পরিবার | সোনালী মুখোপাধ্যায়
গল্পনাটক......
"পরিবার "
সোনালী মুখোপাধ্যায়
চরিত্র নিভাননী দেবী,(৭৫) মেজো ছেলে অর্পণ , ছোটো ছেলে অর্ঘ্য , বড় বউ মালিনী ,মেজ বউ সুদেশা, সদ্য বিয়ে হওয়া ছোট বউ পর্ণা ,নিভাননী দেবীর নাতি চোদ্দ বছরের পল্টু, নাতনি পাঁচ বছরের মনি।আর বাড়ির চাকর পঞ্চু (৬০) কাজের মেয়ে বিন্দু , তার ছোট তিন বছরের মেয়ে বিন্তি।
দৃশ্য ১
আজ মুখার্জী বাড়িতে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। একান্নবর্তী পরিবারে এইসবে দুর্গাপুজো গেল ।বাড়িতে লোকে লোকারণ্য সকলে লক্ষ্মীপূজো সেরেই বাড়ি ফেরে প্রত্যেক বছর। সেই পুজো উপলক্ষেই বাড়িতে আজ হুলুস্থুল কাণ্ড। এবং এই বাড়ির সর্বময় কর্তী নিভাননী দেবী।
বারান্দার সংলগ্ন একটা চেয়ারে নিভাননী দেবী বসে বসে সবার কাজ তদারকি করছেন এমন সময় বাড়ির সবসময়ের কাজের লোক পঞ্চু বাজার থেকে ফিরল, হাতে ব্যাগ।
এই হতভাগা দেখি এদিকে আয় ,,
(পঞ্চু এগিয়ে আসে ব্যাগটা হাত থেকে নিয়ে)
বলি পান-সুপারি এনেছিস তো?
আজ্ঞে কর্তা মা স্যান বুড়িকে বলে এসেছি।
উফ.... এ তো আবার আন শুনতে ধান শুনছে...
বেগুন আনতে বলেছিলেন?
(রেগে গিয়ে) তুই কি কানের মাথা খেয়েছিস?
মাছের মাথা ?কে বলল আনতে? আজকে?
বড় ছেলের ছেলে পল্টু ছুটে এসে পঞ্চুর কানের মেশিনটা কানে ঠিক করে লাগিয়ে দেয়। বলে দাদু এটা ঠিক করে কানে লাগিয়ে রাখো। তোমায় পান সুপুরি বলছে ঠাম্মা।
অ.. এটা খুলে গেছিলো বুঝি? বলে পঞ্চু ওখান থেকে পালিয়ে বাঁচে।
পল্টু ও হাসতে হাসতে চলে যায়।
ওদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিভাননি দেবী দেখেন বারান্দার এক কোণে ঠাকুরের সামনে বসে বড়ো ঝোড়ার এক ঝোড়া ফল কাটছে সদ্য বিয়ে হয়ে আসা পর্না।
কি গো ছোট বউ? বেলা কাবার করে দেবে নাকি মা ? ওই চারটে ফল কাটতে?
না মা এইতো হয়ে এসেছে...
নাও নাও হাত চালাও দেখি?আমি যেদিকটা না দেখবো সেদিকটাই তো হবে না।
এ কথা বলতে বলতে মেজ বউ এর মেয়ে মনি ছুটে এসে পিছন থেকে কাকিমার গলা জড়িয়ে ধরে.. তাই দেখে নিভাননী দেবী চেঁচিয়ে উঠলেন...
দেখো দেখো দেখো একবার... সব ছুঁয়ে নেপে একসা করে দিলে গা? হ্যালা মেজো বৌ? বলি মেয়েটার বাসি জামা ছাড়িয়েছ? নাহ আমি আর পারব না এভাবে সব দিক দেখা আমার পক্ষে সম্ভব?
এদিকে দেখো আরেকজনের এখনও পাত্তা নেই, কখন এসে কাজগুলো সারবে? আজ বাড়িতে একটা পুজো কোন হেলদোল নেই? সবকটাকে তাড়াবো।
বলতে বলতে বিন্দুর প্রবেশ সঙ্গে ছোট তিন বছরের মেয়ে বিন্তি।
এইযে মহারানী এলেন, বলি বিন্দু তোর কি কোনো আক্কেল বিবেচনা নেই? কটা বাজে? কখন বাসি পাঠ হবে? আর আজ সঙ্গে একে এনেছিস? তুই জানিস না আজ কত কাজ?
চিন্তা করুনি গো কত্তা মা, বিন্তি এক কোণে বসে থাকবে, আজ বাড়িতে ওর বাপ নেই তাই সঙ্গে আন্নু।
ঠিক আছে ঠিক আছে যা যা কাজ শুরু কর।
উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে দেখতে পেলেন তার মেজ ছেলে অর্পণ এবং ছোট ছেলে অর্ঘ্য দুজনে অফিস বেরোচ্ছে। দুজনেই একসাথে নিভাননী দেবীকে প্রণাম করে।
থাক থাক বাবা , দীর্ঘায়ু হও। হ্যাঁরে আজকেও তোদের বেরোতে হবে? বচ্ছরকার পুজোর দিনেও তোদের ছুটি নেই?
অর্পণ.... না মা আমরা সরকারি কর্মচারী ,আমাদের কি আর সব ছুটি থাকে? তুমি চিন্তা কোরোনা । আজ তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।
অর্ঘ্য। আর তাছাড়া দাদাতো রইল মা ।কিছু দরকার হলে দাদাই করে দেবে, আমরা তাহলে আসি।
হ্যাঁ এসো , সাবধানে যেও ।দুগ্গা দুগ্গা বলে দুই হাত করজোড়ে মাথায় ঠেকালেন নিভাননী দেবী। এরপর রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
দৃশ্য ২
রান্নাঘর। একদিকে বড় বউ মেজ বউ ঠাকুরের ভোগ রান্নায় ব্যস্ত । পঞ্চু জোগাড়ে।
রান্না ঘরের সামনের চেয়ারে এসে বসেন নিভাননী দেবী।
পঞ্চু আমার পানের ডিপে টা নিয়ে আয় তো?
আজ্ঞে কর্তা মা সবুজ ফিতে কোথায় পাব এখন ?আর কি হবে সবুজ ফিতে দিয়ে?
নিভাননী দেবী কটমট করে চেয়ে থাকেন পঞ্চুর দিকে,বড়বৌ মালিনী এসে কানে পঞ্চুর মেশিনটা ঠিক করে দেয়। আর পানের ডিব্বা আনতে বলে। পঞ্চু চলে যায়।
মেজো বৌমা মেজ খোকা ছোট খোকা কি খেয়ে গেল?
মা ওরা দই ছিঁড়ে খেয়ে গেছে।
আচ্ছা ঠিক আছে ।বলি সব কাজ তোমরা করো কিন্তু নিজেদের সোয়ামির দিকেও নজর দিও বুঝলে ? ওদের যেন কোন অসুবিধা না হয় খাওয়া দাওয়ার । বাড়িতে এত লোকজন সেইজন্য বলছি আর আমার নাতি নাতনীদের খেয়াল টাও রেখো।
বড়বৌ...... হ্যাঁ মা আপনি চিন্তা করবেন না ।আমরা সব দেখে রাখব ,আপনি তো সেই ভাবেই আমাদের তৈরি করেছেন।
তা তোমাদের রান্না কি এখনো হয়নি বাছা? এক্ষুনি তো বাউন এসে পড়বে।
মেজোবৌ হ্যাঁ হয়ে গেছে মা। সব ঠাকুরের কাছে দিয়ে এসেছি, শুধু পায়েস টা নিয়ে যাচ্ছি।
আচ্ছা ঠিক আছে আমি ঘরে যাচ্ছি বাউন এলে আমায় ডেকো।
দৃশ্য ৩
পুজোর স্থান ।পুরুত ঠাকুর এসে পুজোয় বসেছে।
ছোট বৌমা সমস্ত ঠাকুরের ভোগ ফল চাপা দেওয়া ছিল কলাপাতায় করে সেগুলো খুলে দিচ্ছে ঠাকুরের সামনে।হঠাৎ দেখে পায়েসের বাটিটা নেই ঠাকুরের কাছে। ওটা তো সবার সামনেই ছিল।কোথায় গেলো? পর্ণা চিৎকার করে ওর দুই জা মালিনী আর সুদেশা কে ডাকলো।
বরদিভাই মেজদিভাই একবার এদিকে এসো তাড়াতাড়ি।
দুজনে দৌড়ে আসে
মালিনী.... হ্যাঁ বল কি হয়েছে?
বরদি ভাই পায়েস কই? এখানেই তো ছিল খুঁজে পাচ্ছিনা।
সুদেশা....... সেকিরে পায়েস কোথায় যাবে ?এইমাত্র আমি রেখে গেছি একটু আগে..
খুঁজতেখুঁজতে পর্নার হঠাৎ চোখ পড়ে বাইরের দিকে।
আর্তনাদ করে ওঠে পর্ণা... সর্বনাশ
বাকিরাও ওই মুহূর্তে বাইরে তাকায় দেখে পায়েসের বাটি নিয়ে মহানন্দে বিন্তি তার ছোট্ট ছোট্ট দুই হাতে পায়েস তুলে তুলে খাচ্ছে।
কি হবে এবার? তিন বউয়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়..তাদের শাশুড়ি মায়ের কথা ভেবে,
বিন্তির মা বিন্দুও সেই মুহূর্তে এসে যায়। সব বুঝতে পেরে লজ্জায় ভয়ে সিটিয়ে যায়। রাগে মেয়েকে দুমদাম পেটাতে থাকে।
এমন সময় পিছন থেকে নিভাননী দেবী গলার আওয়াজ শুনতে পায় ওরা।
কি হয়েছে টাকি ওখানে? সবাই মিলে একসাথে ওখানে কি করছ? বলি বাউন এসে গেছে আমাকে একবার ডাকার প্রয়োজন মনে করোনি?
বলতে বলতে নিভাননী দেবী সামনে চলে আসেন এবং এসে বিন্তি কে দেখে খানিক চুপচাপ হয়ে গেলেন সকলে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে আছে কি হবে এবার?
এমন সময় নিভাননী দেবী হঠাৎ বলে উঠলেন
বৌমা রা তোমরা সবাই মায়ের কাছে যাও। পুজো শুরু হয়ে গেছে। আজ মৃন্ময়ী মাকে পায়েস ছাড়াই ভোগ দাও । মা তো চিন্ময়ী রূপে বিন্তির মধ্যে দিয়েই নিজের পায়েস টুকু খেয়ে নিলেন। আমি তো দেখলাম । সকলে দেখলো নিভাননী দেবীর চোখে জল।
যে মানুষটা সারাদিন ছোঁয়া ছুঁই পরিষ্কার , জাত পাত নিয়ে ব্যস্ত থাকে সেই মানুষটার মুখে এমন কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে যায়।
নিভাননী দেবী আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে বিন্তি কে দুহাতে জড়িয়ে ধরেন। তার দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে জলের ধারা।
পাশের বাড়ি থেকে ঠিক সেই মুহূর্তে বেজে উঠল কাঁসর ঘন্টা উলুধ্বনি।।
আস্তে আস্তে পর্দা পড়ল।।
![]() |
সোনালী মুখোপাধ্যায় |


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন