বসন্ত প্রভাতে | গৌতম নায়েক
বসন্ত প্রভাতে
গৌতম নায়েক
সূর্যটা তখনও ওঠেনি। তিয়াস এসে বসলো তাদের বাগানের সামনের বারান্দায়। এক ঝলক দখিনা বাতাস এসে চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে গেল। সৌমেন তাকে বলতো, "এলো চুলেই তোমাকে বেশি সুন্দরী দেখায়।" ঘাড়ের উপর আলতো খোঁপা আর ফর্সা গালের দু'পাশে চুলের লকস্ দেখে সৌমেন তার থেকে চোখ ফেরাতেই পারতো না। পারবেই বা কি করে? তিয়াসের স্লিম ফিগার, উন্নত বক্ষ ও নিতম্ব যুগল, ফর্সা খোলা পিঠের উপর একরাশ রেশমি কালো চুল, টোল পরা গালের হাসি আর বড়ো বড়ো চোখ যে কোন পুরুষকেই ঘায়েল করার জন্য যথেষ্ট।
ঝরা পাতার সর্ সর্ শব্দে তিয়াসের কল্পনায় ছেদ পড়লো। বারান্দার পাশেই ফুটে থাকা বড়ো লাল গোলাপের উপর শিশির কণা যেন হীরের মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে। এক গোছা রজনীগন্ধার মিষ্টি গন্ধ তার অবশ মনটাকে যেন মন কেমনের দেশে নিয়ে গিয়ে হাজির করলো। তাদের বাগানেরই কোন একটা কোনে একটি কোকিল মিষ্টি করে সুরেলা কন্ঠে ডেকে চলেছে অবিরাম। যে কোকিলের ডাক এক সময় তিয়াসের মনটাকে রোমাঞ্চিত করতো, সুনামির মতো ওলটপালট করে দিত যুবতী হৃদয়টাকে, সেই কোকিলের ডাক আজ আর তার ভালো লাগে না। মনে হয়, ঐ কোকিলটাও তার প্রেয়সীকে ডাকছে।আর তারপর আপন স্বার্থ চরিতার্থ হলেই সৌমেনের মতোই সেও চলে যাবে অন্য কারোর খোঁজে। সব পুরুষই এক!
চোখের কোনটা চিক্ চিক্ করে উঠলো তার। মনে হলো, আজকের তিয়াস আর সেদিনের তিয়াসের মধ্যে কত ফারাক। আজকের তিয়াস গতিহীন স্পন্দনহীন একটা ছোট্ট আবদ্ধ জলাশয়ের মতো। শুধুমাত্র ঝড় ঝঞ্ঝায় সামান্য স্পন্দিত হয়। আজকের তিয়াস বহু পুরাতন নোটের মতো ম্যাড়মেড়ে, শুধু ছিঁড়ে যাওয়ার অপেক্ষায়।
বেশিদিন আগের কথা তো নয়, মাত্র দু'বছর আগে এই তিয়াসই ছিল একটা চলমান জীবন্ত বসন্ত।। যে কোন যুবকের হার্টথ্রব। তন্বী তিয়াস পলাশ শিমুলের মতোই তাদের হৃদয়ে আগুন ছড়াতো। সারা বছর তার মনের কুঞ্জবনে কোকিল গাইতো গান। তিয়াসের ঝর্ণার মতো গতিতে চোখ আটকে যেত সব্বার। সে ছিল হরিণীর মতো চঞ্চলা প্রাণ স্পন্দনে ভরপুর।
তখন সে শান্তিনিকেতনে মাস্টার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্রী।চৈতি দিনে বসন্ত উৎসবের সময় শান্তিনিকেতন প্রাঙ্গণ গমগম করছে। অন্যান্য মেয়েদের সাথে লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে তিয়াসও আবীরের রেকাবি হাতে,
"ওরে গৃহবাসি.....
খোল দ্বার খোল, লাগলো যে দোল...."
গানের তালে তালে মৃদু হাসি মুখে নৃত্যে মগ্ন। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, লাল আবীর মাখা গালে তাকেই মনে হচ্ছে একটা আস্ত গোলাপ। নৃত্যের তালে তালে খোলা চুল এদিক ওদিক দুলছে। দেখে মনে হয় কোন অপ্সরা যেন নেমে এসেছে স্বর্গ থেকে।
অন্যমনস্ক ভাবেই তিয়াসের চোখ যায় অনতিদূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছেলের দিকে। ছেলেটি অপলক দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখ নামিয়ে নেয় তিয়াস। কেমন যেন লজ্জা করছে।
লম্বা চওড়া বেশ সুদর্শন ছেলেটি। কোন প্রস্তর শিল্পী যেন একটু একটু করে অতি যত্নে কুঁদে কুঁদে তৈরী করেছে তার চুল, কপাল, ভ্রু, চোখ, নাক, ঠোঁট। কিন্তু তিয়াসের এ কি হলো? তার লজ্জা করছে কেন? এর আগে তো বহু ছেলে তাকে প্রোপোজ করেছে। সে সেসব ছেলেকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। কই এরকম অনুভূতি তো কখনও হয়নি। তার বুকের মধ্যে যেন হাপর পড়ছে। শ্বাস চলছে খুব দ্রুত। লজ্জায় আর তাকাতে পারে না।
তিয়াস ছেলেটির দিকে আড় চোখে কয়েকবার তাকায়, কিন্তু চোখ নামিয়ে নেয় পরক্ষণেই। ছেলেটি তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
সেদিন সন্ধ্যায় তিয়াসের বন্ধুরা ঠিক করে রেঁস্তোরায় খাওয়া দাওয়া করবে। তিয়াসরা যে রেঁস্তোরায় ওঠে ছেলেটিও তার বন্ধুদের সাথে ঘটনাক্রমে সেখানেই উপস্থিত ছিল। তিয়াস একটি চেয়ারে বসতেই ছেলেটি তার দিকে এগিয়ে আসে এবং তার অনুমতি নিয়ে পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ে।
---- আপনি তিয়াস তো? মাস্টার্সে ফার্স্ট ইয়ার?
তিয়াস অবাক হয়ে বললো, "আপনি জানলেন কি করে?"
----আরে যাকে ভালো লেগেছে, যাকে লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট বলা যায়, তার সম্পর্কে কিছু জানবো না, তাও কি হয়?
তিয়াস কপট রাগ দেখিয়ে বলে, "কি যা তা বলছেন? কেউ কাউকে জানি না চিনি না...."
----জেনে নিতে কতক্ষণ, বলুন তো? আমি সৌমেন সরকার। বাড়ি মালদার গাজোল ব্লকে। আমি একজন সরকারি চাকুরে। বাড়িতে বাবা মা ছাড়া আর কেউ নেই।
তিয়াস মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিল কথাগুলো। কি যেন এক অদ্ভুত আকর্ষণ আছে ছেলেটির মধ্যে।
পরিচয়, পরিচয় থেকে ঘনিষ্টতা। তিয়াস তাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে নির্ভর করতে শুরু করে। তার প্রেম পেয়ালার তলানিটুকুও নির্দ্বিধায় উজাড় করে দেয় সৌমেনকে।
দিন পাঁচেক প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায় তিয়াস সৌমেনের সাথে। অবশেষে সৌমেন তাকে বলে, " আমার ছুটি শেষ। এবার আমায় ফিরতে হবে। তবে ভেবো না আমার বাবা মাকে সঙ্গে নিয়েই আসবো একেবারে তোমার বাবা মা'র কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।"
পরদিন সকালে তিয়াস তাকে চোখের জলে বিদায় জানাই। সৌমেন শপথ করে একসাথে পথ চলার। যতক্ষণ ট্রেনটা দেখা যায় দাঁড়িয়ে ছিল তিয়াস।
সৌমেন চলে গেল। সাথে নিয়ে গেল তিয়াসের সকল বাসন্তী রূপ রঙ, আর তাকে ফেলে গেল ব্যবহার হয়ে যাওয়া চায়ের ভাঁড়ের মতো।
আজিকার এ বসন্ত প্রভাতে অশ্রু ভেজা চোখে বহুদিন পর তিয়াস গুনগুনিয়ে ওঠে --
"বসন্ত কেন ফিরে আসে বারবার?
চোখে কেন অসময়ে শাওন ধারা?
বিশ্বাসের কোন মূল্য নেই কোথাও
কেন আমি হলেম ফাগুন হারা?
ওগো ফুল তুমি ফুটো না গো আর
কোকিল তুমি ডেকো না কুহু স্বরে,
কষ্ট রাখার ঠাঁই নেই গো আর
প্রিয়রে আমার শুধুই মনে পড়ে।
প্রতারণা সে করুক যত আমায়
আমি তো তাকে দিয়েছিলেম ধরা,
ভালো আমি বেসেই যাবো তাকে
হোক না আমার জীবন গতি হারা।"

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন