গল্পের নাম:- গুরুদক্ষিণা /লেখকের নাম:- প্রবাল মুখোপাধ্যায়
পরিচয় পেজটি
গল্পের নাম:- গুরুদক্ষিণা
লেখকের নাম:- প্রবাল মুখোপাধ্যায়
অফিসের পোষাক পরা হয়ে গেছে, শুধু টাইটা বাঁধা বাকি। এই সময়টা দীপালির খুব ব্যস্ততার মধ্যে কাটে। হাতে হাতে স্বামীকে সবকিছু এগিয়ে দিতে হয়। জামাটা, তার সঙ্গে ম্যাচ করে টাইটা, দরকারি ফাইল, টিফিন বক্স, মানিব্যাগ, মোবাইলটা ফুল চার্জ আছে কিনা সেটাও দেখে রাখতে হয়। কোনোদিন হয়তো এমন হয়েছে, জামাটা পরার পর দেখা গেলো, গলার কাছে বোতামটা ঝুলছে। দ্রুত হাতে মেরামতির কাজ চলে। সবশেষে ঠিক সুগন্ধিটা এনে হাতে ধরিয়ে দিলে কাজ শেষ। দীপালি ঠিক বুঝে যায়, আজ বিদেশি না দেশি কোন্ ব্র্যাণ্ড স্বামীর মনপসন্দ। কোম্পানির গাড়ি আসে ঠিক সওয়া নটায়। নীচে নেমে যাবার সময় স্ত্রীর ঠোঁটে আলতো করে একবার ঠোঁট রাখে ব্রতীন।
সেদিনও আর দু'মিনিটের মধ্যে নীচে নামবে, বাড়ির কাজের লোক গোবিন্দ দরজায় এসে হাজির। 'সাহেব, একজন দেখা করতে এসেছে। বলেছি, এখন সাহেবের বেরোবার সময়, দেখা করতে হলে রাতে আসবেন, শুনছে না, বলছে এসে পড়েছি যখন দেখা করেই যাই।' দীপালি পর্দা সরিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে আসে। 'কি নাম বললো, আগে কোনোদিন দেখেছিস ?' 'নাম তো বলেনি, এ বাড়িতে আগে কখনো দেখিনি।' ঘরের ভেতর থেকে সাহেবের গলা শোনা গেলো, 'বসতে বল, এখনি নামছি।'
বসার ঘরে সোফার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছেন এক প্রৌঢ়। শীর্ণ চেহারা, দারিদ্রের ছাপ সর্বাঙ্গে। ধুতি শার্ট পরে আছেন, পকেটে একটা কলম গোঁজা। দাড়িটায় ব্লেড পরেনি বেশ কয়েকদিন। সাহেবকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ালেন প্রৌঢ়। 'চিনতে পারো সতীন ? মনে আছে, স্কুলে তোমাকে মজা করে ঐ নামে ডাকতাম।' প্রৌঢ় তাকিয়ে আছেন, খানিক বিমর্ষ হয়েছেন বোঝাই যায়। সামনের মানুষটার স্মৃতি যদি কাজ না করে, শেষ ভরসাটাই যাবে মরে। ব্রতীন একবার হাতঘড়িটা দেখে নিলো। সময় হয়ে গেছে। অফিসের গাড়ি এখনই চলে আসবে। আধঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে অফিস। দশটায় ম্যানেজিং ডিরেক্টরের সঙ্গে মিটিং। তারপর টেণ্ডার সাবমিট, ইউনিয়ন লিডারের সঙ্গে একবার বসতে হবে, ছ'টা পর্যন্ত ঘোড়ায় জিন দিয়ে ছোটা। স্মৃতি হাতড়ে দেখার এখন সময় কোথায় ? 'আপনি এক কাজ করুন, একটু বসুন, জিরিয়ে নিন, আর এই হলো আমার নম্বর। বিশেষ কোনো প্রয়োজন থাকলে আটটার পর ফোন করবেন।' 'জানতাম, আমি জানতাম, হোয়াই শুড আই বি রিমেমবারড ? আই হ্যাভ টু ফেস মাই ওন মিসফরচুন।' প্রৌঢ় বিড় বিড় করতে করতে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
গাড়ি করে যেতে যেতে ব্রতীনের মনটা খচখচ করতে লাগলো। স্কুলের কে হবে ? স্কুল ছেড়েছে কুড়ি বছর হলো, অনেক কিছুই মন থেকে গেছে সরে। কিছু স্মৃতি তো থাকেই, যেগুলো যাবার নয়। দু-একটা ছবি, কিছু কথা, হয়তো সামান্য কোনো ঘটনা সময়ের ধুলো বাঁচিয়ে দিব্যি টিঁকে থাকে। প্রৌঢ়ের ওই হতাশব্যঞ্জক চেহারা, নিজেকে শাপ-শাপান্ত করার আত্মশ্লাঘা যতোই চোখের সামনে ভেসে উঠছে, না চিনতে পারার একটা গ্লানি ব্রতীনকে কেবলই অন্যমনস্ক করে তুলছে। কে আমার নাম নিয়ে অমন মজা করতেন ? কোনো শিক্ষক ? কোন্ শিক্ষক ? অমন অবলীলায় এই বয়সেও স্পষ্ট ইংরাজী কার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে ?
অফিসের কাজে তেমন মন বসলো না। টেণ্ডারের রেটেও ভুল হলো। ইউনিয়ন লিডারের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত রইলো। মাথাটা কেমন ভার লাগছে। অনেকগুলো ছবি চোখের সামনে ঘোরাঘুরি করছে। অস্পষ্ট, ভেঙেচুরে যাচ্ছে। দীপালির ফোন এলো, 'বুঝতে পেরেছো ভদ্রলোক কে ? আমার তো মনে হয়, তোমাকে খুব স্নেহ করতেন।'
বাড়ি ফেরার সময় ব্রতীন ড্রাইভারকে বললো, 'আজ হাওড়া দিয়ে যাবো। ময়দানে একবার গাড়িটা রাখবে।' বেলিলিয়াস রোডের মুখে নেমে বাড়িটা খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধা হলো না। আগেও ছাত্রাবস্থায় বেশ কয়েকবার এসেছেন এই বাড়িতে। কুড়ি বছরেও জায়গাটা খুব একটা পাল্টায়নি। বাড়িতে ঢোকার মুখে একটা পান বিড়ি সিগারেটের গুমটি। জিজ্ঞেস করতেই একটি ছেলে এগিয়ে এসে ভাঙাচোরা একটি ঘরে এনে ছেড়ে দিলো। 'স্যার ওই যে শুয়ে আছেন। স্ত্রী নেই, ছেলেও তো বিয়ে করে বেপাত্তা। অমন বাঘা মাস্টারমশায়ের দশাখানা নিজের চোখেই দেখে যান।'
ব্রতীন খাটের ওপর একটু ঝুঁকে পড়লো। মাস্টারমশায়ের কপালে একটা হাত রাখলো। 'স্যার আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনি আমাদের হারাধনবাবু, ইংরাজীর টিচার। মনে আছে স্যার, আপনি এতো শক্ত শক্ত শব্দ বলতেন, আপনাকে আমরা নাম দিয়েছিলাম বোমবাস্টিং। স্যার, আপনাকে প্রণাম করে গেলাম, আবারও আমি আসবো, যখনই সুযোগ পাবো।' ব্রতীনের হাতে চারটে পাঁচশো টাকার নোট। স্যারের মাথার বালিশটা তুলে আস্তে করে রেখে দিলো। তারপর রাস্তায় বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠে পড়লো।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন