গল্প:- এম এল এ /লেখক :- প্রবাল মুখোপাধ্যায়

গল্প:- এম এল এ
লেখক :- প্রবাল মুখোপাধ্যায়

পটকা ফাটিয়ে, আবীরে মাখামাখি হয়ে, জনতার কাঁধে চড়ে তিনি বাড়ি ফিরলেন। গাড়ি  বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন স্ত্রী আর পাঁচ বছরের বুবাই। ধ্বনি উঠলো : জিতলো কে / অতীন কর আবার কে। আপনার আমার মনের মানুষ, প্রাণের মানুষ, কাছের মানুষ অতীনদা / জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ। 


বাড়ির ভেতর থেকে শঙ্খধ্বনি উঠলো, মেয়েরা উলু দিলো, ষাটোর্দ্ধ মা নীচে নেমে এসে প্রদীপ হাতে নিজে ছেলের কপালে এঁকে দিলেন জয়তিলক। বাবা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁর চোখে আনন্দাশ্রু।


এম এল এ সাহেব বাড়িতে প্রবেশ করে পিতামহ, প্রপিতামহর ছবিতে মাথা ঠেকালেন। পিতা-মাতার আশীর্বাদ নিলেন। গৃহদেবতার  প্রসাদ গ্রহণ করলেন। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে একটা বিজয়ীর হাসি হাসলেন। ছেলের গাল টিপে আদর করলেন। তখনই পার্টি অফিস থেকে এলো এক জরুরি কল, তিনি তড়িঘড়ি ওপরে উঠে গেলেন।


সেইরাত্রে বাড়িতে বসলো জমজমাট ডিনারের আসর। ঘনিষ্ঠ নিকটাত্মীয়রা সকলেই নিমন্ত্রিত। গিন্নিমা নিজে এসে রান্নায় হাত লাগিয়েছেন। বারোটি পদ প্রস্তুত, তার মধ্যে দুটি এম এল এ সাহেবের খুব পছন্দের - খাসির মাংসের দোপেঁয়াজি আর গাজরের হালুয়া। সকলেই আসন গ্রহণ করেছেন। এম এল এ সাহেব বসেছেন ঠিক মাঝের আসনটিতে, মধ্যমণি হয়ে। বুবাই বসেছে দাদুর পাশে। পাশের আসনটি ছাড়া আছে, ঠাকুমা বসবেন। কাকা কাকিমা, তাঁদের দুই ছেলেমেয়ে, পিসি, তাঁর একমাত্র মেয়ে সকলেই বেশ খুশীর মেজাজে। স্ত্রী সুন্দর করে সেজেছেন, আলতো হাতে সকলের পাতে তুলে দিচ্ছেন পছন্দসই পদ। গিন্নিমা নিজে দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন। 'বাব্বা, কতদিন পর আজ একটু প্রাণভরে হাসতে পারছি, কথা বলতে পারছি। যা টেনশন গেলো পনেরো দিন ধরে।' পিসি কথাটা বলে একবার ভাইয়ের দিকে তাকালো। 'মামু, এবার কিন্তু আমাকে একবার এসেম্বলি নিয়ে যেতেই হবে'। তিরিসা, পিসির মেয়ে কথাটা তুলতেই গিন্নিমা একটু মৃদু ধমক দিয়ে উঠলেন, 'ঠিক আছে, ঠিক আছে, সেসব হবে এখন, মামাকে আজ ভালো করে খেতে দেতো, বেচারা কতোদিন পেটপুরে খায়নি।' বুবাই-এর একলা খাওয়া এখনও তেমন অভ্যাস হয়ে ওঠেনি। মা-কে ওর পাশে বসতেই হয়। সকলকে কথা বলতে দেখলে ও কিছুতেই চুপ করে থাকতে পারে না। 'দাদু, ছাপ্পাভোট কি ?' দাদু কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে গেলেন। একবার ছেলের দিকে তাকালেন। আর সবাই চুপ। ঠাকুমা ব্যাপারটা সামলে দিলেন। 'বুবাই সোনা, ওটা বড়োদের কথা। ওসব কথা ছোটদের বলতে নেই। যখন তুমি বড়ো হবে, আমি তোমায় বুঝিয়ে দেবো।' খানিক বাদে আবার বিপত্তি। এম এল এ সাহেব সবে গাজরের হালুয়া একটু মুখে দিয়েছেন, বুবাই আবার বলে উঠলো, 'দাদু, বুথ দখল কি ? গান পয়েন্ট কাকে বলে ?' মা দ্রুত গরম লুচির থালাটা টেবিলে রেখে ছেলের পাশে এসে বসলেন। স্বামীর দিকে একপলক তাকিয়েই বুঝলেন, মেঘ জমে উঠেছে। স্বামীকে তিনি ভালোমতোই চেনেন। এমনিতে বেশ মানুষটা, মাথা গরম হলে অন্য মানুষ। 'বুবাই আর ইউ ক্রেজি ? হোয়াট ননসেন্স আর ইউ টকিং ? ঠাকুমাতো তোমাকে বললো, ওসব বড়োদের কথা, ইউ শুড নট টক অন অল দোজ থিংস।' সবাই এম এল এ সাহেবের দিকে তাকিয়ে। একটা দমবন্ধ করা পরিবেশ। উনি খাবার থালা থেকে হাত উঠিয়ে নিয়েছেন। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর সিঁড়ি দিয়ে উঠে সোজা চলে এলেন নিজের ঘরে।


রাত এগারোটা। সবাই ফিরে গেছেন যে যার গৃহে। বুবাই দাদু-ঠাকুমার কাছে। স্ত্রী এসে ঢুকলেন ঘরে। এম এল এ সাহেব বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন। স্ত্রীকে আসতে দেখে এগিয়ে এলেন। 'আমি ঠিক করে ফেলেছি, বুবাইকে আর এখানে রাখা যাবে না। কিসব কথা বলছে দেখেছো ? আজেবাজে ছেলেদের সঙ্গে মিশবে, আরো কতো কি শিখবে। ওকে দার্জিলিং পাঠিয়ে দেবো। হস্টেলে থেকে পড়বে। আমাদের পার্টির শিলিগুড়ির এম এল এ রেফার করেছে সেণ্ট লরেন্স ডে স্কুল। 'ওইটুকু বাচ্চা মা-বাবা ছেড়ে থাকতে পারবে ?' স্ত্রীর কথা শেষ হলো না, ফোন চলে গেলো শিলিগুড়ি। 'হ্যালো মিঃ নারাং, আই এম ফ্রম কোলকাতা।..........'


পরের দিন সকালে বুবাই-এর ডাক পড়লো এম এল এ সাহেবের ঘরে। বুবাই গুটি গুটি পায়ে এসে দাঁড়ালো বাবার কাছে। ছেলেকে পাশে বসিয়ে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, মাই সন, ডু ইউ লাভ হিলস ?

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

১৬ মে ২০২২

এক মুঠো পয়সা | প্রত্যুষ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়