গল্প:-তিতলির লক্ষ্মীপূজো লেখিকা:- দেবাদৃতা দে
#0214
#পরিচয়
#তিতলির_লক্ষ্মীপূজো
#দেবাদৃতা_দে
তিতলির কতই বা বয়স ? ছয় সাত বছর ! বাবা একটা কারখানায় কাজ করে । ওরা দু'বোন । খুব গরীব ওরা । মা একটা বাড়িতে ঠিকে ঝি এর কাজ করে । কালো মেয়ে তিতলি ওর ছোট্ট ছোট্ট বেণী দুলিয়ে যখন ছোটাছুটি করে ভারী ভালো লাগে দেখতে । কে বলে কালো ভালো না ? নিষ্পাপ, প্রাণোচ্ছল তিতলির ছোটাছুটি দেখলে ওর গায়ের রংয়ের কথা মনে থাকে না । ওর নিষ্পাপ মুখখানি দেখে খুব কষ্ট লাগে । বেচারি জানেও না -----ওর গায়ের রং আর ওর বাবা গরীব ----এই দু অপরাধে ওকে সারাজীবন কত কষ্ট পেতে হবে । বাস্তব বড়ই কঠিন । বড্ড রুঢ় ।
ওদের মায়ের ও এনিয়ে চিন্তার শেষ নেই । ভালো করে লেখাপড়া করানোর ও ক্ষমতা নেই , তাই সব রকম কাজ শেখানোর চেষ্টা করে সে । তার সাথে আদব কায়দা শেখানোর তামিল চলতে থাকে। এতটুকু বয়সেই সংসারের প্রায় সব কাজ তিতলি শিখে নিয়েছে। কেউ কোন কাজ করতে বললে সে কখনো না করে না । খুব মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে সে ।
পাশের ব্রাম্হনবাড়ির গিন্নি মা ওকে দিয়ে ছোট খাট অনেক কাজ করিয়ে নেয়। বিনিময়ে ভালো মন্দ খেতে দেন । ওর মাও বাঁধা দেন না এতে । ভাবেন , বড়লোক ব্রাম্হনবাড়ির আদব কায়দা যদি একটু শেখে তো শিখুক না । ওর নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করা দেখে গিন্নিমাও অবাকই হন । এতটুকু বয়সে ও এতসব শিখল কোথা থেকে ? কিন্তু মুখে কিছু বলেন না। অন্যের প্রশংসা করা তাঁর রক্তে নেই। বরং তিতলির ভালো গুণগুলি নিজের মেয়ের বলে প্রচার করেন । তিতলির তাতে কিছু আসে যায় না । সে বোঝেও না অতসব ।
ঈদানিং গিন্নিমার কাছে তিতলির আদর খানিকটা কমে গেছে। পাশের বাড়িতে একটি পরিবার ভাড়াটে হিসেবে এসেছেন । ঐ পরিবারের গিন্নিমা খুব ভালো। প্রতিদিন ই কিছু না কিছু এ বাড়ির গিন্নিমা কে এনে দেন । কখনো ওদের বাড়ির নারকেল কখনো মানকচু কখনো কাঁঠাল কিছু না থাকলে রান্না করা মাছ মাংস প্রতিদিনই দিতেই থাকেন। তাই এ বাড়ির গিন্নিমা ওদের খুব পছন্দ করেন । ওদের বাড়িতে তিতলির বয়সী একটা মেয়ে লিজা আছে , গিন্নিমা ওকেই এখন বেশি ভালো বাসেন । সবসময় ওকেই ডাকতে থাকেন । আদর করেন । শুধু কাজের বেলায় তিতলিকে ডাকেন ।
তিতলি খুব সরল । অনেক কিছুই এখনো বোঝে না ,কিন্তু আদরটা খুব ভালো বোঝে । ওর আদর যে কমে গেছে ----এটা বুঝে মনে মনে খুব কষ্ট পায়। কিন্তু লিজার উপর রাগ করে না । ওর তো কোন দোষ নেই । যদিও লিজা তিতলির সাথে মেশে না । ওরা অভিজাত , বড়লোক- কত স্মার্ট ! তিতলিরা যে গরীব । ভালো জামা কাপড় নেই, গ্রাম্য । তাই লিজা ওকে বিশেষ পাত্তা দেয় না । এতে তিতলির খারাপ লাগে না । লিজা কত ভালো স্কুলে পড়ে । ওখানে ওর কত ভালো ভালো বন্ধু । ওদের বাদ দিয়ে তিতলির সাথে মিশবেই বা কেন !
ও এখন গিন্নিমার সাথেও বেশি কথা বলার সুযোগ পায় না । চুপচাপ কাজ করে দিয়ে চলে আসে । আগে গিন্নিমা কত ভালো বাসতেন , কত টাকা আদর করতেন ।এখন শুধু খিটখিট করেন । কথায় কথায় কাজের খুঁত ধরে বকা দেন । লিজার ফেলে যাওয়া কিছু খাবার থাকলে তিতলিকে দেন । ও বুঝতে পারে এটা এঁটো খাবার । বুঝেও চুপচাপ খেয়ে চলে আসে । ওদের তো এঁটোকাঁটা খেতেই হবে । ওরা যে গরীব ।
লক্ষ্মীপূজোর দিন বিকেল বিকেল সব কাজ করে দিয়ে চলে আসে সে । অন্য বার পূজো শেষ না হওয়া পর্যন্ত থাকে । হাতে হাতে সব এগিয়ে দেয় । কিন্তু এবারের আবহাওয়া অন্য রকম । আর অনাদর তিতলি একদম সহ্য করতে পারে না। তাই, চলে আসে । ও জানে ,পাঁচালি পড়া হলেই গিন্নি মা ডাকতে থাকবেন প্রসাদ নেবার জন্য । বলবেন, মাকে নিয়ে চলে আয় । গিন্নি মার হাতের খিচুড়ি খুব ভালো । সারাদিন উপোস থেকে খুব ভাত বা খিচুড়ি খেতে ইচ্ছে করছে । আজ ওদের বাড়িতে অন্ন রান্না হবে না । গিন্নিমার খিচুড়ি খেয়েই শুয়ে পরবে । শরীর টাও খুব ক্লান্ত ।
এবার তিতলির মা ও ছোট করে লক্ষ্মীপূজোর আয়োজন করেছে । এবারই প্রথম। শুধু ফল প্রসাদ দিয়ে । তিতলির খিচুড়ি প্রসাদ খুব পছন্দ । গিন্নিমা অনেক অনেক খিচুড়ি-সবজি পূজোতে দেন । কত লোক গিন্নিমার বাড়িতে প্রসাদ খেতে আসেন । এসব ভাবতে ভাবতে সে মায়ের সাথে পূজোর কাজ করে । ওদের পূজো শুরু হওয়ার আগেই গিন্নিমার পূজো শেষ হয়ে যায় । তিতলি কাণ পেতে থাকে ----এই বুঝি গিন্নিমা ডাকেন । কিন্তু না , সব কেমন যেন চুপচাপ।
ওদের পূজোও একসময় শেষ হয়। ওর মা পাঁচালী পড়েন। তবুও ডাক আসে না । মা ওদের দু বোনকে প্রসাদ দেন । এই সময় সত্যি সত্যিই ডাক আসে ও বাড়ি থেকে ----------ওই লিজা , মা-বাবা-ভাইকে নিয়ে আয় মা , প্রসাদ নিয়ে যা । তিতলি ওর আধখাওয়া প্রসাদ ফেলে রেখে ছুটতে শুরু করে । মা বাঁধা দেন , বলেন , তোকে ডাকেন নি । লিজাদের ডেকেছেন। তিতলির মনে হয় , মা ভুল শুনেছেন । প্রসাদ খেতে খেতে আবার কাণে আসে সেই ডাক । সে উঠে দাঁড়ায় । এবারে সে নিজেই শুনতে পায় লিজার নাম । হতাশ হয়ে বসে পরে ।
মনের মধ্যে একটা তীব্র ব্যাথা চিন্ চিন্ করে ওঠে । সাথে একরাশ অভিমান ও। ঘুমোনোর আগে পর্যন্ত কাণ খাড়া করে রাখে ---যদি এখন তাকে ডাকেন । তখন হয়ত কাজের চাপে ভুলে গিয়েছিলেন । কিন্তু না , আর কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। গিন্নিমা আগেই বলে রেখে ছিলেন এবারে দুদিন পূজো । প্রথম দিন পূরোহিত পূজো করবেন , পরদিন উনি নিজেই পূজো করবেন । তাই ,পরদিন তাকে একটু বেশি সকালে যেতে বলেছিলেন । ফুল তুলে দিতে ,আর অন্য কাজে সাহায্য করতে । গিন্নিমার ছাদে প্রচুর ফুল ফোটে । তিতলি ঠিক করে , কাল যাবেই না । লিজাই সাহায্য করুক । আবার ভাবে , গিন্নিমা হয়ত ভুলে গেছেন । একটা পূজোর ধকল তো আর কম নয়।
পরদিন সকালেও কোন ডাক আসে না । তিতলি অভিমান করে বসে থাকে । ডাক না এলে যাবে না । মা জোর করে পাঠান । বলেন, যা , তোর গিন্নিমা অসুস্থ, তুই না গেলে ওনার কষ্ট হবে । তোকে তো উনি খুব ভালো বাসেন । কাল হয়ত কোনো কারণে মনটা ঠিক ছিল না । তুই রাগ করে থাকিস না ।
তিতলি গিয়ে দেখে সত্যিই উনি মন খারাপ করে বসে আছেন । ওকে দেখে বললেন ---জানিস তিতলি, আজ আমাদের ছাদে একটা ফুল ও ফোটে নি। কাল যে কুঁড়িগুলো আধফোটা হয়ে ছিল , আজ সেগুলো আবার ভেতরে ঢুকে গেছে । বলতো এখন কি দিয়ে পূজো করব ।
তিতলি অবাক হয়ে ভাবে ----গিন্নিমাই কি তবে আগের জন্মে সেলফিস জায়েন্ট ছিলেন ?
#porichoy
Cont:- 6291227897
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন