ঠাকুর মশাই নিয়োগ | শুভব্রত ব্যানার্জি | প্রথম দৃশ্য

ঠাকুর মশাই নিয়োগ

শুভব্রত ব্যানার্জি 

প্রথম দৃশ্য




রমেন চেয়ারের ওপরে পা তুলে ঠ্যাং নরাচ্ছে আর গান গাইছে। সেখানে এসে উপস্থিত হয় রমেনের স্ত্রী শ্রীলেখা। রমেনকে দেখে বলে-


শ্রীলেখা-

কি গো আজ বেরনো নেই বুঝি? 


রমেন-

কোথায় যাবো? এই ভরা চৈত্র মাসে না আছে বিয়ে, বৌভাত, পৈতে। এমন কি একটা পারলৌকিক ক্রিয়ার কাজও আসছে না। 


শ্রীলেখা-

তাই বলছি, সংসারের যা হাল, এবার অন্য কিছু একটা ব্যবস্থা না করলেই নয়। বলি একটা চাকরি করো। না খেয়ে মরতে হবে না। 


রমেন-

চাকরি, সরি গিন্নী। ওটা আমার দ্বারা হবে না। ওই দশটা পাঁচটা ডিউটি, বাসে ট্রেনে বাদুড় ঝোলা হয়ে অফিস যাওয়া, পাঁচ লোকের পাঁচ কথা শুনে চলা, গাধার খাটনি খেটে জীবন পাত করা, ইমপসিবিল। তার চেয়ে ঘণ্টি নাড়িয়ে যা আয় হয়, তাতেই সুখে আছি।


শ্রীলেখা-

(খুব রেগে বললে) তা ঘরের চালটা আসবে কোথা থেকে। 


রমেন-

আমি আছি তো। কোন টেনশন নিও না। ঠিক ব্যবস্থা করে নেবো।


দ্বিতীয় দৃশ্য


চাটুজ্যে বাবু -

রমেন, বাড়ি আছো না কি?


রমেন -

আরে চাটুজ্যে মশাই যে। আসতে আজ্ঞা হোক।


রমেন চাটুজ্যে মশাইকে বসালেন ঘরের দাওয়ায়।


চাটুজ্যে বাবু-

শুনেছ তো, আমাদের রাম কিংকর বাবু গতকাল দেহ রেখেছেন।


রমেন-

তাই নাকি। গতকাল হরিধ্বনি কানে এসেছিল বটে, তবে বিশেষ গুরুত্ব দিই নি। রাম ঠাকুর খুব স্বত্তিক ব্রাহ্মণ ছিলেন। 


চাটুজ্যে বাবু-

হ্যা ঠিকই বলেছ। তবে একটা জরুরী খবর দিতে তোমার কাছে এলাম। 


রমেন-

হ্যা বলুন।


চাটুজ্যে বাবু-

রাম ঠাকুর ছিলেন ওই মণ্ডল পাড়ার কালী মন্দিরের মাইনে করা পুরোহিত। ওই মন্দিরে পুজোর কাজ চালিয়ে যাবার জন্যে আমাকে ডেকেছে। আসল কথা হলো, আমরও বয়স হয়েছে, ওই দূরে গিয়ে দুবেলা দেবী সেবা আমার পক্ষে বেশ কষ্টকর। তাই চূড়ান্ত কথা বলার জন্য এবং এই ভার তোমাকে দেবার জন্য আমি তোমাকে নিয়ে যেতে চাই।


রমেন-

আবার চাকরী। নিয়ম করে যাওয়া আসা।


চাটুজ্যে বাবু-

আরে বাবা, রামকৃষ্ণ দেব ও তো দক্ষিণেশ্বরে চাকরি করতেন। তিনি পারলেন আর তুমি পারবে না।


রমেন-

হাজার হলেও তিনি ছিলেন অবতার। আর আমি সাধারণ এক জীব।


তৃতীয় দৃশ্য


মণ্ডল গিন্নী, চাটুজ্যে বাবু, রমেন, কাজের লোক


চাটুজ্যে বাবু-

গিন্নী মা। ও গিন্নী মা।


কাজের লোক-

কাকে চাই? 


চাটুজ্যে বাবু-

আজ গিন্নী মা আমাকে আসতে বলেছিলেন। আমি হলাম ন পাড়ার হরিহর চাটুজ্যে। আপনাদের ওই কালী মন্দিরের পুজোর জন্য নতুন লোক নিয়োগ করবে বলে আমাকে বলা হয়েছিল। তাই এসেছি গিন্নীমার সাথে দেখা করতে।


কাজের লোক-

আপনি বসুন। আমি অন্দরে খবর দিচ্ছি।


মণ্ডল গিন্নী-

আর খবর দিতে হবে না। আমি এসে গিয়েছি। ঠাকুর মশাইদের জন্য জলযোগের ব্যবস্থা করো।


চাটুজ্যে বাবু-

ব্যস্ত হতে হবে না বেশি। আমরা অল্পতেই তুষ্ট। 


মণ্ডল গিন্নী-

তাই বললে হয়। (পায়ে হাত দিয়ে ব্রাহ্মণ দ্বয়কে প্রণাম করে নিজের আসনে বসে) বলুন কি ব্যাপারে আপনাদের আগমন।


চাটুজ্যে বাবু-

আপনাদের মায়ের মন্দিরের রাম ঠাকুর মশাইয়ের অকাল মৃত্যুর পর আমাকে বলে পাঠানো হয়েছিল আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্যে। কারণ জানতে চাইলে জেনেছিলাম, আপনাদের রাম ঠাকুরের স্থানে নতুন পুরোহিত নিয়োগের ব্যাপারে। আমি ন পাড়ার হরিহর চাটুজ্যে।


মণ্ডল গিন্নী-

আচ্ছা। রাম ঠাকুর মশাই আপনাকে দায়িত্ব দেবার কথা বলে গিয়েছিলেন। তাই আপনাকে কষ্ট দিতে হলো আমকে।


চাটুজ্যে বাবু-

গিন্নী মা। আমাকে রাম দা খুব স্নেহ করতেন। তাই আমার কথা তিনি বলে গিয়েছেন। কিন্তু আমার শরীরও তেমন সুস্থ নয় । তাই আমি এই যুবকটির হাতে এই দায়িত্ব দেবার অনুরোধ রাখি।


মণ্ডল গিন্নী-

ছেলেটির বয়স অতীব অল্প। 


চাটুজ্যে বাবু-

আমার হাতে গড়া ছেলে। ভালো গান গায় আমাদের রমেন। তাই মায়ের কোন ত্রুটি হবে না বা সেবায় কোন রকম ফাঁক থাকবে না, এটা আমি দীপ্ত ভাবে বলতে পারি। 


মণ্ডল গিন্নী-

বাবা, বাড়িতে কে কে আছেন?


রমেন-

আমার স্ত্রী আর আমি। বাবা মা দীর্ঘকাল হয়েছে আমাদের ছেড়ে গিয়েছেন। আমি একাই ছেলে। একটি অনাথ মেয়ের পাণি গ্রহণ করে জীবন সঙ্গী করেছি। পৌরহিত্য আমাদের পারিবারিক পেশা। কলেজে  বিজ্ঞান নিয়ে পাশ করেও আমার চাকরী জোটে নি। তাই আপনার মন্দিরের সেবা করার কাজটা আমি পেলে কৃতজ্ঞ হবো।


মণ্ডল গিন্নী-

তুমি বাবা আজ থেকেই কাজে লাগো। আর তুমি যখন  এতটাই লেখাপড়া জানো আমি তোমাকে আরো একটা গুরু দায়িত্ব দেবো।


রমেন-

কি দায়িত্ব গিন্নী মা।


মণ্ডল গিন্নী-

গিন্নী মা নয়। শুধু মা বলবে। তোমাকে আমার বাড়ির সকল ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার ভার নিতে হবে। আজীবন।


চতুর্থ দৃশ্য

রমেন-

তাহলে একটা পাকা ব্যবস্থা হলো।


শ্রীলেখা-

খুব বড় লোক ওরা। তাই না।


রমেন-

বড় লোক কি না জানি না। তবে বড় মনের মানুষ। নইলে আমাকে দেখেই বলে, আমি যেন ওনাকে মা বলে ডাকি। এর চেয়ে আর কি ভালো হতে পারে।


শ্রীলেখা-

কতো মাইনে দেবে?


রমেন-

অতো জিজ্ঞেস করি নি। তবে মোটা অঙ্কের দেবে বলেই ধারণা। এক দিকে পুজো। আবার অন্য দিকে ওই বাড়ির সকলের লেখাপড়ার দায়িত্ব।


শ্রীলেখা-

যাক, ঠাকুর মুখ তুলে চেয়েছে।


পঞ্চম দৃশ্য

রমেন পুজো করছে। আরতির সময় মায়ের গান করে ঠাকুরমশাই। অনেকে ওনাকে রামকেষ্ট বলে ডাকতে শুরু করেছে। একদিন গিন্নীমা রমেনের গান শুনে বিভোর হয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়।


রমেন-

মা। কি হয়েছে। ওঠো।


মণ্ডল গিন্নী-

তোমার গানে যাদু আছে। সত্যি তুমি ছোট ঠাকুর আমাদের পুজোর মন্দিরের।


রমেন-

সব ঠাকুরের আশীর্বাদ। তিনি আছেন বলেই তো আমরা আছি এই জগৎ সংসারে।


আসতে আসতে  মণ্ডল গিন্নী উঠে দাঁড়ায়।

মণ্ডল গিন্নী-

তুমি আছো বলেই আমাদের মা সেবা পায়। বাড়ির ছেলেমেয়েরা ভালো মনের শিক্ষক পেয়েছে। আর আমি পেয়েছি আমার হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে।


রমেন-

বুঝলাম না ঠিক।


মণ্ডল গিন্নী-

আমার নিজের ছেলে যদি বেঁচে  থাকলে, তোমারই বয়সের হতো। তাই তোমাকে দেখে আমার তার কথা মনে হয়েছে। সেই জন্যই আমি তোমাকে মা বলে ডাকার অনুমতি দিয়েছি। আজ থেকে তুমি তোমার  স্ংসার নিয়ে এই বাড়িতেই থাকবে।


লেখক শুভব্রত ব্যানার্জি 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

১৬ মে ২০২২

এক মুঠো পয়সা | প্রত্যুষ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়