজ্য ওর শরীর ঘিরে, অথচ নিজেকে কেমন যেন অন্ধকারে বেঁধে রেখেছে। আলোর দেশে এ যে বিষম বিপত্তি। নক্ষত্ররাজ প্রমাদ গণলেন। ডাক পড়ল বিষাদমগ্ন তরুণের। অন্ধকারে ঢাকা চোখ দুটির ওপর এসে পড়ল নক্ষত্ররাজের শরীর থেকে উৎসারিত আলো। সেইদিকে চেয়ে নক্ষত্ররাজ বললেন, আকাশে এই যে সহস্র কোটি নক্ষত্রের অবস্থান, এর মধ্যে একটি আমি, একটি তুমি। বিশ্বব্রম্ভাণ্ডে আমার আবির্ভাব হয়েছে তোমার থেকে বেশ কয়েক শত কোটি বছর পূর্বে।
সামান্য অসামান্য - প্রবাল মুখোপাধ্যায়
 ব্রম্ভাণ্ড সৃষ্টির রহস্য আমার শরীরে অনেকটাই বিধৃত। কত কীই তো দেখলাম। দিকভ্রান্ত নক্ষত্রকে ফুরিয়ে যেতে দেখেছি। চলতে চলতে বিপথগামী নক্ষত্রকে জ্বলে উঠতে দেখেছি। আবার জন্ম মুহূর্তেই কোনো কোনো হতভাগ্যের জীবনদীপ গেছে নিভে, বিধ্বংসী বিস্ফোরণে চারপাশে ছড়িয়ে দিয়েছে শরীরের ছিন্নভিন্ন অংশ, তাও দেখেছি। কিন্তু এমনটা আর কখনো চোখে পড়েনি। এমন আনমনা, বিষণ্ণ, মায়াভরা চোখ নক্ষত্রমণ্ডলীর অচেনা। তোমার শরীরের অন্তর্লীন সত্বায় ওই যে লুকিয়ে আছে কৃষ্ণ গহ্বর, কোন্ দূরাগত মহাজাগতিক তরঙ্গ এসে সেখানে ঢেউ তুলল ? কী তোমায় এমন উতলা করে তুললে ? আনমনা তরুণ মুখ তুলে চাইলে। ভারি ম্রিয়মান সে মুখ। দূর আকাশের কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে তার দৃষ্টি প্রসারিত। কেমন এক ঘোরলাগা গলায় বলল, আমার শরীরের কৃষ্ণ গহ্বর যেদিন অস্থির হয়ে উঠল, আলোর কণা সেদিন নিঃশব্দে ছুটে গেল দূর দূরান্তরে। নক্ষত্রমণ্ডলীর বেষ্টন পেরিয়ে তা পৌঁছে গেল আর এক সৌরজগতের কোণায় কোণায়। সেই জগতের তৃতীয় গ্রহের আকাশে এক সন্ধ্যায় দেখা দিল সেই আলোককণার মাত্র এক লক্ষাংশ। তখন গোধূলির সময়। সে এক আশ্চর্য ক্ষণ। পাখিরা কুলায় ফিরছে। মেঘের দল সিঁদূর মেখে কে জানে কোথায় ভেসে চলেছে। বৃক্ষরাজি অন্ধকার গায়ে মেখে আর একটি প্রভাতের অপেক্ষায় নিশ্চুপ হয়ে আছে। পাহাড়ের গায়ে বিন্দু বিন্দু আলো ফুটে উঠেছে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মানুষেরা বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হল। দিনযাপনের ক্লান্তি ওদের সর্বাঙ্গে। দূর আকাশ থেকে এসবই দেখলাম। কি যেন ঘটে গেল আমার ভেতরে। ওই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবকুলের তুলনায় আমি কত বড়। অসীম আমার দেহাবয়ব, অফুরন্ত আমার আলোর ভাণ্ডার, আমার সামান্য অগ্নি উদ্গিরণে ধ্বংস হতে পারে এমন দু-দশটা জগত। তবু, কী আশ্চর্য, আমি কেমন যেন হেরে গেলাম। ওই অন্ধকার আকাশের নীচে, চাঁদটাও যখন মায়াবী হয়ে উঠেছে, ওই পাহাড়ের গায়ে, ওই ক্ষুদ্র কুটিরে, ওই দুধের শিশুটিকে জড়িয়ে নিশিযাপনের নেশা আমায় পেয়ে বসল। একটুকরো ভালোবাসা পাবার জন্য আমার তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে রিণিরিণি স্পন্দন শুরু হল। সামান্যর কাছে আমি অসামান্য পরাভূত হলাম। সেই থেকেই আমি উন্মনা, আমার সহস্র কোটি বছরের পরমায়ু আমার কাছে আজ মূল্যহীন। নক্ষত্ররাজ ভীমকেতু অবাক বিস্ময়ে সব কিছুই শুনলেন। শুনতে শুনতে তাঁর চক্ষু বিস্ফারিত হল। আনন আনত হল। বুকের গভীরে একটা শূন্যস্থান তিনি স্পষ্ট টের পেলেন। দুই চোখের দৃষ্টি অনন্ত অম্বরে প্রসারিত করে তিনি ভাবতে বসলেন। কী যে ভেবে চললেন, তিনি নিজেই জানেন না।
সামান্য অসামান্য - প্রবাল মুখোপাধ্যায়
প্রবাল মুখোপাধ্যায়
কদমতলা, হাওড়া,পশ্চিমবঙ্গ,ভারতবর্ষ 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

১৬ মে ২০২২

এক মুঠো পয়সা | প্রত্যুষ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়