গল্পের নাম:- "মানবতা"/লেখিকার নাম:- সোনালী মুখোপাধ্যায়
গল্পের নাম:- "মানবতা"
লেখিকার নাম:- সোনালী মুখোপাধ্যায়
এই যাহ ...এখান থেকে যাহ...আ মোলো যা ...আমার নিজেরই খাবার সংস্থান নেই ..লোকের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে এনে যাহোক করে নিজের পেট চালাচ্ছি? আর ইনি এলেন আমার সংগের সাথী হয়ে। এখান থেকে যাবি বলছি ...যা..... বলে ছোট গ্লাসের এক গ্লাস জল নিয়ে ছোট্ট কুকুর টার দিকে ছুঁড়ে দিলেন মায়া দেবী।
এই গ্রামে তার নিজস্ব বাড়ি হলেও সেই বাড়ির এক চিলতে ছোট্ট বারান্দার কোণে তার থাকার ব্যবস্থা। ছেলে বউ নাতি-নাতনি সকলেই আছে তার ,কিন্তু তাদের সাথে ওর থাকার অধিকার নেই। আসলে ও যে এ বাড়ির একজন সদস্য সেটা তার ছেলে বউ ভুলে গেছে বোধয়। তাই সকাল বিকালের বরাদ্দ খাবারটুকু শুধু জোটে ওর ভাগ্যে । তাও অনেক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা র পরিবর্তে।বাকি সময় পাড়ার নানান বাড়িতে ঘুরে ঘুরে নিজের চা টা বা আনুষঙ্গিক খাবার চাহিদা মেটান মায়াদেবী। সবাই তার বাড়ির অবস্থা জানে বলেই এখনো কিছু দেয়।
এতদিন একরকম চলছিল কিন্তু এখন এই করোনার উপদ্রবে মায়াবতী খুব অসুবিধার মধ্যে পড়েছে। ছেলে তার বউ বাচ্চা নিয়ে নিজের কর্মস্থলে চলে গেছে, কারণ এই গ্রাম থেকে যাতায়াত করা এখন সম্ভব নয়। ভুলেও মায়ের কথা তার একবারও মনে পড়েনি । তাই এখন মায়াবতীকে নিজের খাবার নিজেই জোগাড় করে নিতে হচ্ছে এর ওর বাড়ি থেকে চেয়ে চিন্তে। তার মধ্যে আবার এই উৎপাত। কোথা থেকে একটা ছোট কুকুর তার সঙ্গ নিয়েছে ।কিছুতেই যাচ্ছে না। তাড়িয়ে দিলেও বাইরে বসে আছে ।ওকে দেখলেই লেজ নাড়ছে ,কি করবে ও? আজ ঘোষ বাড়ি থেকে তিনটে বাসি রুটি চেয়ে নিয়ে এসেছে। দুপুরটা রাত্রিটা হয়ে যাবে যা হোক করে কিন্তু. ..
যাইহোক সন্ধ্যে বেলা খেতে বসে আধখানা রুটি ছিঁড়ে কুকুরটার দিকে ছুঁড়ে দিলেন মায়া দেবী । সঙ্গে উঠে গিয়ে একটা মালার খোলায় একটু জল ও দিলেন। ওমা... রুটিটা খেয়ে জলটা খেয়ে বারান্দার এক কোণে চুপচাপ শুয়ে পরলো কুকুর টা। মায়াদেবী আর কিছু বললেন না ,ভাবলেন আহা ...থাক... এত তাড়াবার চেষ্টা করলাম গেল না ...এখানেই থাক বরং... আমারও একজন সঙ্গী হলো।এইসব মনে ভেবে তিনি নিজের বিছানায় শুয়ে পড়লেন।
সকালে উঠে তিনি দেখলেন কুকুরটা ওখানেই বসে আছে। কি মনে হতে তিনি ওকে আয় আয় করে কাছে ডাকলেন। কুকুরটা ও আস্তে আস্তে ওর দিকে এগিয়ে এলো, উনি ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন । কুকুরটা আবেশে চোখ বুজলো। তিনি বললেন আজ থেকে তোর নাম রাখলাম ভালোবাসা, তুই আমার ভালোবাসা।
ও কি বুঝলো কে জানে? শুধু মাথাটা মায়াদেবী কোলের ওপর এলিয়ে দিল।
এরপর থেকে ভালোবাসা মায়াদেবীর ছায়াসঙ্গী হয়ে গেল। মায়া আর ভালোবাসা একসাথে জড়িয়ে গেল। পাড়ার লোকেরা ওদেরকে "মায়ার ভালোবাসা" বলে ডাকতে লাগলো।
এভাবে বেশ কিছুদিন চলার পর হঠাৎ করে সব জায়গায় করোনার প্রকোপে লকডাউন হয়ে গেল । সকলের বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ হয়ে গেল, মায়াদেবী যেসব বাড়িতে ঘুরে ঘুরে খাবার জোগাড় করতেন,যারা দুবেলা নিজেদের বাঁচা খাবারটা ওনাকে দিতেন ,তারা সকলে ওনাকে আসতে বারণ করে দিলেন । চারিদিকে যেভাবে করোনার ঝড় উঠেছে, তাতে মানুষ রীতিমতো ভয় পেয়ে গেছে। এই অবস্থায় মায়া দেবী মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন কি হবে এবার?
সারাদিন আজ কারও খাবার জোটে নি । ভালোবাসা মায়ার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। হয়তো ভাবছে তার মনিব তাকে এক্ষুনি খেতে দেবে? ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মায়া দেবী র চোখ ছল ছল করে ওঠে। শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি।
বেলা গড়িয়ে দুপুর হতে হঠাৎ তার ঘুমটা ভেঙে যায়। উঠেই তিনি ভালোবাসাকে খোঁজেন।নাহ্ ভালোবাসাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও। যে মায়াদেবীর ছায়া সঙ্গী , সে কোথায় যাবে মায়াদেবীকে ছেড়ে? মায়া দেবী তার অশক্ত শরীরে চারিদিক ভালো করে খুঁজে কোথাও না পেয়ে দাওয়ায় বসে পড়লেন। চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল বেরিয়ে এলো । মনে হল সত্যিই তো ওকে আমি যদি খেতে না দিতে পারি ,ও কি করে আমার কাছে থাকবে? যতই ভালোবাসো... হয়তো এখানে খাবার নেই তাই নিজের রাস্তা নিজে দেখেছে? আস্তে আস্তে নিজের জায়গায় শুয়ে পড়লেন তিনি।
ঠিক সন্ধ্যার মুখে হঠাৎ ভালোবাসার ভউ ভউ ডাকে ঘুম ভেঙে যায় মায়াদেবীর। ধড়ফড় করে উঠে বসেন তিনি।
দেখেন ওর মুখে একটা প্যাকেট।সেটাতে বেশ কিছু খাবার।বিস্কুট কেক মিষ্টি ডিম সিদ্ধ।এসব দেখে অবাক হয়ে যান তিনি। ভাবেন ভালোবাসা বোধয় চুরি করে এসব নিয়ে এসেছে। তবু খিদের চোটে দুজন এসব খাবার চেটেপুটে খেয়ে ফেলেন। তারপর ভালোবাসাকে বলেন কিরে?তুই এত খাবার কোথায় পেলি? কিন্তু ভালোবাসা তার ভালোবাসাটুকুই ছড়িয়ে দিয়ে নিজের জায়গায় শুয়ে পড়ে। আর মায়া দেবী তার কৌতুহল দমন করে নিজের বিছানায় বসে থাকেন।
তার পরেরদিনও ভালোবাসা ঠিক একই খাবার নিয়ে আসে। সেদিন মনে মনে ভাবেন মায়া দেবী এটা দেখতেই হবে কোথা থেকে ও খাবার আনছে? তাই সেদিনের খাবারটা খেয়ে নিয়ে পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করেন তিনি। পরের দিন বেলায় ভালোবাসা বেরিয়ে গেলে তার পিছন পিছন মায়াদেবীও বেরিয়ে যান। যেতে যেতে গ্রামের অনেকের সাথেই দেখা হয় ।সকলেই বলেন একটা সংস্থা খাবার ওষুধ বিলি করতে বেরিয়েছে। প্রত্যেকদিন গ্রামে এসে খাবার এবং সুচিকিৎসা ,এসবের বন্দোবস্ত করছেন। তাই যতদিন করোনা থাকবে ততদিন কোনো চিন্তা নেই, ওরাই এসে সব ব্যবস্থা করবে। মায়া দেবী আস্তে আস্তে সেই গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন, ওখানেই দেখতে পেলেন ভালোবাসাকে। সে দাঁড়িয়ে আছে সকলের সঙ্গে লাইনে, উনি অবাক হয়ে গেলেন যদিও গ্রামের প্রত্যেকেই ভালোবাসাকে চেনে। তবু একটা কুকুর লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নেওয়া সত্যিই অবাক করা দৃশ্য।
তবে আরো একটা জিনিস দেখলেন যারা গাড়িতে করে খাবার বিলি করছে তারা সকলেই ভালোবাসাকে চিনে গেছে খুব ভালো করে, আর ভালোবাসা যে তার জন্য খাবার নিয়ে যায় সেটাও ওরা জানে। হয়তো গ্রামের লোকেরা ই তাদের এই কথা জানিয়েছে। ওরা একটা কার্ড মায়াদেবী র দিকে এগিয়ে দিলো, বললো মাসিমা এই কার্ডটা সঙ্গে রাখুন। যদি কখনো অসুস্থ বোধ করেন এই কার্ডটা আমাদের দেখালেই আমরা তৎক্ষণাৎ তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবো। গ্রামের অনেক কেই আমরা এই কার্ড টি দিয়ে রেখেছি, আপনাকেও দিলাম ।মায়াদেবী কার্ডটা নিয়ে খুব খুশি মনে বাড়ি ফিরে এলেন ভালোবাসা কে সঙ্গে নিয়ে। খাবার চিন্তা তার দূর হলো, এতদিনে মনে মনে নিশ্চিন্ত হলেন, যাক ভগবানের দয়ায় আর ভালোবাসার ভালোবাসায় আরো কিছুদিন নিশ্চিন্তে বাঁচতে পারবেন তিনি।
এর দিন চারেক বাদে সকালবেলা যথারীতি ভালোবাসা খাবার নিয়ে আসার পর মায়া দেবী কিছুতেই বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছেন না ,শরীর ভীষণ দুর্বল লাগছে। কোন জোর পাচ্ছেন না ,সাথে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে ভীষণ। কি করবেন উনি? কেউ কোথাও নেই শুধু ভালোবাসা তার সামনে বসে আছে। ওকে খেতে না দিলে ও তো খেতেও পারবে না ।খুব কষ্টে মাথা তুলে প্যাকেট থেকে কিছু খাবার ভালোবাসাকে দিয়ে তিনি আবার শুয়ে পড়লেন ।একটু বাদে কোনরকমে চোখটা খুলে দেখেন ভালোবাসা তাকে মুখ দিয়ে নাড়া দিচ্ছে। তখন মায়াদেবীর কথা বলার শক্তি নেই । বালিশের তলা থেকে কোনরকমে কার্ড টা বার করে ভালোবাসার মুখে ধরিয়ে দিলেন। সেই কার্ডটা নিয়ে ভালোবাসা ছুটে চলে গেল। উনি সেটা দেখতে দেখতে অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
হসপিটালের প্রথম চোখ খুলেই উনি জিজ্ঞাসা করলেন ভালোবাসা কোথায় ?আমার ভালোবাসা?
দেখলেন চারিদিকে নার্স ডাক্তাররা ঘুরাঘুরি করছে আর ওই দুই তিনটি ছেলে যারা খাবার দিচ্ছিল তারাও আছে। ওরা বললো চিন্তা করবেন না মাসিমা, ভালোবাসা আমাদের কাছে ভালো আছে ।আমরা ওকে আপনার মতোই যত্নে রেখেছি।তাদের কথায় জানতে পারলেন ভালোবাসা ওই কার্ড টা নিয়ে সোজা ওদের কাছে গিয়ে পৌঁছেছিল এবং ওদেরকে রাস্তা দেখিয়ে বাড়িতেও নিয়ে এসেছে। এই কথা শুনতে শুনতে সেই মুহূর্তে চোখের পাশ দিয়ে জল পড়ে বালিশটা ভিজে যাচ্ছিল, মায়াদেবী ভগবানকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন ভালোবাসার মতন একজনকে তার কাছে এনে দেওয়ার জন্য। আরো দিন তিনেক বাদে সুস্থ হয়ে মায়াদেবী বাড়ি ফিরলেন । ওই ছেলেগুলি এবং ভালোবাসা নিঃস্বার্থ ভাবে তাকে বাঁচিয়ে তুললো এ যাত্রা।
এর পরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। তিনি একদিন গ্রামের গন্যমান্য ব্যাক্তিদের এবং ওই ছেলেগুলো কে ডাকলেন। সকলের কাছে তিনি ঘোষণা করলেন তার বাড়ি সমেত সমস্ত সম্পত্তি তিনি দান করতে চান ভালোবাসার মতন এমন কিছু পশুদের এবং তার মতন এমন মানুষদের বসবাসের জন্য। অবশ্য এটা খুব সাধারণভাবে হয়নি ,তার ছেলে অবশ্যই অনেক যুক্তি খাড়া করেছিল, অনেকভাবে আটকানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সম্পত্তি টা যেহেতু মায়াদেবী র নামে তাই তেমনভাবে কিছু করে উঠতে পারেনি মায়াদেবীর ছেলে। তাকে রণে ভঙ্গ দিতে হয়েছিল।ওই ছেলেগুলো আর গ্রামের মানুষেরা যথেষ্ট সাহায্য করেছিল, মায়াদেবী র পাশে দাঁড়িয়েছিল সকলে মিলে।
কোর্টে দাঁড়িয়ে মায়াদেবী আরেকটি আবেদন করেছিলেন । তিনি বলেছিলেন আমার খুব দুঃখ ছিল ধর্মাবতার যে আমি মরে গেলে আমার মুখাগ্নি করার জন্য হয়তো আমার ছেলে তখন এখানে থাকবে না, আজ আমি সকলের সামনে বলছি আমি মরে গেলে ভালোবাসাকে দিয়ে যেন আমার মুখাগ্নি টুকু করানো হয়। এটাই আমার একমাত্র ইচ্ছা। সেদিন কোর্টে দাঁড়ানো অনেক অনেক সন্তানের মাথা হয়তো নিচু হয়ে গিয়েছিল, একটা কুকুরের মানবতার কাছে হয়তো মানুষের মানবতা ঋণী হয়ে গিয়েছিল।
কোর্ট থেকে বেরিয়ে মায়াদেবী ভালোবাসা কে সঙ্গে নিয়ে ফিরে চললেন তার নতুন ঠিকানায় , তার নিজের বাড়ির নতুন নাম সংস্করণ "মায়ার ভালোবাসা " য় ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন